ইসলামে দান-সদকা অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ইবাদত। অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, অভাবীর প্রয়োজন পূরণ করা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সম্পদ ব্যয় করা একজন মুমিনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। বছরের যেকোনো দিনই দান-সদকার সুযোগ রয়েছে। তবে জুমার দিনের বিশেষ মর্যাদার কারণে এ দিনে দান করলে কি অন্য দিনের তুলনায় বেশি সওয়াব পাওয়া যায়?
প্রশ্নটির উত্তর বুঝতে হলে দান-সদকার সাধারণ ফজিলত এবং জুমার দিনে দানের বিশেষ ফজিলত এ দুটি বিষয় আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
দান-সদকার প্রতিদান বহুগুণে বাড়তে পারে
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে দান-সদকার জন্য বিপুল প্রতিদানের কথা ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেন, ‘যারা আল্লাহর পথে নিজেদের সম্পদ ব্যয় করে, তাদের উপমা একটি শস্যবীজের মতো, যা সাতটি শিষ উৎপন্ন করে। প্রতিটি শিষে থাকে একশ শস্যদানা। আর আল্লাহ যাকে ইচ্ছা বহুগুণে বৃদ্ধি করে দেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।’ (সুরা বাকারা: ২৬১)
আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আন্তরিকভাবে দান করলে তার প্রতিদান বহুগুণে বাড়তে পারে। তবে প্রতিদান কতটুকু হবে, তা আল্লাহর ইচ্ছা ও প্রজ্ঞার ওপর নির্ভরশীল।
আরও পড়ুন: দান-সদকা: দুনিয়াতেই ৯ প্রতিদানের নিশ্চয়তা
দান করার সুযোগ হাতছাড়া না করার ব্যাপারেও কোরআনে সতর্ক করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমি তোমাদের যা দিয়েছি, তা থেকে ব্যয় করো, তোমাদের কারও মৃত্যু আসার আগে। অন্যথায় সে বলবে, হে আমার রব! আমাকে আরও কিছু সময়ের জন্য অবকাশ দিলে না কেন? তাহলে আমি সদকা করতাম এবং সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত হতাম।’ (সুরা মুনাফিকুন: ১০)
আয়াতটি পড়ে বুঝা যায়, দান করার জন্য শুধু বিশেষ কোনো দিনের অপেক্ষায় থাকা উচিত নয়। সামর্থ্য ও সুযোগ থাকলে সময়মতো অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো জরুরি।
জুমার দিনের বিশেষ মর্যাদা
জুমার দিন মুসলমানদের কাছে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘যে দিনগুলোতে সূর্য উদিত হয়, সেগুলোর মধ্যে সর্বোত্তম দিন হলো জুমার দিন।’ (সহিহ মুসলিম: ৮৫৪)
জুমার দিনের এই মর্যাদা প্রমাণিত। তবে এ দিনের মর্যাদা থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে এ সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না যে, জুমার দিনে দান করলে অন্য দিনের তুলনায় নির্দিষ্ট পরিমাণ বেশি সওয়াব পাওয়া যাবে।
প্রখ্যাত আলেম ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) তাঁর জাদুল মাআদ গ্রন্থে জুমার দিনে দান-সদকার বিশেষ গুরুত্বের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি জুমার দিনে দানের সঙ্গে রমজান মাসে দানের তুলনা করেছেন। এটি তাঁর আলেমি মূল্যায়ন, জুমার দিনে দানের নির্দিষ্ট প্রতিদান সম্পর্কে সরাসরি কোনো সহিহ হাদিস নয়।
তাই জুমার দিনে দান করাকে ভালো আমল হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে এবং এতে জুমার দিন হিসেবে বিশেষ সওয়াবও আল্লাহ তাআলা দিতে পারেন। তবে এ দিনে দান করলে সওয়াব নিশ্চিতভাবে বহুগুণ বেড়ে যায়- এমন দাবি করার ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন।
সদকা গুনাহ মোচনের কারণ
জুমার দিন হোক বা অন্য কোনো দিন, দান-সদকা মানুষের জন্য কল্যাণকর আমল। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘সদকা গুনাহকে মিটিয়ে দেয়, যেমন পানি আগুনকে নিভিয়ে দেয়।’ (জামে তিরমিজি: ৬১৪)
আরও পড়ুন: দান-সদকায় মেলে মানসিক প্রশান্তি
হাদিসটি সদকার সাধারণ ফজিলত তুলে ধরে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, সদকা করলেই মানুষের সব গুনাহ নিঃশর্তভাবে মাফ হয়ে যাবে। গুনাহ থেকে তাওবা করা, মানুষের অধিকার নষ্ট করলে তা ফিরিয়ে দেওয়া এবং আল্লাহর নির্দেশ মেনে চলাও জরুরি।
জুমার দিনে দান করার সুন্দর সুযোগ
জুমার দিন অনেক মুসলমান একসঙ্গে মসজিদে সমবেত হন। এ উপলক্ষে অসহায় মানুষের প্রয়োজনের কথা স্মরণ করা, দরিদ্র পরিবারকে সহায়তা করা কিংবা কোনো রোগীর চিকিৎসার জন্য অর্থ দেওয়া যেতে পারে।
এ দিনে দান করতে চাইলে কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখুন-
- নিয়ত শুদ্ধ রাখুন: মানুষের প্রশংসা নয়, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দান করুন।
- সামর্থ্য অনুযায়ী দান করুন: নিজের পরিবার ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের ন্যায্য অধিকার নষ্ট করে দান করবেন না।
- গ্রহীতার সম্মান রক্ষা করুন: দানের মাধ্যমে কাউকে অপমান বা বিব্রত করবেন না।
- নিয়মিত দান করুন: শুধু জুমার দিন নয়, অন্য দিনেও অভাবী মানুষের পাশে দাঁড়ান।
- বিশ্বস্ত ব্যক্তিকে দান করুন: আপনার সহায়তা যেন প্রকৃত প্রয়োজনমন্দের কাছে পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করুন।
জুমার দিনে দান-সদকা করা সওয়াবের কাজ। তবে এ দিনে দানের বিশেষ প্রতিদান সম্পর্কে সুস্পষ্ট সহিহ দলিল নেই। তাই জুমার দিনসহ সামর্থ্য অনুযায়ী নিয়মিত দান করুন, নিয়ত রাখুন আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং পাশে দাঁড়ান অসহায় মানুষের। আল্লাহ আমাদের দানশীল হওয়ার তাওফিক দিন। আমিন।
তথ্যসূত্র: সুরা বাকারা: ২৬১; সুরা মুনাফিকুন: ১০; সহিহ মুসলিম: ৮৫৪; জামে তিরমিজি: ৬১৪; জাদুল মাআদ




