মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

আয়াতুল কুরসিতে আল্লাহর কোন কোন গুণের কথা বলা হয়েছে?

ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৫৩ পিএম

শেয়ার করুন:

আয়াতুল কুরসিতে আল্লাহর কোন কোন গুণের কথা বলা হয়েছে?

আয়াতুল কুরসি পবিত্র কোরআনের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ আয়াত। সুরা বাকারার ২৫৫ নম্বর আয়াতটিতে আল্লাহর পরিচয়, ক্ষমতা, জ্ঞান ও মহত্ত্বের কথা তুলে ধরা হয়েছে। এতে আল্লাহর কয়েকটি মহান গুণ, তাঁর সর্বময় কর্তৃত্ব এবং সৃষ্টিজগতের ওপর তাঁর নিয়ন্ত্রণের কথা বর্ণিত হয়েছে।

আয়াতুল কুরসিতে আল্লাহর কোন কোন গুণের কথা বলা হয়েছে, তা জেনে নেওয়া যাক।

১. আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই

আরবি: لَا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ উচ্চারণ: লা ইলাহা ইল্লা হুয়া। অর্থ: তিনি ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই।

আয়াতের শুরুতেই আল্লাহর একত্বের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। ইবাদতের একমাত্র অধিকারী তিনি। তাঁর কোনো শরিক নেই। একজন মুমিনের বিশ্বাসের মূল ভিত্তি হলো এই তাওহিদ।

২. তিনি চিরঞ্জীব

আরবি: الْحَيُّ উচ্চারণ: আল-হাইয়্যু। অর্থ: চিরঞ্জীব।

আল্লাহর গুণবাচক নাম ‘আল-হাইয়্যু’। তাঁর জীবন চিরস্থায়ী। সৃষ্টির মতো তাঁর মৃত্যু নেই। তিনি চিরকাল জীবিত এবং তাঁর জীবন কোনো কিছুর ওপর নির্ভরশীল নয়।

আরও পড়ুন: দোয়া কবুলের রহস্য লুকিয়ে আছে আল্লাহর এসব নামের মধ্যে

৩. তিনি সবকিছুর ধারক ও পরিচালনাকারী

আরবি: الْقَيُّومُ উচ্চারণ: আল-কাইয়্যুম। অর্থ: যিনি কারও মুখাপেক্ষী নন এবং সবকিছুর রক্ষণাবেক্ষণকারী।

আল্লাহ নিজে কারও মুখাপেক্ষী নন, অথচ সব সৃষ্টি তাঁর ওপর নির্ভরশীল। সমগ্র আসমান-জমিনের অস্তিত্ব ও পরিচালনা তাঁরই নিয়ন্ত্রণে। তাঁর ব্যবস্থাপনা ছাড়া কোনো কিছুই টিকে থাকতে পারে না।

৪. তাঁকে তন্দ্রা বা ঘুম স্পর্শ করে না

আরবি: لَا تَأْخُذُهُ سِنَةٌ وَلَا نَوْمٌ উচ্চারণ: লা তা’খুযুহু সিনাতুন ওয়া লা নাওম। অর্থ: তাঁকে তন্দ্রা স্পর্শ করে না, ঘুমও নয়।

মানুষ বিশ্রাম নেয়, ঘুমায় এবং ক্লান্ত হয়। কিন্তু আল্লাহ এসব সীমাবদ্ধতা থেকে পবিত্র। সমগ্র সৃষ্টিজগতের ওপর তাঁর কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণে কোনো শিথিলতা আসে না।

৫. আসমান ও জমিনের সবকিছু তাঁর মালিকানাধীন

আরবি: لَهُ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ উচ্চারণ: লাহু মা ফিস সামাওয়াতি ওয়া মা ফিল আরদ। অর্থ: আসমান ও জমিনে যা কিছু আছে, সবই তাঁর।

আসমান ও জমিনের সবকিছু আল্লাহর মালিকানাধীন। সবকিছুর ওপর তাঁর পূর্ণ কর্তৃত্ব রয়েছে। 

আরও পড়ুন: দয়ার আধার আল্লাহ: দুনিয়া ও আখেরাতে রহমতের ঝর্ণাধারা

৬. তাঁর অনুমতি ছাড়া কেউ সুপারিশ করতে পারে না

আরবি: مَنْ ذَا الَّذِي يَشْفَعُ عِنْدَهُ إِلَّا بِإِذْنِهِ উচ্চারণ: মান যাল্লাযী ইয়াশফাউ ইনদাহু ইল্লা বি-ইযনিহি। অর্থ: কে আছে, যে তাঁর অনুমতি ছাড়া তাঁর কাছে সুপারিশ করতে পারে?

এই বক্তব্য আল্লাহর সর্বময় কর্তৃত্বের কথা তুলে ধরে। কেউ তাঁর অনুমতি ছাড়া সুপারিশ করতে পারে না। তাই সুপারিশের ক্ষমতা কারও নিজস্ব বা স্বাধীন ক্ষমতা নয়।

৭. তাঁর জ্ঞান সবকিছুকে পরিবেষ্টন করে

আরবি: يَعْلَمُ مَا بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَمَا خَلْفَهُمْ উচ্চারণ: ইয়া’লামু মা বাইনা আইদীহিম ওয়া মা খালফাহুম। অর্থ: তাদের সামনে ও পেছনে যা কিছু আছে, তিনি তা জানেন।

আল্লাহর জ্ঞান সর্বব্যাপী। মানুষের প্রকাশ্য-গোপন অবস্থা, অতীত ও ভবিষ্যৎ কোনোকিছুই তাঁর জ্ঞানের বাইরে নয়। মানুষ যা জানে না, আল্লাহ তা-ও জানেন।

৮. তাঁর অনুমতি ছাড়া কেউ তাঁর জ্ঞানের কিছুই আয়ত্ত করতে পারে না

আরবি: وَلَا يُحِيطُونَ بِشَيْءٍ مِنْ عِلْمِهِ إِلَّا بِمَا شَاءَ উচ্চারণ: ওয়া লা ইউহীতূনা বিশাই’ইম মিন ইলমিহি ইল্লা বিমা শা’আ। অর্থ: তিনি যতটুকু চান, তার বাইরে কেউ তাঁর জ্ঞানের কিছুই আয়ত্ত করতে পারে না।

মানুষের জ্ঞান সীমিত। আল্লাহ যাকে যতটুকু জ্ঞান দান করেন, সে ততটুকুই জানতে পারে। মানুষের জ্ঞান ও উপলব্ধির সীমাবদ্ধতা এই বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

আরও পড়ুন: ‘সবই তাকদির’ এই মানসিকতা কি আমাদের অলস করে তুলছে? 

৯. তাঁর কুরসি আসমান ও জমিনকে পরিবেষ্টন করে আছে

আরবি: وَسِعَ كُرْسِيُّهُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ উচ্চারণ: ওয়াসিআ কুরসিয়্যুহুস সামাওয়াতি ওয়াল আরদ। অর্থ: তাঁর কুরসি আসমান ও জমিনকে পরিবেষ্টন করে আছে।

এটি আল্লাহর মহত্ত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ বর্ণনা। কুরসির প্রকৃত স্বরূপ কেমন, তা নিয়ে অনুমান না করে কোরআন ও সুন্নাহতে যেভাবে এসেছে, সেভাবেই বিশ্বাস করা উচিত।

১০. সৃষ্টিজগতের রক্ষণাবেক্ষণ তাঁকে ক্লান্ত করে না

আরবি: وَلَا يَئُودُهُ حِفْظُهُمَا উচ্চারণ: ওয়া লা ইয়াউদুহু হিফযুহুমা। অর্থ: আসমান ও জমিনের রক্ষণাবেক্ষণ তাঁকে ক্লান্ত করে না।

সমগ্র সৃষ্টিজগতের রক্ষণাবেক্ষণ আল্লাহর জন্য কঠিন নয়। আসমান ও জমিনের সবকিছু রক্ষা করতে তাঁকে কোনো ক্লান্তি বা দুর্বলতা স্পর্শ করে না।

১১. তিনি সর্বোচ্চ

আরবি: الْعَلِيُّ উচ্চারণ: আল-আলিয়্যু। অর্থ: সর্বোচ্চ।

আয়াতের শেষে আল্লাহর এই গুণবাচক নামটি এসেছে। তিনি সর্বোচ্চ মর্যাদা ও মহত্ত্বের অধিকারী। তাঁর ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের ঊর্ধ্বে কেউ নেই।

১২. তিনি মহান

আরবি: الْعَظِيمُ উচ্চারণ: আল-আযীম। অর্থ: মহান, মহামহিম।

আল্লাহর আরেকটি গুণবাচক নাম ‘আল-আযীম’। তিনি মহত্ত্ব ও মর্যাদায় অতুলনীয়। তাঁর মতো কেউ নেই, তাঁর মহত্ত্বের কোনো তুলনা নেই।

আয়াতুল কুরসির বিশেষ ফজিলত

আয়াতুল কুরসির মর্যাদা সম্পর্কে হাদিসে বিশেষভাবে উল্লেখ রয়েছে। উবাই ইবন কাব (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, আল্লাহর কিতাবের কোন আয়াতটি সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ। তিনি আয়াতুল কুরসির কথা বললে রাসুলুল্লাহ (স.) তাঁর উত্তর সমর্থন করেন। (সহিহ মুসলিম: ৮১০)

আরেক বর্ণনায় এসেছে, ‘যে ব্যক্তি প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর আয়াতুল-কুরসি নিয়মিত পাঠ করে, তার জন্য জান্নাতে প্রবেশের পথে একমাত্র মৃত্যু ছাড়া অন্য কোনো অন্তরায় থাকে না। (নাসায়ি: ১০০)

আয়াতটি পড়ে অর্থ বোঝার চেষ্টা করুন

আয়াতুল কুরসিতে আল্লাহর একত্ব, চিরঞ্জীবতা, সর্বময় কর্তৃত্ব, অসীম জ্ঞান, সৃষ্টিজগতের রক্ষণাবেক্ষণ এবং তাঁর সর্বোচ্চতা ও মহত্ত্বের কথা বলা হয়েছে। তাই আয়াতটি পাঠ করার পাশাপাশি এর অর্থ বোঝার চেষ্টা করাও গুরুত্বপূর্ণ। এতে আল্লাহর মহত্ত্ব সম্পর্কে উপলব্ধি গভীর হয় এবং তাঁর ওপর ভরসা আরও দৃঢ় হয়।

তথ্যসূত্র: সুরা বাকারা: ২৫৫। সহিহ মুসলিম: ৮১০। সুনানে নাসায়ি: ১০০

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর