মঙ্গলবার, ১২ মে, ২০২৬, ঢাকা

‘সবই তাকদির’ এই মানসিকতা কি আমাদের অলস করে তুলছে?

ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: ১২ মে ২০২৬, ০২:২৫ পিএম

শেয়ার করুন:

‘সবই তাকদির’ এই মানসিকতা কি আমাদের অলস করে তুলছে?

চাকরি না পেয়ে মাসের পর মাস ঘরে বসে থাকা হতাশ তরুণ, পরীক্ষায় ব্যর্থ হয়ে পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়া শিক্ষার্থী কিংবা ব্যবসায় লোকসানের পর নতুন করে দাঁড়ানোর উদ্যম হারিয়ে ফেলা উদ্যোক্তা- এদের সবার মুখে একটি বাক্য বারবার শোনা যায়- ‘সবই তাকদির।’
ব্যর্থতা বা ব্যক্তিগত অদক্ষতাকে আড়াল করে ভাগ্যকে দায়ী করার এই প্রবণতা এখন এক নীরব সামাজিক সমস্যায় পরিণত হচ্ছে। প্রশ্ন জাগে- ইসলামে তাকদিরের ধারণা কি সত্যিই মানুষকে নিষ্ক্রিয় হতে শেখায়, নাকি এটি সেই বিশ্বাসের এক মারাত্মক ভুল ব্যাখ্যা?

তাকদির ও আল্লাহর পূর্বজ্ঞান

তাকদির অর্থ নির্ধারণ করা বা পরিমাপ করা। আসমান-জমিন সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর আগেই আল্লাহ সবকিছুর ভাগ্যলিপি লিখে রেখেছেন (সহিহ মুসলিম: ২৬৫৩) তবে এই ‘লিখে রাখা’র অর্থ এই নয় যে আল্লাহ যা চান, মানুষ শুধু তাই করতে পারেন! মূলত আল্লাহ ভবিষ্যত সম্পর্কে জানেন, সেটাই তিনি লিখে রেখেছেন।
বিষয়টি একটি উপমায় পরিষ্কার হয়- একজন অভিজ্ঞ আবহাওয়াবিদ তাঁর জ্ঞান ও বিশ্লেষণ দিয়ে আগে থেকেই ঝড়ের পূর্বাভাস লিখে রাখতে পারেন; কিন্তু তাঁর লেখার কারণে ঝড় হয় না। তেমনি, আল্লাহ তাঁর অসীম জ্ঞানে জানেন আমরা স্বাধীন ইচ্ছায় কী করব এবং তিনি তা লিখে রেখেছেন- কিন্তু তিনি আমাদের কোনো কাজে বাধ্য করেন না। ফলে আমাদের ভালো-মন্দের দায়ভার আমাদেরই (সুরা নিসা: ১২৩-১২৪)

তাকদির কি পরিবর্তনশীল?

আলেমদের ব্যাখ্যায় তাকদিরের কিছু অংশ চূড়ান্ত, আর কিছু অংশ শর্তসাপেক্ষে পরিবর্তনশীল- যাকে পরিভাষায় বলা হয় ‘তাকদিরে মুআল্লাক’। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘দোয়া ছাড়া কোনো কিছু তাকদির রদ করতে পারে না, এবং নেক আমল ছাড়া হায়াত বাড়ে না।’ (তিরমিজি: ২১৩৯, হাসান) অর্থাৎ পরিশ্রম ও দোয়ার মাধ্যমে নিজের অবস্থান পরিবর্তনের সুযোগ ইসলামে স্বীকৃত। প্রচেষ্টা ছাড়া কেবল ফলের আশা করা তাই আকিদার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

আরও পড়ুন: আল্লাহর পরিকল্পনাই সর্বোত্তম: তাকদিরে বিশ্বাস ও মুমিনের প্রাপ্তি


বিজ্ঞাপন


তাকদির ও তদবিরের সমন্বয়

তাকদিরে বিশ্বাস করার অর্থ ‘তদবির’ বা চেষ্টা ছেড়ে দেওয়া নয়। একবার এক ব্যক্তি উট না বেঁধে বলল, ‘আমি আল্লাহর ওপর ভরসা করলাম।’ রাসুলুল্লাহ (স.) তাকে সংশোধন করে বললেন, ‘আগে উটটি বেঁধে রাখো, তারপর আল্লাহর ওপর ভরসা করো।’ (তিরমিজি: ২৫১৭)

taqdir-islam

আরও গুরুত্বপূর্ণভাবে, সাহাবিরা যখন চিকিৎসা ও আত্মরক্ষার উপায় নিয়ে প্রশ্ন করেছিলেন, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছিলেন, ‘তোমাদের এই চেষ্টাও তাকদিরের অন্তর্ভুক্ত।’ অর্থাৎ পরিস্থিতির উন্নয়নে মানুষের নেওয়া পদক্ষেপগুলো তাকদিরের বাইরে নয়, বরং তারই অংশ।
সিরিয়ায় প্লেগ মহামারির সময় সাহাবি আবু উবাইদাহ (রা.) খলিফা ওমর (রা.)-কে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি কি আল্লাহর তাকদির থেকে পালাচ্ছেন?’ ওমর (রা.) ঐতিহাসিক উত্তর দিলেন- ‘আমি আল্লাহর এক তাকদির থেকে আল্লাহর আরেক তাকদিরের দিকে ফিরে যাচ্ছি।’ (সহিহ বুখারি: ৫৭২৯) বিপদে নিষ্ক্রিয় বসে না থেকে প্রতিকার খোঁজাটাই ইসলামের শিক্ষা- এই ঘটনা সেটি স্পষ্ট করে দেয়।

মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক প্রভাব

অতিরিক্ত ভাগ্যনির্ভরতার অভ্যাস মানুষকে ভেতর থেকে পঙ্গু করে দেয়; সে বিশ্বাস করতে শুরু করে যে নিজের জীবন বদলানোর কোনো সুযোগই তার নেই। এই বিশ্বাস ধীরে ধীরে উদ্যোগ ও আত্মবিশ্বাস দুটোই ধ্বংস করে। সামষ্টিকভাবে এর ফলে মানুষ নিজের ব্যর্থতার দায় ভাগ্যের ওপর চাপিয়ে দিয়ে আত্মসমালোচনা এড়িয়ে যায় এবং জাতির উদ্ভাবনী শক্তি ও অগ্রগতি থেমে যায়।
অথচ ইসলামের ইতিহাসে মুসলিম সভ্যতার স্বর্ণযুগ ছিল জ্ঞানচর্চা, গবেষণা ও পরিশ্রমনির্ভর। সাহাবিরা শুধু ইবাদতেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না- কৃষি, ব্যবসা, প্রশাসন ও বিজ্ঞানেও তারা ছিলেন অগ্রগামী।

আরও পড়ুন: সময়কে দোষারোপ: ইসলাম কী বলে

সঠিক বিশ্বাসের মানদণ্ড

তাকদির নিয়ে অহেতুক বিতর্ক করতে রাসুলুল্লাহ (স.) কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন (তিরমিজি: ২১৩৩), কারণ এটি তর্কের বিষয় নয়; বিশ্বাস ও আমলের বিষয়। কাজ করার আগে তাকদিরের দোহাই দেওয়া অজ্ঞতা; আর সাধ্যমতো চেষ্টা শেষে ফলাফলের ওপর সন্তুষ্ট থাকাটাই প্রকৃত ঈমান।

তাকদির কোনো অলস মানুষের ঢাল নয়, আসলে এটি পরিশ্রমী মানুষের মানসিক প্রশান্তি। তাই আমাদের সামাজিক প্রেক্ষাপটে এই আকিদাকে নতুনভাবে বোঝা জরুরি। মনে রাখা দরকার- একজন মুমিন চেষ্টা করে এমনভাবে যেন সব দায়িত্ব তার; আর ফল মেনে নেয় এমনভাবে যেন সব ফয়সালা আল্লাহর।

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর