পবিত্র মক্কা ও মদিনার দুই পবিত্র মসজিদে শুক্রবারের (২ অক্টোবর) খুতবায় মুসলমানদের আত্মশুদ্ধি, আমলের পর্যালোচনা, তওবা ও আল্লাহর বণ্টনে সন্তুষ্ট থাকার প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। মসজিদুল হারামের ইমাম ও খতিব শায়খ ড. ফয়সাল বিন জামিল গাজাভি মুসলমানদের কেয়ামতের হিসাবের আগে দুনিয়াতেই নিজেদের আমল পর্যালোচনা ও সংশোধনের আহ্বান জানিয়েছেন। আর মসজিদে নববীর ইমাম ও খতিব শায়খ আবদুল্লাহ বিন আবদুর রহমান আল-বুজাইয়ান বলেছেন, কানাআত বা অল্পেতুষ্টিই মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ এবং প্রকৃত সুখের চাবিকাঠি।
শুক্রবার (২ অক্টোবর) পবিত্র মসজিদুল হারাম ও মসজিদে নববীতে দেওয়া খুতবায় তারা এসব কথা বলেন।
মসজিদুল হারামের খতিব শায়খ গাজাভি বলেন, মানুষ মাটি থেকে সৃষ্টি এবং স্বভাবগতভাবেই দুর্বল ও ভুলপ্রবণ। তাই ভুল বা পদস্খলন হয়ে গেলে হতাশ হওয়ার কারণ নেই। বরং ভুলের পর গুনাহের ওপর অটল থাকা এবং তওবা না করাই উদ্বেগের বিষয়। একজন মুমিন ভুলের পর দৃঢ় সংকল্প নিয়ে আবার সঠিক পথে ফিরে আসে।
তিনি মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বন, নিজেদের কাজের হিসাব নেওয়া এবং ভুল-ত্রুটি থেকে শিক্ষা নিয়ে তওবার মাধ্যমে নিজেদের সংশোধনের আহ্বান জানান।
খুতবায় তিনি প্রশ্ন রাখেন, ‘আমরা কি অন্যদের পরিণতি থেকে শিক্ষা নিই, নাকি নিজেরাই অন্যদের জন্য শিক্ষার উদাহরণ হওয়ার অপেক্ষা করি?’
কোরআনে বর্ণিত বিভিন্ন জাতির পরিণতির কথা তুলে ধরে শায়খ গাজাভি বিশেষভাবে আসহাবে ফিলের ঘটনা উল্লেখ করেন। কাবা শরিফ ধ্বংসের উদ্দেশ্যে তারা এসেছিল; কিন্তু আল্লাহর ঘর ধ্বংসের সেই ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হয়েছিল। এসব ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে প্রত্যেকের নিজের অবস্থান ও কর্মের হিসাব নেওয়া উচিত বলে তিনি উল্লেখ করেন।
দ্বিতীয় খুতবায় মুসলিম সমাজের বিভিন্ন নৈতিক ও ধর্মীয় দুর্বলতার বিষয়ে সতর্ক করেন তিনি। শিরক, দ্বীনের বিষয়ে বাড়াবাড়ি, বিদআত, নামাজ ছেড়ে দেওয়া, মা-বাবার অবাধ্যতা, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা, গুজব ছড়ানো এবং নসিহত প্রত্যাখ্যানের মতো বিষয় থেকে বেঁচে থাকার আহ্বান জানান।
আত্মশুদ্ধির পথ তুলে ধরে তিনি বলেন, কোনো বিষয় জানা না থাকলে জিজ্ঞেস করতে হবে, ভুল পথে পা পিছলে গেলে ফিরে আসতে হবে, গুনাহ হয়ে গেলে তওবা করতে হবে এবং তওবার পর সেই গুনাহ থেকে বিরত থাকতে হবে।
মসজিদে নববীর খতিব শায়খ আবদুল্লাহ বিন আবদুর রহমান আল-বুজাইয়ান খুতবায় বলেন, আল্লাহ তায়ালা বান্দাদের মধ্যে রিজিক বণ্টন করেছেন এবং তাদের বয়স, অবস্থা ও জীবনের পরিস্থিতিতে ভিন্নতা রেখেছেন। আল্লাহর এ বণ্টনে সন্তুষ্ট থাকলে মানুষের অন্তরে প্রশান্তি ও আত্মায় স্বস্তি আসে।
অন্যদিকে অন্যের সম্পদের দিকে তাকিয়ে থাকা মানুষ হিংসা ও লোভে আক্রান্ত হয়ে অন্তর থেকে দরিদ্র হয়ে পড়ে—তার সম্পদ যতই বেশি হোক না কেন।
তিনি স্পষ্ট করেন, কানাআত মানে পরিশ্রম ছেড়ে দেওয়া, রিজিকের সন্ধান বন্ধ করা কিংবা জীবনের লক্ষ্য থেকে সরে দাঁড়ানো নয়। বরং বৈধ উপায় অবলম্বন করে চেষ্টা করা এবং ফলাফলের জন্য আল্লাহর ওপর ভরসা রাখাই কানাআতের শিক্ষা।
খুতবায় হজরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একটি বাণী উল্লেখ করে তিনি বলেন, আল্লাহ মানুষের জন্য যে বণ্টন করেছেন, তাতে সন্তুষ্ট থাকলে মানুষের মধ্যে সে-ই সবচেয়ে ধনী হয়ে যায়।
দ্বিতীয় খুতবায় শায়খ আল-বুজাইয়ান বলেন, আল্লাহ তায়ালা তাঁর বান্দাদের কল্যাণ ও অকল্যাণ—উভয়টি দিয়ে পরীক্ষা করেন। দরিদ্র ব্যক্তির পরীক্ষা হয় অভাব ও সংকটের মাধ্যমে, আর ধনী ব্যক্তির পরীক্ষা হয় সম্পদের মাধ্যমে।
তিনি অসহায় ও প্রয়োজনগ্রস্ত মানুষের প্রতি সদাচরণের আহ্বান জানান। একই সঙ্গে নিজের নিয়ামত প্রদর্শন ও ছবি প্রকাশের বিষয়ে সতর্ক করে বলেন, এর মাধ্যমে যেন অন্যের মনে কষ্ট বা বঞ্চনার অনুভূতি সৃষ্টি না হয়। কিছু নিয়ামতের শোকর আদায়ের একটি দিক হলো সেগুলো গোপন রাখা।
মুসল্লিদের নিজেদের প্রাপ্ত নিয়ামতের দিকে দৃষ্টি দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, অন্যের বাহ্যিক জীবন দেখে নিজের নিয়ামতকে তুচ্ছ মনে করা উচিত নয়। সূত্র: দ্য গেট টু হারামাইন
জেবি




