নামাজে ইমাম কেরাত পড়তে গিয়ে কোনো আয়াত বা অংশ ভুলে যেতে পারেন। এমন অবস্থায় ইমাম কী করবেন এবং পেছনের মুসল্লিরা কীভাবে সহযোগিতা করবেন, এ বিষয়ে ইসলামে নির্দেশনা রয়েছে।
ফাতেহার পর কেরাতে আটকে গেলে
হানাফি ফিকহ অনুযায়ী ফরজ নামাজের প্রথম দুই রাকাতে সুরা ফাতেহার সঙ্গে অন্য একটি সুরা বা কয়েকটি আয়াত মেলানো ওয়াজিব। ইমাম কেরাতে আটকে গেলে প্রথমে মনে করার চেষ্টা করবেন। এরপরও আটকে থাকলে করণীয় নির্ভর করবে প্রয়োজনীয় পরিমাণ কেরাত পড়া হয়েছে কি না, তার ওপর।
প্রয়োজনীয় পরিমাণ কেরাত পূর্ণ না হলে অন্যকোনো আয়াত বা সুরা থেকে কেরাত চালিয়ে যাওয়া যায়। আর প্রয়োজনীয় পরিমাণ কেরাত হয়ে গেলে অন্য জায়গা থেকে পড়া মাকরুহ। তখন রুকুর সময় হয়ে গেলে রুকুতে চলে যাবেন। হানাফি ফিকহের গ্রন্থ আল-হিদায়ায় এ বিষয়ে ইমামের অন্য আয়াতে চলে যাওয়া অথবা রুকুতে যাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
আল্লাহ বলেন, ‘কোরআন থেকে যতটুকু সহজ, ততটুকু পড়ো।’ (সুরা মুজজাম্মিল: ২০)
আরও পড়ুন: ইমাম ভুল করলে মুক্তাদি আল্লাহু আকবর বলবে নাকি সুবহানাল্লাহ?
ফাতেহা ছুটে গেলে
হানাফি মাজহাবে সুরা ফাতেহা পড়া ওয়াজিব। রুকুতে যাওয়ার আগে ফাতেহা ছুটে যাওয়ার কথা মনে পড়লে তা পড়ে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। রুকু বা পরবর্তী রুকনে চলে যাওয়ার পর বিষয়টি মনে পড়লে হানাফি মতে সেজদায়ে সাহুর বিধান প্রযোজ্য হয়।
শাফেয়ি, মালেকি ও হাম্বলি মাজহাবে ফাতেহা নামাজের রুকন। তাঁদের মতে, ফাতেহা ছাড়া রাকাত পূর্ণ হয় না। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি সুরা ফাতেহা পড়ল না, তার নামাজ নেই।’ (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)
ওয়াজিব ছুটে গেলে সেজদায়ে সাহু
নামাজে কোনো ওয়াজিব ভুলে ছুটে গেলে হানাফি মতে সেজদায়ে সাহু করতে হয়। প্রথম বৈঠক ভুলে ছুটে যাওয়ার পর রাসুলুল্লাহ (স.) সেজদায়ে সাহু করেছেন। (সহিহ বুখারি: ১২২৪)
তবে কেরাতে সামান্য ভুল হলেই প্রতিটি ক্ষেত্রে সেজদায়ে সাহু করতে হয় না। কোন অংশে কী ধরনের ভুল হয়েছে, তার ওপর বিধান নির্ভর করে।
মুসল্লিরা কীভাবে ইমামকে সহযোগিতা করবেন?
ইমাম নামাজে কোনো বিষয় ভুলে গেলে পুরুষ মুসল্লিরা ‘সুবহানাল্লাহ’ বলে তাঁর মনোযোগ আকর্ষণ করবেন। নারীরা হাততালি দেবেন। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘(ইমামের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য) পুরুষদের বেলায় তাসবিহ সুবহানাল্লাহ্ বলা। তবে মহিলাদের বেলায় ‘তাসফিক’ (এক হাতের তালু দিয়ে অন্য হাতের তালুতে মারা)।’ (সহিহ বুখারি: ১২০৩)
আরও পড়ুন: ইমাম সেজদায় থাকলে যেভাবে নামাজে শরিক হবেন
ইমাম এরপরও কেরাতে আটকে থাকলে প্রয়োজন অনুযায়ী আয়াত মনে করিয়ে দেওয়া বা ‘লোকমা’ দেওয়ার বিষয় আসে। মিসওয়ার ইবনে ইয়াজিদ (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (স.) নামাজে কিছু অংশ ছেড়ে দিলে এক ব্যক্তি তা তাঁকে জানান। তখন তিনি বলেন, ‘তুমি আমাকে স্মরণ করিয়ে দিলে না কেন?’ (সুনানে আবু দাউদ: ৯০৭)
লোকমার বিধান নিয়ে মাজহাবভেদে মতপার্থক্য রয়েছে। হানাফি ফিকহে এর কিছু শর্ত রয়েছে-
- প্রয়োজনীয় পরিমাণ কেরাত পূর্ণ না হলে লোকমা নেওয়া জায়েজ। পূর্ণ হয়ে গেলে লোকমা নেওয়া মাকরুহ। তখন ইমাম রুকুতে যাবেন।
- ইমাম আটকে গেলেই সঙ্গে সঙ্গে লোকমা না দিয়ে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করা উচিত।
- ইমামকে স্মরণ করানোর উদ্দেশ্যেই লোকমা দিতে হবে, নিজে তিলাওয়াত করার উদ্দেশ্যে নয়।
- নামাজে শরিক মুসল্লিরাই লোকমা দেবেন।
- অনুমানের ভিত্তিতে ভুল সংশোধন করা উচিত নয়।
খতম তারাবিহর ক্ষেত্রে এ বিধানের বিস্তারিত প্রয়োগ ভিন্ন হতে পারে। তাই এ বিষয়ে নির্দিষ্ট পরিস্থিতির বিধান আলাদা করে বিবেচনা করা হয়।
নামাজ ভেঙে যাওয়ার মতো ভুল হলে
কেরাতে আটকে যাওয়া আর নামাজ ভেঙে যাওয়ার মতো ভুল করা এক বিষয় নয়। হানাফি ফিকহের আলোচনায়, কেরাতের কোনো অংশে এমন ভুল হলে যা নামাজ ফাসেদ হওয়ার কারণ, শুধু অন্য জায়গা থেকে নতুন করে কেরাত শুরু করলেই আগের ভুলের প্রভাব শেষ হয় না। ভুলের অংশ সংশোধন না করে অন্য জায়গা থেকে পড়া শুরু করলেও নামাজের বিধান পরিবর্তিত হবে না।
অর্থাৎ মনে মনে ‘আগের কেরাত বাদ দিলাম, এখন থেকে নতুন করে শুরু করছি’- এমন নিয়ত করলেই আগের ভুল অকার্যকর হয়ে যায় না। এ বিষয়ে ফতোয়ায়ে খানিয়া, ফাতহুল কাদির, শরহুল মুনইয়াহ ও রদ্দুল মুহতারে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে।
কেরাতের ভুলে অর্থ বদলে গেলে
কেরাতের ভুলে আয়াতের অর্থ মারাত্মকভাবে বদলে গেলে নামাজের বিধান ভিন্ন হতে পারে। সামান্য উচ্চারণগত ভুলে সব ক্ষেত্রে নামাজ নষ্ট হয় না। কোন ভুলে কী বিধান হবে, এ বিষয়ে ফকিহদের বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। তাই নির্দিষ্ট ও জটিল পরিস্থিতিতে আলেমের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
তথ্যসূত্র: সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম, সুনানে আবু দাউদ; আল-হিদায়া, ফাতাওয়ায়ে খানিয়া, ফাতহুল কাদির, শরহুল মুনইয়াহ, রদ্দুল মুহতার




