শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

শিশু বড়দের কাতারে দাঁড়ালে কি মুসল্লিদের নামাজ নষ্ট হয়?

ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:৫৫ পিএম

শেয়ার করুন:

শিশু বড়দের কাতারে দাঁড়ালে কি মুসল্লিদের নামাজ নষ্ট হয়?

জামাতে নামাজের সময় নাবালেগ কোনো শিশু বড়দের কাতারে দাঁড়ালে পেছনের মুসল্লিদের নামাজ নষ্ট হয়ে যায়-এমন ধারণা অনেকের আছে। এ কারণে কখনো কখনো শিশুকে বড়দের কাতার থেকে সরিয়ে পেছনে দাঁড় করানো হয়। অথচ হানাফি ফিকহের আলোচনায় এমন কোনো সাধারণ বিধান নেই যে, শিশু বড়দের কাতারে দাঁড়ালেই পেছনের মুসল্লিদের নামাজ নষ্ট হয়ে যাবে।

শিশুর সংখ্যা, তার বোঝার সক্ষমতা এবং নামাজের পরিবেশে তার আচরণ-এসব বিষয় বিবেচনা করে কাতারে তার অবস্থান নির্ধারণের কথা ফিকহের গ্রন্থগুলোতে বলা হয়েছে।

ছোটবেলা থেকেই নামাজের শিক্ষা

ইসলাম সন্তানদের ছোটবেলা থেকেই নামাজের সঙ্গে পরিচিত করার শিক্ষা দিয়েছে। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘তোমরা তোমাদের সন্তানদের সাত বছর বয়সে নামাজের নির্দেশ দাও। তাদের বয়স ১০ বছর হলে নামাজের জন্য শাসন করো এবং তাদের বিছানা পৃথক করে দাও।’ (সুনানে আবু দাউদ: ৪৯৫)

তাই বয়স ও সক্ষমতা অনুযায়ী শিশুকে নামাজের পরিবেশে অভ্যস্ত করা এবং মসজিদের আদব শেখানো অভিভাবকের দায়িত্ব।

আরও পড়ুন: শিশুদের যে বয়সে নামাজ শেখাবেন

নবীজি (স.)-এর নামাজে শিশুর উপস্থিতি

রাসুলুল্লাহ (স.)-এর নামাজে শিশুর উপস্থিতিরও দৃষ্টান্ত রয়েছে। আবু কাতাদা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) তাঁর নাতনি উমামাহকে নামাজের সময় বহন করতেন। সেজদায় যাওয়ার সময় তাঁকে নামিয়ে রাখতেন এবং দাঁড়ানোর সময় আবার তুলে নিতেন। (সহিহ বুখারি: ৫১৬)

এ ঘটনা থেকে বোঝা যায়, শিশুর উপস্থিতি নিজেই নামাজ বা মসজিদের পরিবেশের পরিপন্থী নয়। তবে শিশুর আচরণে মুসল্লিদের ইবাদতে গুরুতর বিঘ্ন সৃষ্টি হলে কিংবা মসজিদের পবিত্রতা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকলে অভিভাবককে সতর্ক থাকতে হবে।

একজন শিশু হলে বড়দের কাতারেই দাঁড়াতে পারে

হানাফি ফিকহের গ্রন্থগুলোতে বলা হয়েছে, একজন শিশু হলে তাকে বড়দের কাতারে দাঁড় করানো যায়। তাকে একা পেছনের কাতারে দাঁড় করানো জরুরি নয়। (রদ্দুল মুহতার: ১/৫৭১, ২/৩১২-৩১৪; আল-বাহরুর রায়েক: ১/৬১৮)

ফলে একজন নাবালেগ শিশু তার বাবা বা অভিভাবকের পাশে বড়দের কাতারে দাঁড়ালে পেছনের মুসল্লিদের নামাজ নষ্ট হবে না।

আরও পড়ুন: শিশু কাঁদলে নামাজ সংক্ষিপ্ত করতেন কেন নবীজি (স.)

একাধিক শিশু হলে কাতার কেমন হবে?

একাধিক শিশু থাকলে সাধারণ নিয়ম হলো, তাদের প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের পেছনে আলাদা কাতারে দাঁড় করানো। তবে তাদের একসঙ্গে পেছনে রাখলে যদি দুষ্টুমি, শোরগোল বা পরস্পরের নামাজে বিঘ্ন ঘটানোর আশঙ্কা থাকে, তাহলে পরিস্থিতি অনুযায়ী তাদের বড়দের কাতারে অভিভাবকের পাশে দাঁড় করানো যেতে পারে।

ফিকহ গ্রন্থে উল্লেখ আছে- শিশুদের একত্রে রাখলে তাদের আচরণের কারণে বড়দের নামাজে সমস্যা হওয়ার আশঙ্কা থাকলে তাদের বড়দের কাতারে অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজন হতে পারে। (রদ্দুল মুহতার: ২/৭৩)

অর্থাৎ কাতারের ক্ষেত্রে মূল লক্ষ্য হলো জামাতের শৃঙ্খলা ও মুসল্লিদের নামাজের পরিবেশ রক্ষা করা।

শিশুর আচরণের দিকেও নজর দিতে হবে

শিশু বড়দের কাতারে দাঁড়াতে পারবে- এর অর্থ তাকে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে ছেড়ে দেওয়া নয়। অভিভাবককে শিশুর আচরণের দিকে নজর রাখতে হবে এবং তাকে মসজিদের আদব শেখাতে হবে।

নামাজরত মুসল্লিকে বিরক্ত না করা, অযথা দৌড়াদৌড়ি বা শোরগোল না করা এবং মসজিদের পবিত্রতা রক্ষা করা- এসব বিষয় শিশুকে বয়স ও বোঝার সক্ষমতা অনুযায়ী শেখানো উচিত।

আরও পড়ুন: সন্তানকে নামাজে অভ্যস্ত করার অফুরন্ত পুরস্কার

শিশু যদি দীর্ঘ সময় ধরে কান্না করে, চিৎকার করে বা এমন আচরণ করে যাতে অন্য মুসল্লিদের নামাজে গুরুতর বিঘ্ন ঘটে, তাহলে অভিভাবকের উচিত তাকে শান্ত করার চেষ্টা করা। প্রয়োজন হলে তাকে নিয়ে বাইরে চলে যেতে হবে।

শিশুর স্বাভাবিক আচরণে ধৈর্য ধরতে হবে

অন্য মুসল্লিদেরও শিশুদের প্রতি সহনশীল হওয়া প্রয়োজন। কোনো শিশু হঠাৎ কেঁদে উঠল, সামান্য নড়াচড়া করল বা অনিচ্ছাকৃতভাবে শব্দ করল; এজন্য তাকে ভয় দেখানো কিংবা অভিভাবককে অপমান করা উচিত নয়।

রাসুলুল্লাহ (স.) শিশুর কান্নার বিষয়টিও নামাজের সময় বিবেচনায় রাখতেন। তিনি বলেছেন, ‘আমি নামাজ দীর্ঘ করার ইচ্ছা করি, কিন্তু শিশুর কান্না শুনে নামাজ সংক্ষিপ্ত করি, তার মায়ের কষ্টের কথা বিবেচনা করে।’ (সহিহ বুখারি: ৭০৭)

তবে সহনশীলতার অর্থ অন্য মুসল্লিদের ইবাদতে গুরুতর বিঘ্ন ঘটতে দেওয়া নয়। এমন পরিস্থিতিতে বিষয়টি শান্তভাবে সামলানোই উত্তম।

শিশুকে মসজিদবিমুখ করা নয়

শিশু সামান্য নড়াচড়া করলেই তাকে মসজিদে আসতে নিষেধ করা উচিত নয়। ছোটবেলা থেকেই মসজিদের পরিবেশের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ শিশুর ইসলামি শিক্ষায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে এই পরিচিতির সঙ্গে শৃঙ্খলাও জরুরি। শিশুকে মসজিদে নিয়ে আসার পাশাপাশি তাকে ধীরে ধীরে মসজিদের আদব শেখাতে হবে, যাতে তার কারণে অন্য মুসল্লিদের ইবাদত ব্যাহত না হয়।

মোটকথা, নাবালেগ শিশু বড়দের কাতারে দাঁড়ালে মুসল্লিদের নামাজ নষ্ট হয়-এমন ধারণা সঠিক নয়। একজন শিশু হলে তাকে বড়দের কাতারে দাঁড়ানো যায়। একাধিক শিশু হলে সাধারণভাবে আলাদা কাতারে রাখা হয়, তবে দুষ্টুমির আশঙ্কা থাকলে পরিস্থিতি অনুযায়ী বড়দের কাতারেও রাখা যেতে পারে।

শিশুকে আদব শেখানো, অভিভাবকের সতর্ক থাকা এবং মুসল্লিদের সহনশীল আচরণ- এই সমন্বয়েই মসজিদের সুন্দর পরিবেশ বজায় রাখা সম্ভব।

তথ্যসূত্র: সহিহ বুখারি; সহিহ মুসলিম; সুনানে আবু দাউদ; রদ্দুল মুহতার; আল-বাহরুর রায়েক; হাশিয়াতুত তাহতাবি আলা মারাকিল ফালাহ

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর