রোববার, ২৩ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

শিশু কাঁদলে নামাজ সংক্ষিপ্ত করতেন কেন নবীজি (স.)

ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: ২৩ আগস্ট ২০২৬, ০৭:৪৮ পিএম

শেয়ার করুন:

শিশু কাঁদলে নামাজ সংক্ষিপ্ত করতেন কেন নবীজি (স.)

নামাজ ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। জামাতে নামাজ আদায়ের সময় ইমামের দায়িত্ব হলো সুন্দরভাবে নামাজ সম্পন্ন করা এবং মুসল্লিদের অবস্থার প্রতিও খেয়াল রাখা। রাসুলুল্লাহ (স.)-এর জীবনে এ বিষয়ে রয়েছে অত্যন্ত মানবিক একটি দৃষ্টান্ত।

নামাজে দাঁড়িয়ে তিনি কখনো দীর্ঘ করে নামাজ পড়াতেন। কিন্তু হঠাৎ কোনো শিশুর কান্নার শব্দ শুনলে নামাজ সংক্ষিপ্ত করে দিতেন। 

হজরত আবু কাতাদা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘আমি নামাজে দাঁড়াই এবং তা দীর্ঘ করার ইচ্ছা করি। কিন্তু কোনো শিশুর কান্নার শব্দ শুনলে আমি আমার নামাজ সংক্ষিপ্ত করে দিই, তার মায়ের কষ্টের কথা বিবেচনা করে।’ (সহিহ বুখারি: ৭০৭)

হাদিসটির এই ছোট্ট ঘটনার মধ্যে নবীজি (স.)-এর অসাধারণ মমতার একটি দিক ফুটে ওঠে। তিনি শুধু শিশুর কান্না শুনেছেন এমন নয়। তিনি শিশুটির মায়ের অবস্থার কথাও ভেবেছেন।

একজন মা জামাতে নামাজ পড়ছেন, আর তাঁর সন্তান কাঁদছে। স্বাভাবিকভাবেই সন্তানের জন্য তাঁর মন অস্থির হয়ে উঠতে পারে। নামাজে মনোযোগ ধরে রাখাও কঠিন হতে পারে। নবীজি (স.) সেই মায়ের কষ্টের বিষয়টি বিবেচনা করেই নামাজ সংক্ষিপ্ত করতেন।

তবে তাঁর এই মমতা শুধু শিশুর কান্না শোনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। নামাজের মধ্যেও তিনি শিশুদের স্বাভাবিক উপস্থিতিকে সহজভাবে গ্রহণ করতেন।

আরও পড়ুন: শিশুদের সিরাত পাঠে অভ্যস্ত করার বিকল্প নেই: শায়খ আহমাদুল্লাহ

হজরত আবু কাতাদা (রা.)-এর আরেক বর্ণনায় এসেছে, রাসুলুল্লাহ (স.) নামাজ পড়ানোর সময় তাঁর নাতনি উমামাহ বিনতে জয়নব (রা.)-কে কোলে তুলে নিতেন। তিনি দাঁড়ালে তাকে কোলে রাখতেন এবং সেজদায় গেলে তাকে নিচে রেখে দিতেন। (সহিহ বুখারি: ৫১৬)

অর্থাৎ শিশুকে তিনি ইবাদতের পরিবেশের বাইরে কোনো বিরক্তিকর উপস্থিতি হিসেবে দেখতেন না। শিশুর স্বাভাবিক প্রয়োজন ও উপস্থিতির প্রতিও তাঁর আচরণ ছিল সহজ ও মমতাপূর্ণ।

আবার একবার তিনি সেজদায় থাকা অবস্থায় তাঁর এক নাতি তাঁর পিঠে চড়ে বসে। তিনি সেজদা দীর্ঘ করেন এবং শিশুটি নিজে থেকে নেমে যাওয়া পর্যন্ত তাড়াহুড়া করেননি। পরে সাহাবিরা বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি জানান, তাঁর নাতি তাঁর পিঠে চড়েছিল এবং সে নিজের ইচ্ছা পূর্ণ করার আগে তাকে নামিয়ে দিতে তিনি পছন্দ করেননি। (সুনানে নাসায়ি: ১১৪১)

এই ঘটনাগুলো একসঙ্গে দেখলে নবীজি (স.)-এর শিশুদের প্রতি মমতার একটি সুন্দর চিত্র পাওয়া যায়। শিশু কাঁদলে তিনি নামাজ সংক্ষিপ্ত করেছেন, আবার শিশু তাঁর সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে সময় কাটালে তার আনন্দেও বাধা দেননি।

তবে এখানে ‘নামাজ সংক্ষিপ্ত করা’ বলতে নামাজের রুকু-সেজদা তাড়াহুড়া করে আদায় করা বোঝায় না। জামাতে থাকা মানুষের পরিস্থিতি বিবেচনা করে নামাজকে সংক্ষিপ্ত রাখাই এর উদ্দেশ্য। হজরত আনাস (রা.) বলেন, তিনি রাসুলুল্লাহ (স.)-এর পেছনে এমন নামাজ আদায় করেছেন, যা একই সঙ্গে সংক্ষিপ্ত ও পূর্ণাঙ্গ ছিল। (সহিহ মুসলিম: ৪৬৯)

আরও পড়ুন: নবীজি যাদের বিশুদ্ধ মনের মানুষ বলেছেন

জামাতে নামাজ সংক্ষিপ্ত রাখার বিষয়ে নবীজি (স.) সাধারণ নির্দেশনাও দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ যখন মানুষকে নিয়ে নামাজ পড়ায়, তখন সে যেন নামাজ সংক্ষিপ্ত করে। কারণ তাদের মধ্যে দুর্বল, অসুস্থ ও বয়স্ক লোক থাকে।’ আর কেউ একা নামাজ পড়লে নিজের ইচ্ছামতো দীর্ঘ করতে পারে। (সহিহ বুখারি: ৭০৩)

অর্থাৎ ইমাম যখন অন্যদের নিয়ে নামাজ পড়াবেন, তখন শুধু নিজের ইবাদতের আগ্রহের কথা ভাবলেই হবে না। তাঁর সঙ্গে যারা নামাজ পড়ছেন, তাদের সামর্থ্য, বয়স, অসুস্থতা ও প্রয়োজনের কথাও বিবেচনা করতে হবে।

শিশুর কান্নার ঘটনাটি তাই শুধু শিশুদের প্রতি নবীজি (স.)-এর মমতার একটি দৃষ্টান্ত নয়। এর মধ্যে রয়েছে ইমামের দায়িত্ব, মুসল্লিদের প্রতি সহমর্মিতা এবং ইবাদতে ভারসাম্যের শিক্ষাও।

আজকের সময়ে ছোট সন্তান নিয়ে মায়েদের অনেক সময় জামাতে নামাজ আদায় করতে হয়। শিশুর কান্না বা অস্থিরতা নিয়ে তাঁরা স্বাভাবিকভাবেই বিব্রত হতে পারেন। এমন পরিস্থিতিতে নবীজি (স.)-এর এই আচরণ আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে।

শিশু কাঁদছে বলে বিরক্ত হওয়া, মাকে বিব্রত করা কিংবা তাকে এমনভাবে দেখা যেন সে কোনো অপরাধ করেছে-এসবের পরিবর্তে প্রয়োজন সহমর্মিতা। শিশুর কান্না তার স্বাভাবিক প্রয়োজনের প্রকাশ। আর একজন মায়ের কাছে সন্তানের কান্না স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগের কারণ।

নবীজি (স.)-এর আচরণ আমাদের শেখায়, ইবাদতের গুরুত্ব যেমন অপরিসীম, তেমনি ইবাদতের সঙ্গে মানুষের কষ্ট ও প্রয়োজন বিবেচনা করাও ইসলামের সৌন্দর্যের অংশ।

একটি শিশুর কান্না শুনে নবীজি (স.) যেমন তার মায়ের কষ্টের কথা ভেবেছিলেন, তেমনি আমাদেরও শিখিয়েছেন- ইবাদতের পথে মানুষের স্বাভাবিক কষ্ট ও প্রয়োজনকে উপেক্ষা না করে সহমর্মিতার সঙ্গে তা বিবেচনা করতে। এটাই ছিল তাঁর মমতা, নেতৃত্ব ও হিকমাহর অনন্য সমন্বয়।

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর