বহুদিন ধরে মদিনার মানুষ প্রিয় নবীজি (স.)-এর আগমনের অপেক্ষায় ছিলেন। অবশেষে সেই প্রতীক্ষার অবসান হয়। তাঁর আগমনের খবর ছড়িয়ে পড়তেই মানুষ তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতে এগিয়ে আসে। দিনটি মদিনাবাসীর জন্য ছিল আনন্দ ও ভালোবাসার এক স্মরণীয় দিন।
প্রতীক্ষার অবসান
মক্কায় দীর্ঘ ১৩ বছর ইসলামের দাওয়াত দেওয়ার পর মহানবী (স.) আল্লাহর নির্দেশে মদিনার উদ্দেশে হিজরত করেন। পথে নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে তিনি প্রথমে কুবায় পৌঁছান এবং সেখানে কিছুদিন অবস্থান করেন। এরপর মদিনার উদ্দেশে যাত্রা করেন।
মদিনাবাসী তাঁর আগমনের অপেক্ষায় ছিলেন। অবশেষে তাঁকে মদিনার দিকে আসতে দেখে আনন্দের সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে। মানুষ ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। যে নবীর জন্য তারা দিনের পর দিন অপেক্ষা করেছিলেন, তাঁকে চোখের সামনে দেখে আনন্দে উদ্বেল হয়ে ওঠে পুরো শহর।
আনাস ইবনে মালিক (রা.) সেই দিনের স্মৃতি বর্ণনা করে বলেন, রাসুলুল্লাহ (স.) যেদিন মদিনায় প্রবেশ করেন, সেদিনের চেয়ে সুন্দর ও আলোকোজ্জ্বল দিন তিনি আর দেখেননি। (মুসনাদে আহমদ)
‘তালা আল বাদরু’র ভালোবাসার সুর
নবীজি (স.)-এর মদিনায় আগমনের সঙ্গে ‘তালা আল বাদরু আলাইনা’ নাশিদটি ইসলামি সংস্কৃতিতে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। এক বর্ণনা অনুযায়ী, নবীজি (স.) মদিনায় এলে তাঁকে স্বাগত জানাতে এই নাশিদ গাওয়া হয়েছিল-
‘তালা আলবাদরু আলাইনা
মিন ছানিয়্যাতিল ওয়াদা
ওজাবাশ শুকরু আলাইনা
মা দা‘আ লিল্লাহি দা’
আরও পড়ুন: নবীজির হিজরত: উম্মে মাবাদের তাঁবুতে অলৌকিক নিদর্শন
এর মর্মার্থ
‘আমাদের ওপর পূর্ণিমার চাঁদ উদিত হয়েছে, ওয়াদা উপত্যকার গিরিপথ থেকে। আল্লাহর পথে আহ্বানকারী যতদিন আহ্বান জানাবেন, ততদিন কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা আমাদের কর্তব্য।’
তবে এই নাশিদ সংক্রান্ত বর্ণনাটির সনদ নিয়ে মুহাদ্দিসদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে। নাশিদটির পঙক্তিতে আনন্দ, কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসার প্রকাশ রয়েছে। এ কারণে এটি দীর্ঘদিন ধরে মুসলিমদের কাছে নবীপ্রেম ও মদিনার স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি পরিচিত সুর।
যে ঘরে উঠলেন নবীজি (স.)
মদিনায় প্রবেশের পর আনসারদের অনেকে নবীজি (স.)-কে নিজেদের বাড়িতে থাকার অনুরোধ করেন। তিনি তাঁদের কাউকে নিরাশ না করে উটনীর পথ ছেড়ে দিতে বলেন এবং জানান, উটনী যেখানে থামবে, সেখানেই তিনি অবস্থান করবেন।
সহিহ বুখারির বর্ণনা অনুযায়ী, নবীজি (স.) প্রথমে মদিনার উপরের অংশে বনু আমর ইবনে আওফের এলাকায় ১৪ রাত অবস্থান করেন। এরপর বনু নাজ্জারের নেতারা তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতে এগিয়ে আসেন। তাঁদের সঙ্গে মদিনায় প্রবেশের পর তিনি আবু আইয়ুব আনসারি (রা.)-এর বাড়ির আঙিনায় অবস্থান নেন। (সহিহ বুখারি: ৩৯৩২)
হিজরতের পর মদিনায় নবীজি (স.)-এর প্রথম আবাসের সঙ্গে এভাবেই আবু আইয়ুব আনসারি (রা.)-এর নাম জড়িয়ে যায়।
আরও পড়ুন: হিজরতের রাত: কোরাইশ হত্যাকারীদের চোখের সামনেই কিভাবে রওনা হলেন নবীজি
মদিনাবাসীর আনন্দ
নবীজি (স.)-এর আগমন মদিনাবাসীর জন্য ছিল অত্যন্ত আনন্দের ঘটনা। মক্কা থেকে আগত মুহাজিরদের আনসাররা আন্তরিকভাবে গ্রহণ করেন এবং তাঁদের ঘর ও সম্পদ ভাগ করে নেন।
আনাস ইবনে মালিক (রা.) নবীজি (স.)-এর মদিনায় প্রবেশের দিনের আনন্দের কথা বর্ণনা করেছেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, রাসুলুল্লাহ (স.) মদিনায় প্রবেশের দিনটির চেয়ে সুন্দর ও আলোকোজ্জ্বল দিন তিনি আর দেখেননি। (মুসনাদ আহমদ)
ভালোবাসায় লেখা এক ইতিহাস
মক্কা থেকে মদিনায় নবীজি (স.)-এর হিজরত ছিল ত্যাগ ও কষ্টে ভরা। জন্মভূমি ও পরিচিত জীবন ছেড়ে তিনি আল্লাহর নির্দেশে নতুন পথে যাত্রা করেন।
মদিনায় পৌঁছে তিনি ভালোবাসা ও সম্মানের সঙ্গে অভ্যর্থনা পান। আনসাররা মুহাজিরদের নিজেদের ভাই হিসেবে গ্রহণ করেন এবং ঘর ও সম্পদ ভাগ করে নেন।
‘তালা আল বাদরু’ মদিনায় নবীজি (স.)-এর আগমনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি বহুল প্রচলিত স্মৃতি। আর আনাস (রা.)-এর বর্ণনায় স্পষ্ট, নবীজি (স.)-এর আগমনের দিনটি মদিনাবাসীর জন্য ছিল অসাধারণ আনন্দের।
মদিনার সেই অভ্যর্থনা আজও আমাদের ত্যাগ, ভ্রাতৃত্ব, আতিথেয়তা ও নবীজি (স.)-এর আদর্শ অনুসরণের শিক্ষা দেয়।
তথ্যসূত্র: সহিহ বুখারি: ৩৯৩২; মুসনাদ আহমদ; ‘তালা আল বাদরু আলাইনা’ সম্পর্কিত বর্ণনা: বায়হাকি, দালাইলুন নবুওয়াহ; ফাতহুল বারি



