রোববার, ২৩ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

মানুষের ভুল সংশোধনে নবীজি (স.)-এর অনন্য পদ্ধতি

ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: ২৩ আগস্ট ২০২৬, ০৭:১১ পিএম

শেয়ার করুন:

নবীজি (স.) সবার সামনে কারও ভুল ধরিয়ে দিতেন কি?

মানুষ মাত্রই ভুল করে। চলাফেরা, কথাবার্তা, কাজকর্ম কিংবা ইবাদত জীবনের নানাক্ষেত্রে মানুষের ভুল হয়ে যেতে পারে। কেউ নিজের ভুল বুঝতে পারে, আবার কেউ বুঝতে পারে না। তখন ভুলটি সংশোধন করে দেওয়া প্রয়োজন। তবে প্রশ্ন হলো, ভুল সংশোধনের পদ্ধতি কেমন হওয়া উচিত?

রাসুলুল্লাহ (স.)-এর জীবনে দেখা যায়, তিনি মানুষের ভুল সংশোধন করতেন হিকমাহ, ধৈর্য ও মমতার সঙ্গে। ভুল ধরিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর উদ্দেশ্য ছিল না কাউকে সবার সামনে ছোট করা। উদ্দেশ্য ছিল ভুলটি দূর করা এবং মানুষটিকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনা।

জনসমক্ষে ভুল সংশোধনের ক্ষেত্রে নবীজি (স.)-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি ছিল ভুলকারীর নাম উল্লেখ না করা। হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, কোনো ব্যক্তির এমন কোনো আচরণ তাঁর কাছে পৌঁছালে যা তিনি অপছন্দ করতেন, তিনি অনেক সময় ব্যক্তির নাম উল্লেখ না করে বলতেন, ‘মানুষের কী হলো যে তারা এমন এমন কথা বলে?’ এভাবে ভুলটি পরিষ্কার করা হতো, আবার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকেও সবার সামনে চিহ্নিত করা হতো না।

এটি ছিল জনসমক্ষে ভুল সংশোধনের অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ একটি পদ্ধতি। ভুলটি থেকে অন্যরা শিক্ষা পেল, কিন্তু নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে সবার সামনে লজ্জিত করা হলো না।

আরও পড়ুন: কাউকে তুচ্ছ করলে কেমন গুনাহ

এর একটি বাস্তব উদাহরণ পাওয়া যায় হজরত মুআবিয়া ইবনে হাকাম আস-সুলামি (রা.)-এর ঘটনায়। একবার তিনি রাসুলুল্লাহ (স.)-এর সঙ্গে নামাজ আদায় করছিলেন। এ সময় এক ব্যক্তি হাঁচি দিলে তিনি তাকে ‘ইয়ারহামুকাল্লাহ’ বলেন। নামাজের মধ্যে কথা বলা সমীচীন না হওয়ায় উপস্থিত সাহাবিরা তাঁর দিকে তাকাতে থাকেন। তিনি তখন তাদের উদ্দেশে বলেন- কী ব্যাপার তোমরা আমার দিকে এবাবে তাকাচ্ছ যে?। সাহাবিরা নিজেদের উরুতে হাত চাপড়ে তাঁকে চুপ থাকার ইঙ্গিত দিলে তিনি চুপ হয়ে যান।

নামাজ শেষে রাসুলুল্লাহ (স.) তাকে ডাকলেন। কিন্তু তিনি তাকে ধমক দিলেন না, কটু কথাও বললেন না। মুআবিয়া (রা.) বলেন, ‘আমি তাঁর আগে ও পরে তাঁর চেয়ে উত্তম কোনো শিক্ষক দেখিনি।’ এরপর নবীজি (স.) তাকে বুঝিয়ে বললেন, নামাজে মানুষের সাধারণ কথাবার্তা বলা সমীচীন নয়। নামাজ হলো তাসবিহ, তাকবির ও কোরআন তেলাওয়াতের সমষ্টি। (সহিহ মুসলিম: ৫৩৭)

লক্ষ করার বিষয় হলো, ভুলটি সবার সামনে হলেও সংশোধনের সময় মানুষটিকে অপমান করা হয়নি।

ছোটদের ক্ষেত্রেও তাঁর সংশোধনের ধরন ছিল অত্যন্ত মমতাপূর্ণ। হজরত ওমর ইবনে আবু সালামা (রা.) বলেন, তিনি ছোটবেলায় রাসুলুল্লাহ (স.)-এর সঙ্গে খাবার খাচ্ছিলেন। তিনি থালার বিভিন্ন দিক থেকে হাত বাড়িয়ে খাবার নিচ্ছিলেন। তখন নবীজি (স.) তাকে বললেন, ‘হে বৎস, আল্লাহর নাম নাও, ডান হাত দিয়ে খাও এবং তোমার সামনের অংশ থেকে খাও।’ (সহিহ বুখারি: ৫৩৭৬)

একটি শিশুর খাওয়ার ভুলও তিনি উপেক্ষা করেননি। তবে সংশোধনের ভাষায় ছিল মমতা। ভুলটি ঠিক করে দেওয়ার পাশাপাশি শিশুটির মর্যাদাও অক্ষুণ্ন রাখা হয়েছিল।

আরও পড়ুন: ১০ ব্যক্তির ওপর নবীজির অভিশাপ

আরেকটি ঘটনা আরও তাৎপর্যপূর্ণ। এক বেদুইন মসজিদের ভেতরে প্রস্রাব করতে শুরু করলে সাহাবিরা তাকে থামাতে এগিয়ে যান। রাসুলুল্লাহ (স.) তাদের বাধা দিলেন এবং লোকটিকে প্রস্রাব শেষ করতে দিলেন। এরপর তাকে বুঝিয়ে বললেন, মসজিদ প্রস্রাব বা ময়লা-আবর্জনা ফেলার জায়গা নয়। এটি আল্লাহর জিকির, নামাজ ও কোরআন তেলাওয়াতের স্থান। (সহিহ মুসলিম: ২৮৫)

এখানে ভুলটি ছিল সবার চোখের সামনে। কিন্তু নবীজি (স.) লোকটিকে অপমান না করে পরিস্থিতি সামাল দিলেন এবং পরে তাকে বিষয়টি বুঝিয়ে দিলেন।

তবে এর অর্থ এই নয় যে, নবীজি (স.) কখনো প্রকাশ্যে ভুল সংশোধন করতেন না। কোনো ভুল প্রকাশ্য হলে বা কোনো বিষয় সম্পর্কে সবার জানা প্রয়োজন হলে তিনি জনসমক্ষেও তা পরিষ্কার করেছেন। আবার প্রয়োজন অনুযায়ী দৃঢ়তাও দেখিয়েছেন।

হজরত আয়েশা (রা.) একটি ছবি থাকা বালিশ ঘরে নিয়ে এলে রাসুলুল্লাহ (স.) তা দেখে অসন্তুষ্ট হন এবং ঘরে প্রবেশ করেননি। পরে তিনি বিষয়টি বুঝিয়ে দেন এবং প্রাণীর ছবি সম্পর্কে সতর্ক করেন। (সহিহ বুখারি: ৫১৮১)

অর্থাৎ ভুল সংশোধনে সবসময় একই পদ্ধতি অনুসরণ করেননি তিনি। কখন ব্যক্তির নাম না নিয়ে সংশোধন করতে হবে, কখন সরাসরি বুঝিয়ে বলতে হবে, আর কখন দৃঢ় হতে হবে পরিস্থিতি বুঝে সেই পদ্ধতি গ্রহণ করাই ছিল তাঁর হিকমাহ।

তাই নবীজি (স.) সবার সামনে কারও ভুল ধরিয়ে দিতেন কি না এর উত্তর এক কথায় ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ নয়।

আরও পড়ুন: নবীজি (স.) যেভাবে কথা বলতেন

তিনি প্রয়োজনে সবার সামনে ভুল সংশোধন করেছেন, তবে কাউকে অপদস্থ করার জন্য নয়। ব্যক্তিগত ভুল হলে অনেক সময় ব্যক্তির নাম উল্লেখ না করে সংশোধন করেছেন। প্রকাশ্য ভুল হলে প্রয়োজন অনুযায়ী প্রকাশ্যেই তা পরিষ্কার করেছেন।

আজ আমরা অনেক সময় ভুল ধরিয়ে দেওয়ার নামে মানুষকেই ছোট করে ফেলি। পরিবারে সন্তান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী, কর্মক্ষেত্রে সহকর্মী কিংবা সমাজে পরিচিত কেউ ভুল করলে সবার সামনে তাকে অপমান করি। অথচ এতে ভুলের সংশোধনের চেয়ে মানুষের আত্মমর্যাদায় আঘাতটাই বড় হয়ে উঠতে পারে।

নবীজি (স.) এর জীবন আমাদের শেখায়- ভুলের বিরুদ্ধে দৃঢ় হতে হবে, কিন্তু ভুলকারী মানুষটির মর্যাদাও রক্ষা করতে হবে। কারও ভুল সংশোধনের সবচেয়ে সুন্দর পদ্ধতি হলো, এমনভাবে তাকে বোঝানো যাতে সে নিজের ভুল বুঝতে পারে, সংশোধনের সুযোগ পায় এবং অপমানিত হয়ে মানুষের কাছ থেকে দূরে সরে না যায়।

নবীজি (স.) ভুল দেখলে মানুষকে ভেঙে দিতেন না, গড়ে তুলতেন। তাঁর সংশোধনে ভুলের প্রতিবাদ ছিল, মানুষের অপমান ছিল না।

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর