পবিত্র কোরআনের বর্ণনা অনুযায়ী মানবজাতির ইতিহাসে সমকামিতার সূচনা হয়েছিল হজরত লূত (আ.)-এর সম্প্রদায়ের মাধ্যমে। তাদের পাপাচার, নবীর সতর্কবার্তা এবং ভয়াবহ পরিণতি আজও মানবজাতির জন্য এক বড় শিক্ষা। ইসলামি শরিয়তে সমকামিতা একটি জঘন্য ও কবিরা গুনাহ। পবিত্র কোরআনে একে চরম অশ্লীলতা এবং সীমালঙ্ঘনের কাজ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
তাফসির ও ইসলামি ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে, হজরত লূত (আ.)-এর সম্প্রদায় সাদ্দূম ও এর আশপাশের জনপদে বসবাস করত। তারা শুধু সমকামিতায় নয়, বরং প্রকাশ্য অশ্লীলতা, দস্যুবৃত্তি, ছিনতাইসহ নানা ধরনের সামাজিক অপরাধেও লিপ্ত ছিল। শয়তানের প্ররোচনা ও কুমন্ত্রণায় তারা এ বিকৃত আচারে জড়িয়ে পড়ে এবং একপর্যায়ে তা তাদের অভ্যাসে পরিণত হয়।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘আমি লূতকে প্রেরণ করেছিলাম। যখন তিনি তাঁর সম্প্রদায়কে বললেন, তোমরা এমন অশ্লীল কাজ করছ, যা তোমাদের আগে সারা বিশ্বের কেউ কখনো করেনি। তোমরা কামপ্রবৃত্তি পূরণের জন্য নারীদের ছেড়ে পুরুষদের কাছে যাচ্ছ। প্রকৃতপক্ষে তোমরা সীমালঙ্ঘনকারী জাতি।’ (সুরা আরাফ: ৮০-৮১)
নবীর আহ্বান ও তাঁর অসহায়ত্ব
হজরত লূত (আ.) দীর্ঘ সময় ধরে তাঁর সম্প্রদায়কে এ পথভ্রষ্টতা থেকে ফিরে আসার আহ্বান জানান। কিন্তু তারা তাঁর দাওয়াত গ্রহণ না করে তাঁকে উপহাস করে এবং জনপদ থেকে বের করে দেওয়ার হুমকি দেয়। তারা বলত, ‘এদেরকে তোমাদের জনপদ থেকে বের করে দাও। এরা তো নিজেদের খুব পবিত্র রাখতে চায়।’ (সুরা আরাফ: ৮২)
আরও পড়ুন: কোনো জাতিকে ধ্বংসের আগে আল্লাহ যেভাবে সতর্ক করেন
একপর্যায়ে সুদর্শন যুবকের বেশে আগত ফেরেশতারা হজরত লূত (আ.)-এর মেহমান হিসেবে তাঁর বাড়িতে এলে পাপাচারীরা তাঁদের ওপর চড়াও হতে উদ্যত হয়। তখন হজরত লূত (আ.) চরম অসহায়ত্ব বোধ করেন। কোরআনে তাঁর সেই মানসিক যন্ত্রণার কথা এভাবে এসেছে, ‘লূত বললেন, হায়, তোমাদের বিরুদ্ধে যদি আমার শক্তি থাকত অথবা আমি কোনো সুদৃঢ় আশ্রয় গ্রহণ করতে পারতাম!’ (সুরা হুদ: ৮০)
লূত (আ.)-এর স্ত্রীর ভূমিকা
হজরত লূত (আ.)-এর স্ত্রীও ধ্বংসপ্রাপ্ত সেই সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তিনি স্বামীর প্রতি ঈমান আনেননি। পাপাচারীদের সহযোগিতা করেছিলেন এবং ফেরেশতাদের আগমনের সংবাদ তাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন। এ কারণে তিনিও আল্লাহর শাস্তি থেকে রক্ষা পাননি। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তাকে (লূতের স্ত্রী) ছাড়া; সে ছিল পেছনে থেকে যাওয়া লোকদের অন্তর্ভুক্ত।’ (সুরা হিজর: ৬০)
এ ঘটনা থেকে শিক্ষা পাওয়া যায়, পাপে সরাসরি জড়িত না হলেও পাপীদের সহযোগিতা বা সমর্থন করা আল্লাহর কাছে গুরুতর অপরাধ।
আরও পড়ুন: নুহ (আ.)-এর যে দোয়ায় পুরো জাতি ধ্বংস হয়েছিল
যেভাবে ধ্বংস হয়েছিল সেই জাতি
আল্লাহর নির্দেশে হজরত লূত (আ.)-কে রাতের শেষ ভাগে পরিবার ও অনুসারীদের নিয়ে জনপদ ত্যাগ করতে বলা হয়। এরপর ফেরেশতারা আল্লাহর নির্ধারিত শাস্তি কার্যকর করেন। কোরআনে ইরশাদ হয়েছে,
‘অবশেষে যখন আমার আদেশ এলো, তখন আমি সেই জনপদকে উল্টে দিলাম এবং তাদের ওপর স্তরে স্তরে পাথর বর্ষণ করলাম।’ (সুরা হুদ: ৮২)
বহু মুফাসসির ও ঐতিহাসিকের মতে, বর্তমান জর্ডান ও ফিলিস্তিন সীমান্তবর্তী ‘মৃত সাগর’ (ডেড সি) বা ‘বাহরে লূত’ অঞ্চলটি সেই ধ্বংসপ্রাপ্ত এলাকার সঙ্গে সম্পর্কিত। এর অত্যধিক লবণাক্ততার কারণে অধিকাংশ জলজ প্রাণী সেখানে বেঁচে থাকতে পারে না। মুসলিম ঐতিহ্যে এ অঞ্চলকে আল্লাহর শাস্তির এক ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
রাসুলুল্লাহ (স.)-এর সতর্কবাণী
কওমে লূত (আ.)-এর ঘটনা শুধু অতীতের ইতিহাস নয়, বরং পরবর্তী উম্মতের জন্যও কঠোর সতর্কবার্তা। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘আমার উম্মতের ব্যাপারে আমি সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টির আশঙ্কা করি, তা হলো লূত সম্প্রদায়ের কাজ।’ (ইবনে মাজাহ: ২৫৬৩)
অন্য এক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (স.) লূত (আ.)-এর সম্প্রদায়ের মতো কুকর্মে লিপ্ত ব্যক্তিদের ব্যাপারে কঠোর শাস্তির নির্দেশ দিয়েছেন। (আবু দাউদ: ৪৪৬২)
ইসলামে মানুষের মর্যাদা, অধিকার ও স্বাধীনতা স্বীকৃত। তবে সেই স্বাধীনতা আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখার মধ্যে। কওমে লূত (আ.)-এর ঘটনা কেবল অতীতের একটি ইতিহাস নয়, মানবজাতির জন্য এক স্থায়ী সতর্কবার্তা। একজন মুমিনের দায়িত্ব হলো এ ঘটনা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা, আল্লাহর নির্ধারিত বিধান মেনে চলা এবং সমাজে শালীনতা ও নৈতিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখা।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে সঠিক পথে চলার তাওফিক দান করুন। আমিন।
তথ্যসূত্র: পবিত্র কোরআন (সুরা আরাফ, সুরা হুদ, সুরা হিজর), তাফসির ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, সুনানে ইবনে মাজাহ, সুনানে আবু দাউদ




