শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

রোজা রাখতে না পারলেও আশুরার বরকত পাবেন যেভাবে

ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: ২৪ জুন ২০২৬, ০৩:২৪ পিএম

শেয়ার করুন:

রোজা রাখতে না পারলেও আশুরার বরকত পাবেন যেভাবে

মহররম মাসের ১০ তারিখ আশুরা ইসলামে অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ একটি দিন। এ দিনের রোজার ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ (স.) বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন। ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘আমি রাসুলুল্লাহ (স.)-কে রমজান ছাড়া অন্যকোনো দিনের রোজাকে আশুরার দিনের রোজার মতো এত গুরুত্ব দিতে দেখিনি।’ (সহিহ বুখারি: ২০০৬) রাসুলুল্লাহ (স.) আরও বলেন, ‘আমি আল্লাহর কাছে আশা করি, আশুরার দিনের রোজা বিগত এক বছরের গুনাহের কাফফারা হবে।’ (সহিহ মুসলিম: ১১৬২)

তবে অসুস্থতা, সফর, বার্ধক্য, গর্ভাবস্থা বা অন্য কোনো শরিয়তসম্মত কারণে অনেকের পক্ষে এই রোজা রাখা সম্ভব হয় না। প্রশ্ন হলো, রোজা রাখতে না পারলে কি আশুরার ফজিলত থেকে বঞ্চিত হতে হবে? ইসলামের শিক্ষা হলো- না। রোজা এ দিনের সর্বোত্তম আমল হলেও বরকত অর্জনের আরও বহু পথ রয়েছে। যারা শরিয়তসম্মত কারণে রোজা রাখতে পারছেন না, তাদের জন্যও এ দিনের বরকত অর্জনের পথ খোলা আছে। রোজার পাশাপাশি আরও বহু নেক আমলের মাধ্যমে আশুরার ফজিলত লাভ করা সম্ভব।

১. তওবা ও ইস্তেগফার করা

আশুরার মতো ফজিলতপূর্ণ দিনগুলো তওবা ও আত্মশুদ্ধির জন্য গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে তওবা কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।’ (সুরা নূর: ৩১)

২. দোয়া ও মোনাজাত করা

রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘দোয়াই হলো ইবাদত।’ (সুনানে তিরমিজি: ২৯৬৯) এ দিন নিজের, পরিবার, দেশ ও সমগ্র মুসলিম উম্মাহর জন্য আন্তরিকভাবে দোয়া করা যেতে পারে।

আরও পড়ুন: আশুরার দিন যেসব দোয়ার গুরুত্ব রয়েছে

৩. কোরআন তেলাওয়াত করা

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই যারা আল্লাহর কিতাব তেলাওয়াত করে... তারা এমন ব্যবসার আশা করে যা কখনো ক্ষতিগ্রস্ত হবে না।’ (সুরা ফাতির: ২৯)

৪. জিকির ও দরুদ পাঠ করা

রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় কথা চারটি- সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ এবং আল্লাহু আকবার।’ (সহিহ মুসলিম: ২১৩৭) পাশাপাশি বেশি বেশি দরুদ পাঠও উত্তম। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি আমার ওপর একবার দরুদ পাঠ করে, আল্লাহ তার ওপর দশবার রহমত বর্ষণ করেন।’ (সহিহ মুসলিম: ৪০৮)

৫. দান-সদকা করা

রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘সদকা গুনাহকে নিভিয়ে দেয়, যেমন পানি আগুনকে নিভিয়ে দেয়।’ (সুনানে তিরমিজি: ২৬১৬) অভাবী, এতিম, মিসকিন ও অসহায় মানুষের সাহায্যে সাধ্যানুযায়ী দান করা যেতে পারে।

আরও পড়ুন: আশুরা নিয়ে প্রচলিত ১১ ভুল ধারণা

৬. আত্মীয়তার সম্পর্ক সুদৃঢ় করা

রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘যে চায় তার রিজিক বৃদ্ধি পাক এবং আয়ুতে বরকত হোক, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।’ (সহিহ বুখারি: ৫৯৮৬) আশুরার দিনে আত্মীয়স্বজনের খোঁজ নেওয়া, সম্পর্কের টানাপোড়েন দূর করা এবং কোনো মনোমালিন্য থাকলে তা মিটিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া উত্তম আমল।

৭. নফল নামাজ আদায় করা

হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ বলেন, ‘বান্দা নফল ইবাদতের মাধ্যমে আমার নৈকট্য অর্জন করতে থাকে। এমন কি অবশেষে আমি তাকে আমার এমন প্রিয়পাত্র বানিয়ে নেই যে, আমিই তার কান হয়ে যাই, যা দিয়ে সে শুনে। আমিই তার চোখ হয়ে যাই, যা দিয়ে সে দেখে। আর আমি তার হাত হয়ে যাই, যা দিয়ে সে ধরে। আমিই তার পা হয়ে যাই, যা দ্বারা সে চলে। সে যদি আমার কাছে কোনো কিছু চায়, আমি নিশ্চয়ই তাকে তা দান করি। আর যদি সে আমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে, তবে অবশ্যই আমি তাকে আশ্রয় দেই।’ (সহিহ বুখারি: ৬৫০২)

৮. হজরত মুসা (আ.)-এর ঘটনা স্মরণ করা

আশুরার দিনের সঙ্গে হজরত মুসা (আ.) ও বনি ইসরাইলের মুক্তির ঐতিহাসিক স্মৃতি জড়িত। রাসুলুল্লাহ (স.) ইহুদিদের বলেছিলেন, ‘মুসার ব্যাপারে আমরা তোমাদের চেয়ে বেশি হকদার।’ (সহিহ বুখারি: ২০০৪) এ ঘটনা থেকে আল্লাহর সাহায্য, ধৈর্য, কৃতজ্ঞতা এবং সত্যের চূড়ান্ত বিজয়ের শিক্ষা গ্রহণ করা যায়।

আরও পড়ুন: আশুরার সঠিক ইতিহাস কী? সহিহ ও জাল বর্ণনার বিশ্লেষণ 

৯. গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার অঙ্গীকার করা

মহররম 'আশহুরে হুরুম' বা সম্মানিত মাসগুলোর একটি। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে মাসের সংখ্যা বারোটি... এর মধ্যে চারটি সম্মানিত মাস।’ (সুরা তওবা: ৩৬) এ দিনে মিথ্যা, গিবত, হিংসা, জুলুম ও হারাম কাজ থেকে বেঁচে থাকার দৃঢ় সংকল্প করা উচিত।

আশুরাকে ঘিরে প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা

কিছু সমাজে আশুরার দিনে বিশেষ খাবার রান্না, নির্দিষ্ট রঙের পোশাক পরা বা বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতা পালনের রেওয়াজ প্রচলিত আছে। এসবের পক্ষে সহিহ ও নির্ভরযোগ্য কোনো দলিল পাওয়া যায় না। তাই কোরআন-সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত আমলগুলোর প্রতিই গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

শেষ কথা

আশুরার সর্বোত্তম আমল রোজা। তবে শরিয়তসম্মত কারণে কেউ তা রাখতে না পারলে কল্যাণের দরজা বন্ধ হয়ে যায় না। তওবা, দোয়া, কোরআন তেলাওয়াত, জিকির, দরুদ, দান-সদকা ও নফল ইবাদতের মাধ্যমে এ দিনের বরকত অর্জনের চেষ্টা করা যায়। আল্লাহ বান্দার আন্তরিকতা ও তাকওয়ার মূল্যায়ন করেন। তাই রোজা রাখতে না পারলেও আশুরার দিনটি যেন নেক আমল, আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের এক মূল্যবান সুযোগ হয়ে ওঠে।

তথ্যসূত্র: সুরা নূর: ৩১; সুরা ফাতির: ২৯; সুরা তওবা: ৩৬; সহিহ বুখারি: ২০০৪, ২০০৬, ৫৯৮৬, ৬৫০২; সহিহ মুসলিম: ৪০৮, ১১৬২, ২১৩৭; সুনানে তিরমিজি: ২৬১৬, ২৯৬৯

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর