মহররম মাসের ১০ তারিখ ‘আশুরা’ ইসলামের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ ও ফজিলতপূর্ণ দিন। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে হজরত মুসা (আ.) ও বনি ইসরাইলের ফেরাউনের কবল থেকে মুক্তি, বহু নবীর জীবনের স্মরণীয় ঘটনা এবং সিয়াম পালনের মতো গুরুত্বপূর্ণ আমল। তবে সময়ের প্রবাহে বিভিন্ন অনির্ভরযোগ্য বই ও লোককথার মাধ্যমে এ দিনটিকে ঘিরে বহু ভিত্তিহীন বিশ্বাস, জাল বর্ণনা ও বিদআত সমাজে ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে অনেক মানুষ সুন্নাহভিত্তিক আমলের চেয়ে প্রচলিত লৌকিক রীতিকেই বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। নিচে এ সংক্রান্ত প্রচলিত ভুল ধারণা এবং দলিলভিত্তিক সঠিক তথ্য তুলে ধরা হলো।
১. আশুরার গুরুত্ব শুধু কারবালার কারণেই প্রতিষ্ঠিত
অনেকের ধারণা, ইমাম হুসাইন (রা.)-এর শাহাদাতের কারণেই আশুরার মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে কারবালার ঘটনার (৬১ হিজরি) বহু আগে থেকেই আশুরা ইসলামে গুরুত্বপূর্ণ দিন হিসেবে পরিচিত ছিল।
ইবনে আব্বাস (রা.)-এর বর্ণনা অনুযায়ী, রাসুলুল্লাহ (স.) মদিনায় এসে দেখেন, ইহুদিরা এ দিনে রোজা রাখে। কারণ, এদিন আল্লাহ তাআলা মুসা (আ.) ও তাঁর সম্প্রদায়কে ফেরাউনের হাত থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। তখন তিনি বলেন, ‘মুসার ব্যাপারে আমরাই তোমাদের চেয়ে বেশি হকদার।’ এরপর তিনি নিজে রোজা রাখেন এবং সাহাবিদেরও রোজা রাখার নির্দেশ দেন। (সহিহ বুখারি: ২০০৪)
২. মহররমের ১০ দিন রোজা রাখলে ১০ হাজার বছরের সওয়াব
সমাজে প্রচলিত কিছু বইয়ে দাবি করা হয়, মহররমের প্রথম ১০ দিন রোজা রাখলে ১০ হাজার বছরের ইবাদতের সওয়াব পাওয়া যায়। মুহাদ্দিসদের মতে, এটি সম্পূর্ণ বানোয়াট ও জাল বর্ণনা।
বিজ্ঞাপন
ইমাম ইবনুল জাওজি (রহ.) এ ধরনের বর্ণনাকে ‘মাওজু’ (জাল) বলে উল্লেখ করেছেন। (আল-মাওজুয়াত, ইমাম ইবনুল জাওজি)
মুহাররমের নফল রোজার ফজিলত অবশ্যই আছে, তবে কাল্পনিক সংখ্যা ও অতিরঞ্জিত প্রতিদানের মাধ্যমে তা প্রচার করা সঠিক নয়।
আরও পড়ুন: আশুরার দিনের যে ভুল আপনার আমল ধ্বংস করবে
৩. শুধু ১০ তারিখে একটি রোজা রাখাই যথেষ্ট
অনেকে মনে করেন, কেবল ১০ মহররমে রোজা রাখাই পূর্ণ সুন্নাহ আদায়। প্রকৃতপক্ষে ইহুদিদের সঙ্গে সাদৃশ্য এড়াতে রাসুলুল্লাহ (স.) ৯ তারিখেও রোজা রাখার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন।
তিনি বলেন, ‘আমি যদি আগামী বছর জীবিত থাকি, তবে অবশ্যই নবম তারিখেও রোজা রাখব।’ (সহিহ মুসলিম: ১১৩৪)
তাই ৯-১০ অথবা ১০-১১ মহররম মিলিয়ে দুটি রোজা রাখা অধিক উত্তম বলে আলেমগণ উল্লেখ করেছেন।
৪. আশুরার রাতে বিশেষ পদ্ধতির নামাজ
প্রচলিত আছে যে আশুরার রাতে ১২ রাকাত, ১০০ রাকাত বা নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে নামাজ আদায় করলে জীবনের সব গুনাহ মাফ হয়ে যায়।
মুহাদ্দিসগণ এজাতীয় সব বর্ণনাকে জাল ও ভিত্তিহীন বলে চিহ্নিত করেছেন। ইমাম ইবনুল জাওজি (রহ.) আশুরাকেন্দ্রিক বিশেষ নামাজের বর্ণনাগুলোকে ‘মাওজু’ বা জাল আখ্যা দিয়েছেন। (আল-মাওজুয়াত)
আল্লামা লখনবী (রহ.)-ও এ সংক্রান্ত বর্ণনাগুলোকে বানোয়াট বলে উল্লেখ করেছেন। (আল-আসারুল মারফুআহ ফিল আখবারিল মাওজুআহ)
৫. নির্দিষ্ট আমলে সব গুনাহ নিশ্চিতভাবে মাফ হয়ে যায়
কিছু গ্রন্থে দাবি করা হয়, আশুরার রাতে নির্দিষ্টসংখ্যক নামাজ বা তাসবিহ পড়লে নিশ্চিত জান্নাত কিংবা সব গুনাহ মাফের নিশ্চয়তা মেলে।
এ ধরনের বর্ণনার কোনো নির্ভরযোগ্য ভিত্তি নেই। ইবাদতের ক্ষেত্রে কেবল কোরআন ও সহিহ সুন্নাহর দলিলই গ্রহণযোগ্য।
৬. বিশেষ গোসল বা ঘরবাড়ি পরিষ্কারের আলাদা সওয়াব
ধারণা প্রচলিত আছে যে আশুরার দিন বিশেষভাবে গোসল করলে বা ঘরবাড়ি পরিষ্কার করলে সারা বছর রোগ-ব্যাধি কিংবা দারিদ্র্য থেকে নিরাপদ থাকা যায়।
এ বিষয়ে কোনো সহিহ হাদিস পাওয়া যায় না। তাই সওয়াবের আশায় এ ধরনের কাজকে ধর্মীয় আমল মনে করা ঠিক নয়।
আরও পড়ুন: গুনাহ মাফের ২৩ আমল
৭. সুরমা, মেহেদি বা তেল ব্যবহারে বিশেষ সওয়াব
প্রচলিত আছে, আশুরার দিন চোখে সুরমা লাগালে সারা বছর চোখের রোগ হয় না কিংবা মেহেদি বা তেল ব্যবহারের বিশেষ ফজিলত আছে।
অনেক আলেম ও মুহাদ্দিস এ ধরনের বর্ণনাকে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে উল্লেখ করেছেন। তাই এগুলোকে সুন্নাহ বা বিশেষ আমল মনে করা সঠিক নয়।
৮. খিচুড়ি বা বিশেষ খাবার রান্না করা সওয়াবের কাজ
কিছু অঞ্চলে প্রচলিত আছে, আশুরার দিনে খিচুড়ি, হালুয়া-রুটি বা বিশেষ খাবার রান্না করা ধর্মীয়ভাবে ফজিলতপূর্ণ কাজ।
বাস্তবে এ ধরনের আচারকে সুন্নাহ প্রমাণ করে এমন কোনো সহিহ দলিল নেই। খাবার রান্না করা বৈধ কাজ হলেও তা ধর্মীয় মর্যাদাসম্পন্ন আমল হিসেবে প্রচার করা উচিত নয়।
৯. মাতম, আত্মনিপীড়ন ও শোক পালনকে ইবাদত মনে করা
কারবালার শোকে বুক চাপড়ানো, শরীর রক্তাক্ত করা বা উচ্চস্বরে বিলাপ করাকে অনেকে ইবাদত বা শ্রদ্ধা প্রকাশের মাধ্যম মনে করেন।
কারবালার ঘটনা মুসলিম উম্মাহর ইতিহাসের অত্যন্ত হৃদয়বিদারক অধ্যায় হলেও এ ধরনের আত্মনিপীড়নমূলক আচরণ ইসলামে অনুমোদিত নয়।
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘সে আমাদের দলভুক্ত নয়, যে (মৃত ব্যক্তির জন্য) গন্ডে চপেটাঘাত করে, জামার বক্ষ ছিন্ন করে এবং জাহিলি যুগের মতো চিৎকার দেয়।’ (সহিহ বুখারি: ১২৯৪)
১০. আশুরাকে কেবল শোক বা কেবল আনন্দ-উৎসবের দিনে পরিণত করা
একদল মানুষ আশুরাকে সম্পূর্ণ শোকের দিনে পরিণত করেছে, আবার অন্যরা একে আনন্দ-উৎসব, আলোকসজ্জা বা বিশেষ আয়োজনের দিনে রূপ দিয়েছে।
ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে আশুরা শোকের উৎসবও নয়, আনন্দের উৎসবও নয়; বরং এটি ইবাদত, কৃতজ্ঞতা, তওবা ও শিক্ষা গ্রহণের দিন।
১১. মহররম মাসে বিয়ে করা অশুভ
আমাদের সমাজে অনেকের বিশ্বাস, মহররম মাসে বিয়ে করলে অমঙ্গল হয় বা সংসারে অশান্তি নেমে আসে। মূলত কারবালার ঘটনার সঙ্গে আবেগগত সম্পর্কের কারণে এ ধারণা ছড়িয়ে পড়েছে।
কিন্তু কোরআন-হাদিসে মহররম মাসে বিয়ে নিষিদ্ধ বা অপছন্দনীয় হওয়ার কোনো প্রমাণ নেই। ইসলামে কোনো হালাল কাজকে অশুভ মনে করা বৈধ নয়। তাই মহররমে বিয়ে করা বা অন্য কোনো বৈধ কাজ থেকে বিরত থাকার কোনো শরয়ি ভিত্তি নেই।
আশুরার প্রকৃত শিক্ষা
আশুরা মুসলমানদের জন্য কৃতজ্ঞতা, তওবা, ধৈর্য, সত্যের পক্ষে অবিচল থাকা এবং সুন্নাহ অনুসরণের শিক্ষা বহন করে। এ দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রমাণিত আমল হলো রোজা রাখা।
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘আমি আল্লাহর কাছে আশা করি, আশুরার রোজা পূর্ববর্তী এক বছরের গুনাহের কাফফারা হবে।’ (সহিহ মুসলিম: ১১৬২)
সমাজে আশুরাকে ঘিরে প্রচলিত অনেক গল্প, ঘটনা বা আমলের বিবরণের কোনো সহিহ সূত্র নেই; কিছু দুর্বল, কিছু সম্পূর্ণ জাল। তাই আশুরা সংক্রান্ত যেকোনো আমল গ্রহণের আগে কোরআন, সহিহ হাদিস এবং নির্ভরযোগ্য আলেমদের বক্তব্য যাচাই করা জরুরি।
কুসংস্কার, জাল বর্ণনা ও বিদআত থেকে দূরে থেকে সহিহ সুন্নাহ অনুযায়ী এ দিন পালন করাই একজন মুসলিমের দায়িত্ব। কেননা ইসলাম আবেগের নয়, দলিলের অনুসরণ শিক্ষা দেয়।




