জুমার খুতবা চলাকালে অনেক মুসল্লিকে দুই হাঁটু জড়িয়ে আরাম করে বসতে দেখা যায়। অথচ এই সাধারণ অভ্যাসটি নিয়েই রয়েছে হাদিস, ফিকহি আলোচনা এবং আলেমদের ভিন্নমত। খুতবার সময় বসার আদব নিয়ে ইসলামি শরিয়ত কী বলে?
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! জুমার দিনে নামাজের জন্য আহ্বান করা হলে তোমরা আল্লাহর স্মরণের দিকে ধাবিত হও...।’ (সুরা জুমা: ৯) জুমার দিনের কেন্দ্রবিন্দু হলো খুতবা। আমরা অনেকেই খুতবা শোনার জন্য মসজিদে আগেভাগে গিয়ে বসি, কিন্তু বসার ভঙ্গি নিয়েও যে শরিয়তের কিছু নির্দেশনা রয়েছে, তা অনেকের অজানা। সামান্য অসচেতনতায় খুতবার মনোযোগ ও সওয়াব দুটোই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বিজ্ঞাপন
যে ভঙ্গিতে বসা নিয়ে নিষেধাজ্ঞা এসেছে: ‘হাবওয়া’
মসজিদে আরাম করে বসার জন্য অনেকে দুই হাঁটু খাড়া করে পেটের সাথে লাগিয়ে হাত বা কাপড় দিয়ে জড়িয়ে বসেন। শরিয়তের পরিভাষায় এই ভঙ্গিকে বলা হয় ‘হাবওয়া’ বা ‘ইহতিবা’। হজরত মুয়াজ ইবনে আনাস (রা.)-এর পিতা থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) জুমার দিন ইমামের খুতবা চলাকালীন এভাবে বসতে নিষেধ করেছেন (সুনানে আবু দাউদ: ১১১০; জামে তিরমিজি: ৫১৪; মুসনাদে আহমদ: ১৫৬৩০)
আরও পড়ুন: খুতবার সময় একটি ‘টু শব্দ’ কেড়ে নিতে পারে জুমার ফজিলত
এ বিষয়ে আলেমদের মতপার্থক্য
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করা দরকার, যা অনেক লেখায় উহ্য থেকে যায়। ইমাম তিরমিজি (রহ.) স্বয়ং এই হাদিসের পরে উল্লেখ করেছেন যে, একদল আলেম খুতবার সময় হাবওয়া করাকে অপছন্দ করতেন, আবার আরেকদল এতে কোনো অসুবিধা দেখতেন না, যাদের মধ্যে ছিলেন হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রা.)। ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল ও ইসহাক ইবনে রাহওয়াইহ (রহ.)-এরও মত ছিল, হাবওয়া করায় কোনো সমস্যা নেই। ইমাম আবু দাউদ (রহ.) নিজেও উল্লেখ করেছেন, ইবনে উমার, আনাস ইবনে মালিক, সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িব (রা.)-সহ একাধিক সাহাবি ও তাবিয়িকে খুতবার সময় হাবওয়া করতে দেখা গেছে এবং তাঁরা একে দোষের মনে করতেন না।
অর্থাৎ অনেক ফকিহের মতে হাদিসে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও তা হারামের পর্যায়ে নয়; বরং মাকরুহ বা অনুত্তম হিসেবে গণ্য। তাই যথাসম্ভব এড়িয়ে চলাই উত্তম, তবে কেউ এভাবে বসলে তাকে গুনাহগার বলা যাবে না।
কেন এই ভঙ্গি অপছন্দনীয়?
আলেমগণ এর পেছনে কয়েকটি কারণ উল্লেখ করেছেন। প্রথমত, এভাবে বসলে শরীরে অতিরিক্ত আরাম বোধ হওয়ায় দ্রুত তন্দ্রা চলে আসার আশঙ্কা থাকে, যাতে খুতবা শোনায় ব্যাঘাত ঘটে। দ্বিতীয়ত, প্রাচীন আরবে সাহাবিরা সাধারণত একটি কাপড় বা চাদর পরতেন, ফলে এভাবে বসলে কাপড় সরে সতর প্রকাশের ঝুঁকি ছিল। তৃতীয়ত, এই আরামদায়ক ভঙ্গি খুতবা শ্রবণের গাম্ভীর্য ও মনোযোগ নষ্ট করতে পারে।
খুতবার সময় কীভাবে বসা উত্তম?
খুতবা চলাকালীন একটি নির্দিষ্ট ভঙ্গিতে বসা ফরজ নয়, তবে ফকিহগণের মতে সর্বোত্তম হলো নামাজের বৈঠকের মতো (তাশাহহুদের ভঙ্গিতে) বসা। দীর্ঘক্ষণ এভাবে বসা কষ্টকর হলে স্বাভাবিকভাবে পালথি গেড়ে (দুই পা ভাঁজ করে) বসাও জায়েজ। প্রয়োজন ছাড়া দেয়াল বা থামে হেলান দেওয়া অনুত্তম মনে করা হলেও, বৃদ্ধ বা অসুস্থ ব্যক্তির জন্য এতে কোনো অসুবিধা নেই।
আরও পড়ুন: বাংলায় জুমার খুতবা দিলে তার পেছনে নামাজ পড়া যাবে?
বসার ভঙ্গির বাইরেও যা সওয়াব কমিয়ে দিতে পারে
শুধু বসার ভঙ্গিই নয়, খুতবা চলাকালীন আরও কিছু কাজ জুমার পূর্ণ সওয়াব থেকে বঞ্চিত করতে পারে।
কথা বলা সম্পূর্ণ নিষেধ। এমনকি পাশের জনকে ‘চুপ করুন’ বলাও নিষেধ। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, তুমি যদি জুমার দিন খুতবা চলাকালে তোমার সঙ্গীকে বলো, ‘চুপ করো’, তবুও তুমি অনর্থক কাজ করলে। (সহিহ বুখারি: ৯৩৪, সহিহ মুসলিম)
অনুরূপভাবে অহেতুক হাত নাড়াচাড়া করা, কাঁকর নিয়ে খেলাও নিষেধ। রাসুলুল্লাহ (স.) এক ব্যক্তিকে কাঁকর নিয়ে খেলতে দেখে বলেছিলেন, ‘যে কাঁকর নিয়ে খেলল, সে অনর্থক কাজ করল।’ (সহিহ মুসলিম) বর্তমান যুগে মোবাইল ফোন স্ক্রল করা, তসবিহ বা কলম নাড়াচাড়া করাকেও আলেমগণ এই হাদিসের আলোকে একই ধরনের মনোযোগ-বিনষ্টকারী কাজ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।
এছাড়া হাতের আঙুল ফোটানো বা একে অপরের আঙুলের মধ্যে আঙুল ঢুকিয়ে জড়ানো (তাশবিক) খুতবার আদবের পরিপন্থী বলে গণ্য।
দুই খুতবার মাঝে ইমাম যখন স্বল্প সময়ের জন্য বসেন, তখনও মুসল্লিদের নীরব থাকা এবং দোয়া-ইস্তেগফারে মশগুল থাকা উত্তম।
জুমার খুতবা একটি গুরুত্বপূর্ণ সাপ্তাহিক ইবাদত, যেখানে ইমাম মিম্বরে ওঠা থেকে নামাজ শেষ হওয়া পর্যন্ত সময়টুকু বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ। হাবওয়ার মতো ভঙ্গি নিয়ে আলেমদের মাঝে মতভেদ থাকলেও অনেক ফকিহের মতে তা এড়িয়ে চলাই শ্রেয়। তবে এর চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো নীরবতা ও পূর্ণ মনোযোগ বজায় রাখা যেমন কথা না বলা, অহেতুক নড়াচড়া বা মোবাইল ব্যবহার থেকে বিরত থাকা।
খুতবার সময় বসার আদবের মূল শিক্ষা একটাই- এমনভাবে বসা, যাতে মনোযোগ সহকারে আল্লাহর স্মরণ ও নসিহত শোনা যায়। সামান্য সচেতনতাই জুমার ইবাদতকে আরও পরিপূর্ণ ও কবুলযোগ্য করে তুলতে পারে।
তথ্যসূত্র: আবু দাউদ: ১১১০; তিরমিজি: ৫১৪; মুসনাদে আহমদ: ১৫৬৩০; সহিহ বুখারি: ৯৩৪; সহিহ মুসলিম, সহিহ আবু দাউদ




