পবিত্র কোরআনে কেয়ামতের দিনকে ‘ইয়াওমুল হাসরাহ’ বা ‘আফসোসের দিন’ বলা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তাদের সতর্ক করো আফসোসের দিন সম্পর্কে, যখন সব বিষয়ের ফয়সালা হয়ে যাবে।’ (সুরা মারিয়াম: ৩৯) সেদিন অবিশ্বাসীরা নিজেদের অবাধ্যতার কারণে যেমন গভীর অনুশোচনায় ভুগবে, তেমনি মুমিনরাও কিছু নেক আমল থেকে বঞ্চিত হওয়ার জন্য অনুতপ্ত হবে। কোরআন-হাদিসের আলোকে এমন কয়েকটি কারণ তুলে ধরা হলো।
মুমিনদের আফসোসের কারণ
১. দায়িত্ব ও নেতৃত্বের অপব্যবহার
ক্ষমতা ও নেতৃত্বের লোভ করে যারা দায়িত্ব পাওয়ার পর তা সঠিকভাবে পালন করেনি, তারা কেয়ামতের দিন গভীর অনুতাপে পড়বে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘অচিরেই তোমরা নেতৃত্বের প্রতি আগ্রহী হবে। অথচ কেয়ামতের দিন তা লজ্জা ও অনুতাপের কারণ হবে।’ (সুনানে নাসায়ি: ৪২১১)
২. সুরা বাকারা পরিত্যাগ করা
সুরা বাকারা তেলাওয়াত ও এর ওপর আমলের গুরুত্ব অপরিসীম। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘তোমরা সুরা বাকারা পাঠ করো। কারণ তা গ্রহণ করা বরকতের কাজ এবং তা পরিত্যাগ করা পরিতাপের কারণ। আর বাতিলপন্থিরা এর মোকাবিলা করতে পারে না।’ (সহিহ মুসলিম: ৮০৪) কেয়ামতের দিন এ সুরার শাফায়াত ও মর্যাদা প্রকাশ পাবে, তখন যারা এর প্রতি উদাসীন ছিল তারা গভীরভাবে আফসোস করবে।
৩. আল্লাহর স্মরণ ছাড়া সময় অতিবাহিত করা
মুমিনরা জান্নাতে প্রবেশের পর দুনিয়ার কোনো কিছুর জন্য আফসোস করবে না। তবে এক বর্ণনায় এসেছে, তারা শুধু ওই মুহূর্তগুলোর জন্য আফসোস করবে, যা আল্লাহর স্মরণ ছাড়া কেটে গেছে। (বায়হাকি, শুআবুল ঈমান: ৫১২) জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত আল্লাহর অমূল্য নেয়ামত। তাই অনর্থক কাজে এই নিয়ামত নষ্ট করা পরকালে গভীর অনুশোচনার কারণ হবে।
আরও পড়ুন: আল্লাহর সর্বাধিক প্রিয় ৪ জিকির
বিজ্ঞাপন
৪. জিকির ও দরুদবিহীন বৈঠক
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (স.) বলেন, ‘যে সম্প্রদায় কোনো বৈঠকে বসে আল্লাহর জিকির করেনি এবং তাদের নবীর প্রতি দরুদ পাঠ করেনি, সে বৈঠক তাদের জন্য অনুতাপের কারণ হবে। আল্লাহ চাইলে তাদের শাস্তি দেবেন, অথবা ক্ষমা করবেন।’ (তিরমিজি: ৩৩৮০) তাই কোনো সমাবেশ বা আলোচনা যদি আল্লাহর স্মরণশূন্য হয়, তা পরকালে আফসোসের কারণ হতে পারে।
৫. লোক দেখানো আমল
অনেকে নেক আমল করে, কিন্তু তার উদ্দেশ্য থাকে মানুষের প্রশংসা, আল্লাহর সন্তুষ্টি নয়। কেয়ামতের দিন এই রিয়ার মুখোশ উন্মোচিত হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তাদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে এমন কিছু প্রকাশ পাবে, যা তারা কখনো কল্পনাও করেনি।’ (সুরা জুমার: ৪৭) রাসুলুল্লাহ (স.) সতর্ক করে বলেছেন, কেয়ামতের দিন প্রথমে যে তিন ব্যক্তির বিচার হবে, তাদের একজন হবে এমন আলেম যিনি শুধু মানুষকে দেখাতেই ইলম অর্জন করেছেন এবং তা শিক্ষা দিয়েছেন। (সহিহ মুসলিম: ১৯০৫)
কাফিরদের আফসোসের কারণ
১. জান্নাতিদের সুখ-শান্তি দেখে
যখন তারা জান্নাতিদের চিরস্থায়ী নিয়ামত প্রত্যক্ষ করবে এবং নিজেরা জাহান্নামে আবদ্ধ থাকবে, তখন গভীর যন্ত্রণায় বলবে, ‘হায়! আমি যদি এ জীবনের জন্য কিছু অগ্রে পাঠিয়ে রাখতাম!’ (সুরা ফাজর: ২৩-২৪) কিন্তু সেদিন এই আফসোসের কোনো মূল্য থাকবে না।
২. অসৎ সঙ্গের অনুসরণ
ভ্রান্ত বন্ধুদের পথে হেঁটে যারা সত্যের পথ থেকে দূরে সরে গেছে, তারা সেদিন হাত কামড়াতে কামড়াতে বলবে, ‘হায় দুর্ভোগ আমার! আমি যদি অমুককে বন্ধু না বানাতাম! সে-ই আমাকে সত্যপথ থেকে বিচ্যুত করেছিল।’ (সুরা ফুরকান: ২৭-২৯)
আরও পড়ুন: ইসলাম 'ভালো বন্ধু' বলেছে যাদের
৩. পথভ্রষ্ট নেতাদের অন্ধ অনুসরণ
দুনিয়ায় যারা সত্যের বদলে প্রভাবশালী ও ভ্রান্ত নেতাদের অনুসরণ করেছে, তারা কেয়ামতের দিন বলবে, ‘হে আমাদের রব! আমরা আমাদের নেতা ও বড় লোকদের আনুগত্য করেছিলাম, তারাই আমাদের পথভ্রষ্ট করেছে।’ (সুরা আহজাব: ৬৭-৬৮) কিন্তু সেদিন এই অজুহাত কোনো কাজে আসবে না।
৪. পরকালের প্রতি উদাসীনতা
কেয়ামতের ভয়াবহতা দেখে কাফিররা এতটাই অনুতপ্ত হবে যে তারা মাটি হয়ে যাওয়াকেই শ্রেয় মনে করবে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘কাফির বলবে, হায়! আমি যদি মাটি হয়ে যেতাম!’ (সুরা নাবা: ৪০) এ আয়াতে পরকালের প্রতি দুনিয়ার উদাসীনতার চূড়ান্ত পরিণতি চিত্রিত হয়েছে।
৫. চিরস্থায়ী মৃত্যুহীনতার ঘোষণা শুনে
জাহান্নামিদের সবচেয়ে বড় আফসোস হবে যখন মৃত্যুকে জবাই করে দেওয়া হবে এবং ঘোষণা করা হবে, এরপর আর কোনো মৃত্যু নেই। ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘তখন জান্নাতবাসীদের আনন্দ আরও বেড়ে যাবে এবং জাহান্নামিদের দুঃখ আরও গভীর হবে।’ (সহিহ বুখারি: ৬৫৪৮)
কেয়ামতের দিন হবে চূড়ান্ত হিসাব, ন্যায়বিচার এবং শেষ অনুশোচনার দিন। সেদিন কারও আফসোস তার ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারবে না। তাই দুনিয়ার এই সীমিত জীবনেই ঈমান, ইখলাস, জিকির, কোরআন তেলাওয়াত ও নেক আমলে নিজেকে সমৃদ্ধ করার বিকল্প নেই। আল্লাহ তাআলা আমাদের সেই সব কাজ থেকে হেফাজত করুন, যা পরকালে অনুশোচনার কারণ হবে। আমিন।




