পবিত্র ঈদুল আজহায় কোরবানিকে কেন্দ্র করে মুসলমানদের মধ্যে নানা মাসয়ালা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়। এর মধ্যে অন্যতম হলো- কোরবানির উদ্দেশ্যে পশু কেনার পর সেটি কোরবানি না করলে বা অন্য পশু দ্বারা পরিবর্তন করলে শরিয়তের বিধান কী? হানাফি মাজহাব অনুযায়ী, এ ক্ষেত্রে ধনী ও গরিব ব্যক্তির বিধান সম্পূর্ণ আলাদা।
সাহেবে নিসাব তথা যার ওপর কোরবানি ওয়াজিব, তিনি কোরবানির উদ্দেশ্যে কোনো পশু কেনার পর চাইলে সেটি পরিবর্তন করে অন্য পশু কোরবানি করতে পারবেন। তবে শর্ত হলো- দ্বিতীয় পশুটি প্রথম পশুর সমমানের বা তার চেয়ে উত্তম হতে হবে। যদি দ্বিতীয় পশুর মূল্য কম হয়, তাহলে কম হওয়া অংশ সদকা করে দিতে হবে।
বিজ্ঞাপন
হানাফি ফিকহের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ আদ-দুররুল মুখতারে এসেছে- ‘ধনী ব্যক্তি প্রথমে যে পশু ক্রয় করেছে তার কারণে কোরবানি তার দায়িত্বে আবশ্যক হয়নি; বরং তার দায়িত্বে কোরবানি আগে থেকেই আবশ্যক ছিল। তাই সেই পশু পরিবর্তন করতে পারবে। তবে কম মূল্যের পশু নিলে পার্থক্য পরিমাণ অর্থ সদকা করতে হবে।’ (আদ-দুররুল মুখতার: ৬/৩২১)
আরও পড়ুন: কোরবানির জন্য ভালো পশু কেনার পর ত্রুটি দেখা গেলে করণীয়
অন্যদিকে, যার ওপর মূলত কোরবানি ওয়াজিব নয়—এমন দরিদ্র ব্যক্তি যদি কোরবানির নিয়তে কোনো পশু ক্রয় করেন, তাহলে ওই নির্দিষ্ট পশুটিই তার জন্য কোরবানি করা আবশ্যক হয়ে যায়। ফলে তার জন্য সেই পশু বিক্রি করা বা পরিবর্তন করা জায়েজ নয়।
হানাফি ফিকহের নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ বাদায়েউস সানায়েতে ইমাম কাসানি (রহ.) উল্লেখ করেছেন- ‘দরিদ্র ব্যক্তি কোরবানির নিয়তে পশু ক্রয় করলে তা মান্নতের মতো আবশ্যক হয়ে যায়। কারণ দরিদ্রের ক্ষেত্রে পশু কেনাই নিজের ওপর কোরবানি আবশ্যক করার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।’ (বাদায়েউস সানায়ে: ৫/৬২)
বিজ্ঞাপন
একই গ্রন্থে আরও উল্লেখ আছে, ধনী ব্যক্তির ক্ষেত্রে পশু ক্রয় কেবল পূর্ব থেকে বিদ্যমান ওয়াজিব আদায়ের উদ্দেশ্যে হয়ে থাকে; কিন্তু গরিব ব্যক্তির ক্ষেত্রে তা নতুনভাবে নিজের ওপর আবশ্যক করার মতো গণ্য হয়। (বাদায়েউস সানায়ে: ৫/৬৪
আরও পড়ুন: কোরবানির জন্য কেনা পশু বিক্রি করা কি জায়েজ?
আলেমরা বলেন, অনেকেই কোরবানির পশু কিনে পরে তা পালার জন্য রেখে দেন বা বিক্রি করে দেন। কিন্তু শরিয়তের বিধান না জেনে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। বিশেষ করে দরিদ্র ব্যক্তি কোরবানির নিয়তে পশু কেনার পর তা কোরবানি না করলে গুনাহগার হবেন। কোরবানির নির্ধারিত দিনগুলো (১০, ১১ ও ১২ জিলহজ) অতিবাহিত হয়ে গেলে পশুটি সদকা করে দেওয়া তার ওপর আবশ্যক হয়ে যাবে।
কোরবানির বিধানের ভিত্তি স্বয়ং কোরআনে উল্লিখিত হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন- ‘আর কোরবানির উটকে আমি তোমাদের জন্য আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্তর্ভুক্ত করেছি। তোমাদের জন্য এতে কল্যাণ রয়েছে।’ (সুরা হজ: ৩৬)। এই আয়াতে ‘বুদন’ শব্দ দ্বারা মূলত উট বোঝানো হলেও তাফসিরে কুরতুবিসহ অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে গরু ও ছাগলও এই বিধানের অন্তর্ভুক্ত।
হাদিসে রাসুলুল্লাহ (স.) কোরবানির গুরুত্ব প্রসঙ্গে বলেছেন- ‘যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কোরবানি করল না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের কাছেও না আসে।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ: ৩১২৩; মুসনাদে আহমদ: ৮২৭৩)
আলেমদের মতে, কোরবানি তাকওয়া, আনুগত্য ও আত্মত্যাগের গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। তাই কোরবানির পশু কেনার আগে সংশ্লিষ্ট মাসআলা সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং প্রয়োজনে বিশ্বস্ত আলেমের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
বাদায়েউস সানায়ে: ৫/৬২, ৬৪; আদ-দুররুল মুখতার: ৬/৩২১; আলমাবসুত, সারাখসি: ১২/১২; রদ্দুল মুহতার: ৬/৩১৫; ইবনে মাজাহ: ৩১২৩; মুসনাদে আহমদ: ৮২৭৩; সুরা হজ: ৩৬




