ইসলামি শরিয়তে কোরবানি শুধু পশু জবাইয়ের আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি মহান আল্লাহর প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য, ত্যাগ ও আত্মসমর্পণের এক মহিমান্বিত ইবাদত। প্রতি বছর জিলহজ মাসে সামর্থ্যবান মুসলমানরা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় কোরবানি আদায় করেন। তবে এই ইবাদতের পেছনে রয়েছে হজরত ইবরাহিম (আ.) ও ইসমাইল (আ.)-এর অবিস্মরণীয় ত্যাগের ইতিহাস, গভীর তাকওয়ার শিক্ষা এবং মানুষের ভেতরের অহংকার ও প্রবৃত্তিকে আল্লাহর জন্য বিসর্জন দেওয়ার এক অনন্য বার্তা।
কোরবানি শব্দের অর্থ কী?
‘কোরবানি’ শব্দটি আরবি ‘কুরবান’ (قربان) থেকে এসেছে, যার অর্থ নৈকট্য লাভ বা সান্নিধ্য অর্জন। পবিত্র কোরআনে এর একাধিক সমার্থক শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। সুরা কাওসারে আল্লাহ বলেছেন- ‘সুতরাং তোমার রবের উদ্দেশ্যে সালাত আদায় করো এবং কোরবানি করো।’ (সুরা কাওসার: ২) সুরা আনআমে বলা হয়েছে- ‘নিশ্চয় আমার নামাজ, আমার কোরবানি, আমার জীবন ও আমার মৃত্যু সবই বিশ্বজাহানের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য।’ (সুরা আনআম: ১৬২) আর সুরা হজে আল্লাহ জানিয়েছেন- ‘আমি প্রত্যেক উম্মতের জন্য কোরবানির বিধান রেখেছি।’ (সুরা হজ: ৩৪)
কোরবানির ইতিহাস: আদম (আ.) থেকে শুরু
কোরবানি কোনো নতুন প্রথা নয়। মানব সভ্যতার শুরু থেকেই প্রতিটি শরিয়তে এর বিধান ছিল। কোরবানির প্রথম ইতিহাস পাওয়া যায় আদম (আ.)-এর দুই পুত্র হাবিল ও কাবিলের ঘটনায়। আল্লাহ বলেছেন- ‘যখন তারা উভয়েই কোরবানি করেছিল, তখন একজনের কোরবানি কবুল হলো এবং অন্যজনের হলো না।’ (সুরা মায়েদা: ২৭) এখানে আল্লাহ স্পষ্ট করেছেন- তিনি কেবল মুত্তাকিদের কোরবানিই কবুল করেন।
আরও পড়ুন: আগের যুগে কোরবানি কবুল হত যেভাবে
বিজ্ঞাপন
ইবরাহিম (আ.)-এর মহান ত্যাগ
বর্তমানে প্রচলিত কোরবানির মূল ভিত্তি হলো হজরত ইবরাহিম (আ.) ও তাঁর পুত্র ইসমাইল (আ.)-এর সেই অবিস্মরণীয় ঘটনা। দীর্ঘদিন নিঃসন্তান থাকার পর বৃদ্ধ বয়সে ইবরাহিম (আ.) আল্লাহর কাছে দোয়া করেছিলেন- رَبِّ هَبْ لِيْ مِنَ الصّٰلِحِيْنَ ‘হে আমার রব! আমাকে নেক সন্তান দান করুন।’ (সুরা সাফফাত: ১০০)
আল্লাহ তাঁর দোয়া কবুল করে পুত্র ইসমাইল (আ.) দান করলেন। কিন্তু এরপরই এলো কঠিনতম পরীক্ষা। ইবরাহিম (আ.) স্বপ্নে দেখলেন, প্রিয় পুত্রকে আল্লাহর জন্য কোরবানি করছেন। নবীদের স্বপ্ন ওহির অন্তর্ভুক্ত; তিনি বুঝলেন এটি আল্লাহর নির্দেশ। পিতা যখন পুত্রকে বিষয়টি জানালেন, ইসমাইল (আ.) বললেন- يٰۤاَبَتِ افْعَلْ مَا تُؤْمَرُ سَتَجِدُنِيْۤ اِنْ شَآءَ اللهُ مِنَ الصّٰبِرِيْنَ ‘হে আমার পিতা! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে, তা-ই করুন। ইনশাআল্লাহ, আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন।’ (সুরা সাফফাত: ১০২)
পিতা-পুত্র উভয়েই আল্লাহর আদেশের সামনে মাথা নত করলেন। তখন আল্লাহ ইসমাইল (আ.)-এর জায়গায় একটি দুম্বা পাঠিয়ে দিলেন এবং ঘোষণা করলেন- وَفَدَيْنٰهُ بِذِبْحٍ عَظِيْمٍ ‘আমি তাকে এক মহান কোরবানির বিনিময়ে মুক্ত করলাম।’ (সুরা সাফফাত: ১০৭)
এই অসাধারণ আনুগত্যে সন্তুষ্ট হয়ে আল্লাহ ইবরাহিম (আ.)-কে মানবজাতির নেতা বানিয়ে দিলেন। (সুরা বাকারা: ১২৪) এই ঘটনাকে স্মরণ করেই মুসলমানরা প্রতি বছর কোরবানি আদায় করেন, যা ‘সুন্নতে ইবরাহিমি’ নামে পরিচিত।
কোরবানির মূল উদ্দেশ্য গোশত নয়
কোরবানির উদ্দেশ্য কখনোই গোশত খাওয়া নয়। আল্লাহ তাআলা এ বিষয়ে সুস্পষ্টভাবে বলেছেন- لَنْ يَّنَالَ اللهَ لُحُوْمُهَا وَلَا دِمَآؤُهَا وَلٰكِنْ يَّنَالُهُ التَّقْوٰى مِنْكُمْ ‘আল্লাহর কাছে পৌঁছে না এগুলোর গোশত কিংবা রক্ত; বরং তাঁর কাছে পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া।’ (সুরা হজ: ৩৭)
অর্থাৎ পশু কোরবানির মাধ্যমে আসলে কোরবানি হয় মানুষের ভেতরের অহংকার, লোভ ও আত্মকেন্দ্রিকতা।
আরও পড়ুন: কোরবানি করার আগে শিশু ইসমাইলকে যা বলেছিলেন ইবরাহিম (আ.)
হাদিসের নির্দেশনা
রাসুলুল্লাহ (স.) মদিনায় দশ বছর অবস্থানকালে প্রতিবছর কোরবানি করেছেন। (জামে তিরমিজি: ১৫০৭) সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যে কোরবানি করে না, তার ব্যাপারে রাসুল (স.) কঠোর সতর্কবাণী দিয়েছেন। (সুনানে ইবনে মাজাহ: ৩১২৩)
কোরবানির সামাজিক শিক্ষা
কোরবানি ব্যক্তিকেন্দ্রিক ইবাদত নয়। শরিয়তের বিধান অনুযায়ী কোরবানির গোশত দরিদ্র ও আত্মীয়দের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়া কর্তব্য, যা সমাজে ভ্রাতৃত্ব ও সহমর্মিতার বন্ধন দৃঢ় করে। এই একটি ইবাদতে একসঙ্গে মেলে আল্লাহর আনুগত্য, আত্মত্যাগের মানসিকতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার শিক্ষা।
অতএব, কোরবানি ঈমান, আনুগত্য, তাকওয়া ও আত্মত্যাগের এক জীবন্ত প্রকাশ। লোকদেখানো বা নিছক গোশত খাওয়ার মানসিকতা এই ইবাদতের সওয়াবকে নষ্ট করে দেয়। তাই নিজের অহংকার ও প্রবৃত্তিকে বিসর্জন দিয়ে আন্তরিক তাকওয়া নিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে নিজেকে উৎসর্গ করাই হোক এবারের কোরবানির মূল অঙ্গীকার।




