সাফা ও মারওয়ার মাঝে সাতবার হাঁটা বা দৌড়ানো হজ ও ওমরার একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল। অনেক হাজির মনে প্রশ্ন জাগে- মাঝপথে বসে পড়লে বা দীর্ঘ বিরতি নিলে কি হজ বা ওমরা নষ্ট হয়ে যায়? প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটারের এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে গিয়ে বয়স্ক বা অসুস্থ হাজিরা প্রায়ই ক্লান্ত হয়ে পড়েন। আবার অনেক সময় সাঈর মাঝপথেই ফরজ নামাজের ইকামত শুরু হয়ে যায়। এ অবস্থায় বিরতি নেওয়ার বিধান নিয়ে কোরআন, সুন্নাহ ও ফিকহি গ্রন্থের আলোকে বিষয়টি নিচে বিশ্লেষণ করা হলো।
সাঈর ভিত্তি ও গুরুত্ব
সাঈর বৈধতা ও গুরুত্বের দলিল স্বয়ং কোরআনে রয়েছে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন- ‘নিশ্চয়ই সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্তর্ভুক্ত।’ (সুরা বাকারা: ১৫৮)
সাঈ হজ ও ওমরার একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল- মাজহাবভেদে এটি রুকন বা ওয়াজিব হিসেবে গণ্য করা হয়।
ধারাবাহিকতা বা ‘মুওয়ালাত’-এর বিধান
ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায় কোনো ইবাদতের এক অংশের পর অন্য অংশ বিরতিহীনভাবে সম্পন্ন করাকে ‘মুওয়ালাত’ বলা হয়। সাফা-মারওয়া সাঈর ক্ষেত্রে অধিকাংশ ফকিহর মতে, সাতটি চক্কর ধারাবাহিকভাবে সম্পন্ন করা ‘সুন্নত’, তবে এটি 'শর্ত' নয়। অর্থাৎ কেউ যদি কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণে মাঝখানে বিরতি নেন, তবে তাঁর সাঈ বাতিল হবে না।
বিজ্ঞাপন
নামাজের জন্য বিরতি
সাঈ চলাকালীন ফরজ নামাজের জামাত শুরু হয়ে গেলে সাঈ স্থগিত রেখে জামাতে শামিল হওয়া আবশ্যক। নামাজশেষে যেখানে সাঈ রেখেছিলেন, ঠিক সেখান থেকেই পুনরায় শুরু করবেন। নতুন করে প্রথম থেকে শুরু করার প্রয়োজন নেই। (ফতোয়ায়ে শামি, কিতাবুল হজ)
আরও পড়ুন: ভিড়ের মধ্যে নারীরা তাওয়াফ ও সাঈ করবেন যেভাবে
ক্লান্তি বা অসুস্থতার কারণে বিরতি
সাঈর মাঝপথে কেউ প্রচণ্ড ক্লান্ত বা অসুস্থ বোধ করলে বিশ্রামের জন্য বিরতি নিতে পারেন। এই বিরতির কোনো সুনির্দিষ্ট সময়সীমা নেই- যতক্ষণ না পুনরায় হাঁটার শক্তি ফিরে পাচ্ছেন, ততক্ষণ বিশ্রাম নেওয়া জায়েজ। প্রয়োজনে জমজমের পানি পান বা হালকা খাবার খাওয়ার জন্যও বিরতি নেওয়া বৈধ। (আল-মুগনি, ইবনে কুদামা)
অজু করার জন্য বিরতি
তাওয়াফের জন্য অজু শর্ত হলেও সাঈর জন্য অজু থাকা ফরজ বা ওয়াজিব নয়, তবে উত্তম। যদি সাঈর মাঝখানে অজু নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে চাইলে অজু করতে বের হয়ে যেতে পারেন এবং ফিরে এসে আগের চক্কর থেকে বাকি অংশ সম্পন্ন করবেন। (সহিহ মুসলিম: ১২১৮-এর ফিকহি ব্যাখ্যা)
দীর্ঘ বিরতি হলে করণীয়
কোনো হাজি কয়েক চক্কর দেওয়ার পর দীর্ঘ সময়, এমনকি কয়েক ঘণ্টা বিরতি নিলে বা ভুলে বাসায় চলে গেলেও অধিকাংশ আলেমের মতে সাঈ বাতিল হবে না। তিনি ফিরে এসে বাকি চক্করগুলো পূর্ণ করবেন। মাজহাবগুলোর মধ্যে এ বিষয়ে সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে। মালিকি মাজহাবের মতে, যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়া দীর্ঘ বিরতি হলে সাঈ পুনরায় শুরু করা উত্তম। তবে হানাফি, শাফেয়ি ও হাম্বলি মাজহাব অনুযায়ী, বিরতি দীর্ঘ হলেও আগের চক্করগুলো নষ্ট হয় না। (আল-মাজমু, ইমাম নববি)
আরও পড়ুন: পিরিয়ড অবস্থায় সাঈ করা জায়েজ কি?
সাঈর মাঝখানে পুরুষদের জন্য যে সবুজ চিহ্নিত স্থান রয়েছে, সেখানে ভিড়ের কারণে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে না থেকে সম্ভব হলে এই অংশটি পার হয়ে বিরতি নেওয়া অন্য হাজিদের স্বার্থে উত্তম।
ব্যবহারিক নির্দেশনা
অকারণ দীর্ঘ বিরতি না নেওয়াই শ্রেয়, কারণ ধারাবাহিকতা রক্ষা করা সুন্নত। বিরতির আগে নিশ্চিত হয়ে নিন কত নম্বর চক্করে ছিলেন- প্রয়োজনে নোট করুন বা সাঈ কাউন্টার ব্যবহার করুন। বিরতির পরও হাঁটতে না পারলে হুইলচেয়ারে বাকি চক্করগুলো সম্পন্ন করা বৈধ।
সাফা-মারওয়া সাঈর মাঝখানে প্রয়োজন অনুযায়ী বিরতি নেওয়া সম্পূর্ণ জায়েজ। নামাজের জামাত বা শারীরিক ক্লান্তির কারণে বিরতি নিলে হজ বা ওমরার কোনো ক্ষতি হয় না এবং এর জন্য কোনো দম বা কাফফারাও দিতে হয় না। ইসলাম সহজসাধ্য ধর্ম- ইবাদতের ক্ষেত্রে নিজের সামর্থ্য ও সুস্থতার প্রতি লক্ষ্য রাখা শরিয়তসম্মত।




