বৃহস্পতিবার, ১৪ মে, ২০২৬, ঢাকা

ছেলের উপার্জনের টাকায় বাবার কোরবানি: শরিয়তের বিধান কী?

ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৪ মে ২০২৬, ০৫:২১ পিএম

শেয়ার করুন:

ছেলের উপার্জনের টাকায় বাবার কোরবানি: শরয়ি বিধান কী?

পবিত্র ঈদুল আজহা সমাগত। সামর্থ্যবান মুসলিমদের ওপর কোরবানি করা ওয়াজিব। আমাদের দেশের সামাজিক কাঠামোতে অনেক পরিবারেই দেখা যায় সন্তান উপার্জনক্ষম হলেও বাবা পরিবারের প্রধান হিসেবে থাকেন। এমন পরিস্থিতিতে ছেলের উপার্জিত অর্থে বাবার কোরবানি দেওয়া এবং যৌথ পরিবারের কোরবানি নিয়ে কিছু সূক্ষ্ম শরয়ি বিধান ও সাধারণ ভুল পদ্ধতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা জরুরি।

কোরবানি কার ওপর ওয়াজিব?

ইসলামি শরিয়তমতে, ১০ জিলহজ ফজর থেকে ১২ জিলহজ সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়ের মধ্যে যার কাছে ‘নেসাব’ পরিমাণ সম্পদ থাকবে, তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব। কোরবানির নেসাব হলো- সাড়ে সাত তোলা স্বর্ণ বা সাড়ে ৫২ তোলা রুপা অথবা এর সমমূল্যের নগদ অর্থ বা প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ (যেমন: অতিরিক্ত জমি, বাড়ি, ব্যবসায়িক পণ্য বা আসবাবপত্র)।
উল্লেখ্য যে, জাকাতের মতো কোরবানির নেসাবের ক্ষেত্রে সম্পদ এক বছর মালিকানায় থাকা শর্ত নয়; বরং কোরবানির তিন দিনের মধ্যে নেসাবের মালিক হলেই কোরবানি ওয়াজিব হবে। (তাবয়িনুল হাকায়িক, খণ্ড: ৬)

ছেলের উপার্জনে বাবার কোরবানি: সঠিক পদ্ধতি

ছেলের উপার্জিত অর্থে বাবার কোরবানি দেওয়ার বিষয়টি মূলত মালিকানা ও অনুমতির ওপর নির্ভর করে। একে দুটি সুরতে দেখা যায়-
উপহার হিসেবে প্রদান: ছেলে যদি নিজের টাকা বাবাকে ‘উপহার’ (হেবা) হিসেবে দিয়ে দেয়, সেই টাকা বা পশুর ওপর বাবার নিরঙ্কুশ মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর বাবা সেই অর্থ বা পশু দিয়ে কোরবানি করলে তাঁর পক্ষ থেকে ওয়াজিব আদায় হয়ে যাবে। এটি একটি মহৎ খেদমত।

আরও পড়ুন: ওয়াজিব কোরবানি আদায়ে নারীদের অবহেলা


বিজ্ঞাপন


বাবার অনুমতি সাপেক্ষে: বাবার যদি নিজস্ব নেসাব পরিমাণ সম্পদ থাকে, তাহলে তাঁর ওপর কোরবানি স্বতন্ত্রভাবে ওয়াজিব। এক্ষেত্রে ছেলে যদি নিজের টাকা দিয়ে বাবার পক্ষ থেকে কোরবানি করতে চায়, তবে অবশ্যই বাবার স্পষ্ট অনুমতি থাকতে হবে। সাধারণভাবে একজনের কোরবানি অন্যজনের ওয়াজিব আদায় হিসেবে গণ্য হয় না, যতক্ষণ না সেখানে অনুমতি বা প্রতিনিধিত্ব (ওয়াকালা) নিশ্চিত হয়।

যৌথ পরিবারের কোরবানি: প্রচলিত ভুল পদ্ধতি

যৌথ পরিবারে একটি সাধারণ ভুল হলো- পরিবারের একাধিক সদস্য ‘সাহেবে নেসাব’ বা সামর্থ্যবান হওয়া সত্ত্বেও শুধু পরিবারের কর্তার (বাবা বা বড় ভাইয়ের) নামে একটি কোরবানি করা হয়। ইসলামে ইবাদতের দায়িত্ব ব্যক্তিগত। পবিত্র কোরআনে এর মূলনীতি বর্ণিত হয়েছে- ‘কোনো ব্যক্তি কারও বোঝা নিজে বহন করবে না।’ (সুরা নাজম: ৩৮)
অর্থাৎ, পরিবারের বাবা, মা এবং উপার্জনক্ষম সন্তানদের মধ্যে যার যার মালিকানায় পৃথকভাবে নেসাব পরিমাণ সম্পদ থাকবে, তাদের প্রত্যেকের ওপর আলাদাভাবে কোরবানি ওয়াজিব। একজনের কোরবানিতে অন্যজনের দায়ভার মুক্ত হয় না।

ভুল সংশোধনের সহজ উপায়

যৌথ পরিবারে যদি একাধিক সদস্যের ওপর কোরবানি ওয়াজিব হয়, তবে তারা একটি বড় পশু (গরু, মহিষ বা উট) কিনে তাতে প্রত্যেকে আলাদা অংশ নিতে পারেন। শরিয়তের নিয়ম অনুযায়ী, একটি বড় পশুতে সর্বোচ্চ সাতজন শরিক হতে পারেন। বাহ্যিকভাবে পশু একটি হলেও যেহেতু সবার পক্ষ থেকে অন্তত এক-সপ্তমাংশ (এক ভাগ) থাকছে, তাই নিয়ম মেনে সবার ওয়াজিব কোরবানি আদায় হয়ে যাবে।

আরও পড়ুন: ওয়াজিব কোরবানি যথাসময়ে আদায় না করলে করণীয় 

সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কোরবানি না করার পরিণতি

যাদের ওপর কোরবানি ওয়াজিব কিন্তু তারা তা আদায় করে না, তাদের ব্যাপারে নবীজি (স.) কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। তিনি ইরশাদ করেছেন- ‘যার কোরবানির সামর্থ্য রয়েছে অথচ সে কোরবানি করে না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের নিকটবর্তী না হয়।’ (মুস্তাদরাকে হাকেম: ৩৫১৯)

ইবাদত কবুল হওয়ার প্রধান শর্ত হলো সহিহ নিয়ত এবং সঠিক পদ্ধতি। বাবার প্রতি খেদমত হিসেবে তাঁর নামে কোরবানি দেওয়া যেমন সওয়াবের কাজ, তেমনি নিজের ওপর ওয়াজিব কোরবানি আদায় করাও বাধ্যতামূলক। যৌথ পরিবারের ক্ষেত্রে প্রতিটি সামর্থ্যবান সদস্যের অংশ নিশ্চিত করা জরুরি। ইসলামের নির্দেশনাগুলো আধুনিক জীবনযাত্রায় শরয়তের বিধান যথাযথভাবে অনুসরণের মাধ্যমেই কোরবানির প্রকৃত উদ্দেশ্য সফল হতে পারে।

তথ্যসূত্র: কোরআন (৫৩:৩৮, ২২:৩৭); সহিহ মুসলিম; মুস্তাদরাকে হাকেম; ফতোয়ায়ে শামি; আল-মুগনি; আলমগিরি; তাবয়িনুল হাকায়িক; ইসলামি ফিকহ একাডেমি

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর