কোরবানির মৌসুমে অনেক পরিবারে একটি সাধারণ প্রশ্ন দেখা দেয়- স্বামী যদি স্ত্রীর গহনা বিক্রি করে বা স্ত্রীর জমানো টাকায় কোরবানি দেন, তাহলে কি তা আদায় হবে? স্ত্রী স্বেচ্ছায় অর্থ দিলে বিধান কী, আর অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে ইসলামের অবস্থানই বা কী? কোরআন, সহিহ হাদিস এবং ফিকহি নীতিমালার আলোকে বিষয়টি নিচে বিশ্লেষণ করা হলো।
ইসলামে সম্পদের ব্যক্তিগত মালিকানা নীতি
ইসলামি শরিয়তে নারী ও পুরুষ উভয়ের সম্পদের মালিকানা সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। বিবাহের মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রীর সম্পদ একীভূত হয়ে যায় না। স্ত্রীর মোহরানা, উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পদ বা উপহার হিসেবে পাওয়া গহনার একক মালিক স্ত্রী নিজেই। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে- ‘পুরুষ যা অর্জন করে তাতে তার অংশ রয়েছে এবং নারী যা অর্জন করে তাতে তার অংশ রয়েছে।’ (সুরা নিসা: ৩২)
অতএব, স্ত্রীর মালিকানাধীন সম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রে তার স্পষ্ট ও সন্তুষ্টচিত্ত সম্মতি থাকা অপরিহার্য।
কোরবানির নিসাব ও ওয়াজিব হওয়ার শর্ত
হানাফি মাজহাব অনুযায়ী, ১০ জিলহজ ফজর থেকে ১২ জিলহজ সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়ের মধ্যে কোনো প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থমস্তিষ্ক সম্পন্ন মুসলিমের কাছে যদি জীবনধারণের মৌলিক প্রয়োজন ও ঋণ বাদে সাড়ে সাত তোলা সোনা অথবা সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপা কিংবা তার সমমূল্যের নগদ টাকা বা ব্যবসায়িক পণ্য থাকে, তার ওপর কোরবানি করা ওয়াজিব।
আরও পড়ুন: জমি থাকলে কি কোরবানি ওয়াজিব হয়?
বিজ্ঞাপন
স্ত্রীর গহনার টাকায় স্বামীর কোরবানি: ফিকহি বিশ্লেষণ
ক. স্ত্রী স্বেচ্ছায় দান করলে (হেবা): যদি স্ত্রী নিজের ইচ্ছায় গহনা বা তার বিক্রিত অর্থ স্বামীকে দান করেন, তাহলে তা স্বামীর মালিকানায় চলে আসে এবং তা দিয়ে স্বামীর নামে কোরবানি করা সম্পূর্ণ বৈধ। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তবে যদি তারা খুশিমনে তোমাদের জন্য তা থেকে কিছু ছেড়ে দেয়, তাহলে তোমরা তা স্বাচ্ছন্দ্যে ভোগ করো।’ (সুরা নিসা: ৪)
খ. স্ত্রী ঋণ হিসেবে দিলে (করজ): স্ত্রী যদি অর্থটি ঋণ হিসেবে দেন, তাহলে সেই টাকায় স্বামীর কোরবানি আদায় হবে। এক্ষেত্রে স্বামীর ওপর শরিয়তসম্মত দায়িত্ব থাকবে পরবর্তীতে স্ত্রীকে ওই অর্থ ফেরত দেওয়া। (ফতোয়ায়ে আলমগিরি)
গ. অনুমতি ছাড়া সম্পদ ব্যবহার করলে: স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া গহনা বিক্রি বা কোরবানি করা শরিয়তসম্মত নয় (নাজায়েজ)। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন- ‘কোনো মুসলিমের সম্পদ তার সন্তুষ্টি ছাড়া অন্যের জন্য হালাল নয়।’ (মুসনাদে আহমদ: ২০৬৯৫; সহিহ/হাসান)
তবে, পরবর্তীতে স্ত্রীর সন্তুষ্টচিত্ত সম্মতি থাকলে বা তিনি বিষয়টি আন্তরিকভাবে মাফ করে দিলে ইবাদতটি শরিয়তসম্মতভাবে আদায় হওয়ার সুযোগ রয়েছে। (বাদায়েউস সানায়ে) আবার যদি উভয়পক্ষ একমত হন যে এই টাকাটি স্বামী ঋণ হিসেবে নিয়েছেন, তাহলেও স্বামীর কোরবানি বিশুদ্ধ হবে; তবে স্বামী দ্রুততম সময়ে সেই ঋণ পরিশোধ করবেন। (আল-মাবসুত)
আরও পড়ুন: ওয়াজিব কোরবানি আদায়ে নারীদের অবহেলা
স্ত্রীর কোরবানি কি আদায় হবে? (জরুরি সতর্কতা)
যদি স্ত্রীর মালিকানায় নিসাব পরিমাণ স্বর্ণালঙ্কার থাকে, তাহলে কোরবানি করা তার ব্যক্তিগত ওয়াজিব দায়িত্ব। এ অবস্থায় স্ত্রীর টাকা দিয়ে স্বামী যদি কেবল নিজের নামেই কোরবানি আদায় করেন, ফিকহি বিধান অনুযায়ী স্বামীর কোরবানি সম্পন্ন হলেও স্ত্রীর ওয়াজিব জিম্মাদারী অপূর্ণ থেকে যাবে। কারণ পশুর মালিকানা ও নিয়ত যার থাকে, কোরবানি মূলত তার পক্ষ থেকেই আদায় হয়। এক্ষেত্রে স্বামী স্ত্রীর কাছে আর্থিকভাবে ঋণী থাকবেন এবং তাকে এই অর্থ অবশ্যই ফেরত দিতে হবে। আর কোরবানির নির্ধারিত সময় পার হয়ে গেলে স্ত্রীর পক্ষ থেকে সময়মতো কোরবানি না করার কারণে একটি ছাগলের মূল্য অথবা ক্রয়কৃত পশুটি জীবিত সদকা করে দেওয়া ওয়াজিব। (বাদায়েউস সানায়ে; ফতোয়ায়ে কাজিখান)। তাই স্ত্রীর কোরবানি আদায়ের সঠিক পদ্ধতি হলো- আগে তার পক্ষ থেকে কোরবানি নিশ্চিত করা; প্রয়োজনে স্বামী তার স্ত্রীর অনুমতি নিয়ে নিজের অর্থ দিয়েও সেই কোরবানি আদায় করে দিতে পারেন। (ফতোয়ায়ে আলমগিরি; আল-লাজনাতুদ দায়িমাহ)
বরেণ্য আলেমদের অভিমত
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) উল্লেখ করেছেন যে, আর্থিক ইবাদতের ক্ষেত্রে শরিয়তসম্মত মালিকানা থাকা জরুরি। মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) আহকামুল কুরআনে লিখেছেন, স্ত্রীর সম্পদে স্বামীর কোনো প্রশাসনিক বা মালিকানা-অধিকার নেই। মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) বেহেশতি জেওরে উল্লেখ করেছেন- স্ত্রী খুশিমনে দিলে স্বামীর কোরবানি শুদ্ধ হবে এবং এতে উভয়েই সওয়াব পাবেন।
সারসংক্ষেপ
| বিষয় | শরিয়তের বিধান |
| স্ত্রীর গহনার মালিক | স্ত্রী নিজে (কোরআন ৪:৩২) |
| স্ত্রীর সম্মতিতে টাকা ব্যবহার | বৈধ ও জায়েজ |
| অনুমতি ছাড়া ব্যবহার | শরিয়তসম্মত নয় (নাজায়েজ) |
| কার কোরবানি আদায় হবে? | পশুর মালিক ও নিয়ত যার |
| সওয়াব ও কবুলিয়ত | সন্তুষ্টি ছাড়া সম্পদ ব্যবহার সওয়াব অর্জনে বাধা |
| ওয়াজিব কোরবানি কার? | যার মালিকানায় নিসাব পরিমাণ সম্পদ আছে |
কোরবানি একটি স্বতন্ত্র ইবাদত, যা সঠিক নিয়ত ও মালিকানার ভিত্তিতে আদায় হয়। তাই স্ত্রীর ওপর কোরবানি ওয়াজিব হলে তা অবশ্যই তার পক্ষ থেকেই আদায় করতে হবে। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সহযোগিতা থাকলেও স্পষ্ট অনুমতি ও নিয়ত ছাড়া কারও নামের কোরবানি অন্যের ওয়াজিব হিসেবে আদায় হবে না। অতএব, কোরবানিতে যেমন ইবাদতের শুদ্ধতা জরুরি, তেমনি একে অপরের সম্পদের অধিকার রক্ষাও অপরিহার্য।




