হজ ইসলামের অন্যতম একটি রুকন। হজের একটি অপরিহার্য অনুষঙ্গ হলো ‘ইহরাম’। ইহরাম মূলত হজের নিয়ত ও বিশেষ একটি আধ্যাত্মিক অবস্থা, যার বাহ্যিক প্রতীক হিসেবে পুরুষরা দুই খণ্ড সেলাইবিহীন সাদা কাপড় পরিধান করেন। ইহরামের অবস্থায় শরীর ও কাপড় পবিত্র রাখা ইবাদতের পূর্ণতার জন্য জরুরি। তবে হজের সফরে ভিড় বা অসাবধানতাবশত ইহরামের কাপড়ে নাপাকি লেগে গেলে হজের ওপর তার প্রভাব কী হবে- সে বিষয়ে বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমের অনুসৃত হানাফি ফিকহের আলোকে দালিলিক বিধান নিচে তুলে ধরা হলো।
মূলনীতি: হজের শুদ্ধতা ও ইহরামের কাপড়
শরিয়তের মূলনীতি হলো- ইহরামের কাপড়ে নাপাকি লাগলে ‘ইহরাম’ ভঙ্গ হয় না এবং হজের মূল শুদ্ধতাও নষ্ট হয় না। অর্থাৎ কাপড়ে নাপাকি থাকা অবস্থায় যদি কেউ হজের মৌলিক রুকনগুলো- যেমন আরাফায় অবস্থান, মুজদালিফায় রাত কাটানো বা জামারাতে পাথর নিক্ষেপ- পালন করেন, তাহলে তার হজ আদায় হয়ে যাবে। তবে তাওয়াফের জন্য পবিত্রতা রক্ষা করা ‘ওয়াজিব’ এবং নামাজের জন্য ‘শর্ত’।
আরও পড়ুন: ইহরামের সাদা কাপড়: হজযাত্রীদের ঐক্য ও পবিত্রতার প্রতীক
তাওয়াফে জিয়ারাহর ক্ষেত্রে বিধান
হজের রুকন বা অন্যতম প্রধান ফরজ হলো ‘তাওয়াফে জিয়ারাহ’ (যা তাওয়াফে ইফাদা নামেও পরিচিত)। হানাফি মাজহাবের মানদণ্ড অনুযায়ী তাওয়াফের জন্য শরীর ও কাপড় পবিত্র থাকা ওয়াজিব। নাপাকির পরিমাণ অনুযায়ী এর হুকুম ও জরিমানা দুটি স্তরে বিভক্ত-
বিজ্ঞাপন
প্রথম স্তর (সদকা): কাপড়ে নাজাসাতে গালিজা এক দিরহাম বা তার বেশি কিন্তু এক-চতুর্থাংশের কম হলে, ওই অবস্থায় তাওয়াফ করলে মাকরুহে তাহরিমি হবে এবং সদকা ওয়াজিব হবে।
দ্বিতীয় স্তর (দম): নাপাকি কাপড়ের এক-চতুর্থাংশ বা তার বেশি হলে দম ওয়াজিব হবে।
(সূত্র: রদ্দুল মুহতার, কিতাবুল হজ: খণ্ড ২; ফাতাওয়ায়ে আলমগিরি, কিতাবুল হজ: খণ্ড ১)
সাঈ, আরাফা ও অন্যান্য কার্যক্রম
তাওয়াফে জিয়ারাহ ব্যতীত হজের অন্যান্য কার্যক্রম- যেমন সাঈ (সাফা-মারওয়া পাহাড়ে হাঁটা), উকুফে আরাফাহ (আরাফার ময়দানে অবস্থান), মুজদালিফায় অবস্থান এবং মিনায় পাথর নিক্ষেপ- এগুলোর জন্য শরীর বা কাপড় পবিত্র থাকা ‘শর্ত’ নয়। কাপড়ে নাপাকি থাকা অবস্থায় এসব রুকন পালন করলেও তা সম্পূর্ণ সহিহ হবে এবং কোনো জরিমানা বা ‘দম’ দিতে হবে না। তবে ইবাদতের মর্যাদা রক্ষায় সর্বদা পবিত্র অবস্থায় থাকা কাম্য।
আরও পড়ুন: তাওয়াফ কত প্রকার ও কী কী
নামাজের ক্ষেত্রে প্রভাব
ইহরামের কাপড়ে নাপাকি থাকলে সেই কাপড় পরিধান করে নামাজ আদায় করা সহিহ হবে না। কারণ নামাজের জন্য শরীর ও কাপড় পবিত্র থাকা অপরিহার্য ‘শর্ত’। হজ চলাকালীন ফরজ নামাজ বা তাওয়াফ-পরবর্তী ওয়াজিব নামাজ পড়ার আগে অবশ্যই কাপড় ধুয়ে পবিত্র করে নিতে হবে অথবা কাপড় বদলে নিতে হবে। শর্ত পূরণ না হলে নামাজ বাতিল বলে গণ্য হবে।
নাপাকি দূর করার উপায়
ইহরামের কাপড়ে নাপাকি লাগলে করণীয় হলো-
প্রথমত: নাপাক অংশটি দ্রুত পানি দিয়ে ধুয়ে পবিত্র করে নেওয়া।
দ্বিতীয়ত: সম্ভব হলে ইহরামের কাপড় পরিবর্তন করে অন্য পবিত্র কাপড় পরিধান করা। উল্লেখ্য, ইহরাম অবস্থায় কাপড় পরিবর্তন করা সম্পূর্ণ জায়েজ এবং এতে ইহরামের কোনো ক্ষতি হয় না।
(হানাফি মাজহাব অনুযায়ী)
বিষয় বিধান
হজ সহিহ হবে কি? হ্যাঁ, কাপড়ে নাপাকি থাকলেও হজ সহিহ হবে।
ইহরাম ভাঙবে কি? না, কাপড় নাপাক হলে ইহরাম নষ্ট হয় না।
তাওয়াফে জিয়ারাহ নাপাক অবস্থায় তাওয়াফ করা গুনাহ ও মাকরুহে তাহরিমি; জরিমানা সদকা বা দম।
সাঈ, আরাফা ও মিনা নাপাকি থাকলেও রুকনগুলো আদায় হবে, কোনো জরিমানা নেই।
নামাজ নাপাক কাপড়ে নামাজ সহিহ হবে না (পবিত্রতা নামাজের শর্ত)।
ইহরামের কাপড়ে নাপাকি লেগে থাকলে হজ বাতিল হয় না, তবে তাওয়াফ ও নামাজের জন্য পবিত্রতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হাজিদের উচিত ইহরামের কাপড়ের পবিত্রতার প্রতি সর্বদা সজাগ থাকা। নাপাকি লেগে গেলে তা দ্রুত পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলা বা কাপড় পরিবর্তন করা সুন্নাহসম্মত এবং ইবাদতের পূর্ণতার জন্য জরুরি।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: ব্যক্তিগত বিশেষ কোনো পরিস্থিতিতে বা জটিলতায় আমল করার আগে নিজের মাজহাবের নির্ভরযোগ্য ও যোগ্য কোনো আলিমের কাছ থেকে সরাসরি ফতোয়া জেনে নেওয়া উচিত।
সূত্র: রদ্দুল মুহতার, কিতাবুল হজ, খণ্ড ২; আলমগিরি: কিতাবুল হজ, খণ্ড ১; বাদায়েউস সানায়ে: কিতাবুল হজ, খণ্ড ২




