শুক্রবার, ১ মে, ২০২৬, ঢাকা

ক্রেডিট কার্ডে কোরবানির পশু ক্রয়: শরয়ি বিধান কী

ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: ০১ মে ২০২৬, ০৭:৫৪ পিএম

শেয়ার করুন:

ক্রেডিট কার্ডে কোরবানির পশু ক্রয়: শরয়ি বিধান কী

কোরবানি ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক ইবাদত। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন- ‘আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না এগুলোর (পশুর) গোশত ও রক্ত; বরং তাঁর কাছে পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া।’ (সুরা হজ: ৩৭) ইবাদত কবুল হওয়ার অন্যতম শর্ত উপার্জনের পবিত্রতা। বর্তমান ডিজিটাল লেনদেনের যুগে নগদ অর্থের সংকটে অনেকে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে পশু কিনছেন। এ অবস্থায় এর শরয়ি বৈধতা ও ঋণ নিয়ে কোরবানির বিধান নিয়ে ফিকহবিদদের বিশ্লেষণ রয়েছে।

কোরবানি কার ওপর ওয়াজিব?

ইসলামি শরিয়তের বিধান অনুযায়ী, স্বাভাবিক জ্ঞানসম্পন্ন, সাবালক মুসলিম যদি কোরবানির দিনগুলোতে (১০ জিলহজ সকাল থেকে ১২ জিলহজ সূর্যাস্তের আগপর্যন্ত) জাকাত পরিমাণ মালের মালিক থাকেন, তার ওপর কোরবানি করা ওয়াজিব। নেসাবের পরিমাণ হলো- সাড়ে ৭ ভরি সোনা বা সাড়ে ৫২ ভরি রুপা অথবা এর সমপরিমাণ নগদ অর্থ বা ব্যবসার পণ্য। (আলমুহিতুল বুরহানি: ৮/৪৫৫, ফতোয়ায়ে তাতারখানিয়া: ১৭/৪০৫)

ক্রেডিট কার্ড লেনদেনের শরয়ি প্রকৃতি

ক্রেডিট কার্ড মূলত একটি ঋণভিত্তিক আর্থিক চুক্তি। এর ব্যবহার সাধারণত দুইভাবে হয়ে থাকে-
সুদমুক্ত সময়: নির্ধারিত মেয়াদের (Grace Period) মধ্যে সম্পূর্ণ বিল পরিশোধ করলে অতিরিক্ত কোনো অর্থ দিতে হয় না। এটি শরিয়তের দৃষ্টিতে বৈধ ঋণ সুবিধা হিসেবে গণ্য।
বিলম্বিত পরিশোধ: মেয়াদ পার হলে ব্যাংক গ্রাহকের ওপর সুদ ও লেট ফি আরোপ করে, যা স্পষ্টভাবে ‘রিবা’ বা সুদ; যা কোরআনে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। আল্লাহ তাআলা বলেন- ‘আল্লাহ বেচাকেনাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।’ (সুরা বাকারা: ২৭৫)

আরও পড়ুন: ব্যাংকের সুদ কোন খাতে খরচ করবেন, কোন খাতে করবেন না


বিজ্ঞাপন


পশু ক্রয়ের তিনটি ভিন্ন অবস্থা ও শরয়ি সমাধান

ফিকহবিদদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী ক্রেডিট কার্ডে পশু কেনার বিষয়টি পরিস্থিতির আলোকে তিনটি স্বতন্ত্র বিধানের অন্তর্ভুক্ত-

১. নির্ধারিত সময়ে পরিশোধ: যদি ব্যাংকের দেওয়া সুদমুক্ত মেয়াদের (Grace Period) মধ্যে সম্পূর্ণ বিল পরিশোধ করা হয়, তবে এটি বৈধ ঋণ হিসেবে গণ্য হবে এবং কোরবানি সহিহ হবে। (বাদায়েউস সানায়ে: ৫/৬২; ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া: ৫/২৯৭)
২. বিলম্বে সুদে লিপ্ত হওয়া: সময়মতো বিল পরিশোধ না করলে যে সুদ আরোপিত হয়, তা গ্রহণ বা প্রদান করা স্পষ্ট হারাম। তবে ফিকহশাস্ত্রের নিয়ম অনুযায়ী, ক্রয়-বিক্রয় সম্পন্ন হওয়ার সাথেসাথেই পশুর মালিকানা সাব্যস্ত হয়ে যায় বিধায় সুদি ঋণের কারণে ব্যক্তি গুনাহগার হলেও কোরবানি আদায় হয়ে যাবে, যদিও ইবাদতের সওয়াব ও বরকত ক্ষুণ্ণ হবে। (রাদ্দুল মুহতার: ৬/৩১৩)
৩. সুদি শর্তে সই করা: ক্রেডিট কার্ড নেওয়ার সময় সুদের শর্তে সই করা শরিয়তে অনুৎসাহিত। তবে আধুনিক জীবনের প্রয়োজনে যদি কেউ এই কার্ড গ্রহণ করে এবং সুদ দেওয়া থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ মুক্ত রাখতে পারে, তাহলে তার কোরবানি ও লেনদেন সহিহ হবে। (আল-মাওসুআতুল ফিকহিয়্যাহ: ৩৪/২১৮)
মোটকথা, ক্রয়-বিক্রয় এবং সুদি ঋণ দুটি ভিন্ন চুক্তি। পশুর মালিকানা বৈধভাবে অর্জিত হলে কোরবানি নষ্ট হয় না। তবে ইবাদতকে সব ধরনের গুনাহ ও সন্দেহ থেকে মুক্ত রাখতে নগদ হালাল অর্থে পশু কেনাই তাকওয়ার দাবি এবং সর্বোত্তম পদ্ধতি।

আরও পড়ুন: সুদ খাওয়ার শাস্তি কী?

ঋণ নিয়ে কোরবানি ও ফিকহবিদদের অভিমত

আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক ফিকহের অধ্যাপক ড. আবদুল ফাত্তাহ ইদ্রিসের মতে, কোরবানি শুধু সামর্থ্যবানদের জন্য। যাদের সামর্থ্য নেই তাদের ওপর কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যের বাইরে দায়িত্ব দেন না।’ (সুরা বাকারা: ২৮৬)
তবে যদি কেউ ঋণ নিয়ে কোরবানি দেন এবং তা শরিয়াহ অনুযায়ী সঠিকভাবে সম্পন্ন করেন, তবে তা বৈধ হবে। হানাফি ফিকহ অনুযায়ী, পরিশোধের সক্ষমতা থাকলে ঋণ নিয়ে কোরবানি করা জায়েজ। (ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া: ৫/২৯৭, বাদায়েউস সানায়ে: ৫/৬২)

দলিল ও শরয়ি ভিত্তি

হালাল উপার্জন: আল্লাহ তাআলা বলেন- ‘হে মুমিনগণ! তোমরা যা উপার্জন করো তা থেকে উত্তম জিনিস ব্যয় করো।’ (সুরা বাকারা: ২৬৭)। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন- ‘আল্লাহ পবিত্র এবং তিনি পবিত্র ছাড়া কিছু গ্রহণ করেন না।’ (সহিহ মুসলিম: ১০১৫)
সুদের ভয়াবহতা: ‘সুদ আদান-প্রদানকারীদের বিরুদ্ধে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের যুদ্ধ ঘোষণা।’ (সুরা বাকারা: ২৭৯)

আরও পড়ুন: রেমিট্যান্স প্রণোদনা: শরিয়তের দৃষ্টিতে হালাল না হারাম? 

গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা ও পরামর্শ

১. সামর্থ্য বিবেচনা: ঋণের কারণে যদি ভবিষ্যতে আর্থিক সংকট বা মানসিক চাপ সৃষ্টির আশঙ্কা থাকে, তাহলে ঋণ নিয়ে কোরবানি না করাই শ্রেয়।
২. সময় সচেতনতা: ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করলে অবশ্যই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিল পরিশোধ নিশ্চিত করুন, যেন এক পয়সাও সুদের খাতে না যায়।
৩. ইখলাস: লোকদেখানো বা প্রদর্শনীর মানসিকতা বর্জন করে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কোরবানি করুন।
৪. অগ্রাধিকার: ঋণ পরিশোধ করা ওয়াজিব। তাই ঋণে জর্জরিত ব্যক্তির জন্য ঋণ আরও বাড়িয়ে কোরবানি করার চেয়ে ঋণ পরিশোধে মনোযোগী হওয়া অধিক গুরুত্বপূর্ণ।

ইবাদতকে সব ধরনের সন্দেহ ও অশুচিতা থেকে মুক্ত রাখাই মুমিনের প্রকৃত বৈশিষ্ট্য। ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে পশু ক্রয় মূলত বৈধ হলেও সুদ থেকে সম্পূর্ণ বেঁচে থাকা এবং সম্ভব হলে নগদ অর্থে পশু কেনাই তাকওয়ার দাবি। ইসলাম মানুষকে অপ্রয়োজনীয় আর্থিক চাপে ফেলতে নিরুৎসাহিত করে। তাই সামর্থ্য না থাকলে ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে কোরবানি করার চেয়ে ইখলাসের সাথে সামর্থ্যের জন্য দোয়া করাই উত্তম।

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর