বিদেশ থেকে পাঠানো অর্থের ওপর সরকারের নগদ প্রণোদনা শরিয়তের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ জায়েজ ও গ্রহণযোগ্য বলে ইসলামিক বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছেন। সরকার রেমিট্যান্সকে বৈধ চ্যানেলে আনার পাশাপাশি অর্থপাচার রোধে উৎসাহ প্রদানের লক্ষ্যে এই প্রণোদনা চালু করেছে। বর্তমানে এ হার ২.৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রণোদনার প্রেক্ষাপট ও উদ্দেশ্য
রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। সরকারের এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য হলো- প্রবাসীদের বৈধ চ্যানেলে অর্থ প্রেরণে উৎসাহিত করা, হুন্ডির মাধ্যমে অবৈধ অর্থ পাচার রোধ করা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি করা এবং জাতীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা।
শরিয়তের দৃষ্টিভঙ্গি
ইসলামিক অর্থনীতি বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রণোদনা সুদ নয়; বরং সরকারের পক্ষ থেকে প্রদত্ত ইনাম বা পুরস্কার হিসেবে গণ্য হবে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে- ‘আল্লাহ সুদকে হারাম করেছেন আর বিক্রয়কে হালাল করেছেন।’ (সুরা বাকারা: ২৭৫)
আরও পড়ুন: ঋণ পরিশোধের সময় স্বেচ্ছায় কিছু টাকা বেশি দিলে সুদ হবে?
বিজ্ঞাপন
সুদের শরয়ি সংজ্ঞা ও প্রণোদনার অবস্থান
ফিকহগ্রন্থ হেদায়া-তে সুদের সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে- ‘সুদ বলতে মূলত এমন কোনো অতিরিক্ত অর্থ বোঝানো হয়, যা বিনিময়মূলক চুক্তিতে চুক্তিকারী পক্ষদ্বয়ের কোনো একপক্ষ মূল চুক্তিতে শর্তের ভিত্তিতে প্রাপ্ত হয়।’ (হেদায়া, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৭৮)
এই সংজ্ঞার আলোকে সরকারি রেমিট্যান্স প্রণোদনা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়- এটি কোনো বিনিময়মূলক চুক্তির অংশ নয়, প্রেরক ও প্রাপকের মধ্যে কোনো শর্তার্পিত অতিরিক্ত অর্থ নেই এবং সরকার একটি তৃতীয় পক্ষ হিসেবে পুরস্কার প্রদান করছে।
ফিকহি দলিল
‘রেমিটেন্সের ওপর প্রদত্ত প্রণোদনা কোনো সুদ নয়, বরং বৈধ উপায়ে টাকা পাঠানোর পুরস্কারমাত্র। আর বৈধ কোনো কাজের ওপর পুরস্কার দেওয়া ও গ্রহণ করা জায়েজ। তাই প্রবাসী বা তাদের আত্মীয়-স্বজনের জন্য এ প্রণোদনা গ্রহণ করা জায়েজ।’ (দ্র: ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া: ৫/৩৪২; আল-মাউসুআতুল ফিকহিয়্যা: ১৫/৭৭)
আরও পড়ুন: হারাম উপার্জন: দুনিয়াতেই নেমে আসে যেসব অভিশাপ
শরয়ি বৈধতার কয়েকটি দিক
১. সরকারি ইনাম: বাংলাদেশ ব্যাংক সরকারি রাজস্ব থেকে এই প্রণোদনা প্রদান করে, যা সরকারের পক্ষ থেকে প্রদত্ত পুরস্কার হিসেবে গণ্য হয়।
২. উৎসাহমূলক পদক্ষেপ: এটি কেবল বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রেরণে উৎসাহিত করার একটি ব্যবস্থা।
৩. সুদের সংজ্ঞার বাইরে: ইসলামি ফিকহ অনুযায়ী, সুদ হলো ঋণের বিনিময়ে গ্রহণকৃত অতিরিক্ত অর্থ। এখানে কোনো ঋণ লেনদেন নেই; বরং বৈদেশিক মুদ্রা বিক্রির বিনিময়ে সরকার কর্তৃক প্রদত্ত প্রণোদনা।
৪. ফিকহি নীতির আলোকে বৈধ: ইসলামি ফিকহের ‘আল-জাওয়ায বিল-ইনআম’ (পুরস্কারের বৈধতা) নীতিমালা অনুযায়ী সরকার কর্তৃক প্রদত্ত এই প্রণোদনা শরিয়তসম্মত। এটি ‘মাসলাহাতুল আম্মাহ’ (সাধারণ কল্যাণ) ও ‘দাফউল হারাজ’ (কষ্ট দূরীকরণ) এর অন্তর্ভুক্ত।
আরও পড়ুন: পণ্য বিক্রয়ে সর্বোচ্চ কত টাকা লাভ করা জায়েজ?
আন্তর্জাতিক ইসলামিক বিশেষজ্ঞদের মতামত
দারুল ইফতা, মিশর: ‘সরকারের পক্ষ থেকে প্রদত্ত প্রণোদনা যদি কোনো সুদের শর্ত ছাড়া বৈধ চ্যানেলে অর্থ প্রেরণের জন্য পুরস্কার হিসেবে দেওয়া হয়, তবে তা গ্রহণ করা সম্পূর্ণ হালাল।’
সৌদি আরবের ফতোয়া বোর্ড: ‘এই প্রণোদনার অর্থ সরকারের পক্ষ থেকে প্রদত্ত একটি ন্যায্য পুরস্কার, যা শরিয়াহ অনুযায়ী বৈধ।’
বাংলাদেশের ইসলামিক স্কলারদের মতামত
মুফতি ইউসুফ সুলতান বলেন- ‘হ্যাঁ, এটি হালাল হবে। এটি তৃতীয় পক্ষ (সরকার) থেকে আসছে, যা দেশের মধ্যে রেমিট্যান্স আনতে উৎসাহ দেওয়ার জন্য প্রদান করা হচ্ছে। এটি ঋণ চুক্তিতে কোনো অতিরিক্ত অর্থ হিসেবে বিবেচিত নয়। প্রেরক ব্যাংকের মাধ্যমে গ্রাহকের কাছে অর্থ পাঠাচ্ছেন। ব্যাংক এখানে সেবাদাতা হিসেবে কাজ করছে। সরকার সম্পূর্ণরূপে একটি তৃতীয় পক্ষ। এটি একটি উপহার বা হাদিয়া।’
সতর্কতা
যদিও এই প্রণোদনা গ্রহণ সম্পূর্ণ জায়েজ, তবে রেমিট্যান্স প্রেরণ অবশ্যই শরিয়তসম্মত পদ্ধতিতে হতে হবে। কোনো ধরনের অবৈধ বা সন্দেহজনক লেনদেন থেকে বিরত থাকা জরুরি।
শেষ কথা, সরকারের রেমিট্যান্স প্রণোদনা শরিয়তের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য ও হালাল। এটি সুদের আওতায় পড়ে না; বরং সরকারি ইনাম হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় গ্রহণে কোনো আপত্তি নেই। ইসলামে প্রতিটি লেনদেনের ক্ষেত্রে সততা, ন্যায় ও স্বচ্ছতা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রণোদনা সেই ন্যায্যতারই প্রতিফলন, যা দেশের অর্থনীতি ও প্রবাসী কল্যাণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে।




