হজ ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুকন ও ফরজ ইবাদত। অনেক ত্যাগ ও শ্রমের বিনিময়ে একজন মুমিন হজে যান। হজের মূল সার্থকতা হলো তা আল্লাহর দরবারে কবুল হওয়া, যাকে বলা হয় ‘হজ্জে মাবরুর’। হজ কবুল হলে হাজি নিষ্পাপ হয়ে ফিরে আসেন। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন- ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর উদ্দেশ্যে হজ করল এবং অশালীন কথাবার্তা ও গুনাহ হতে বিরত রইল, সে সেদিনের মতো নিষ্পাপ হয়ে হজ থেকে ফিরে আসবে, যেদিন তার মা তাকে জন্ম দিয়েছিল।’ (সহিহ বুখারি: ১৫২১)
আল্লাহর সন্তুষ্টির নিয়ত, হালাল উপার্জন এবং গুনাহমুক্ত হজের প্রতিদান হিসেবে রাসুলুল্লাহ (স.) জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন। তবে হজ কবুল হলো কি না, তা বোঝার জন্য ওলামায়ে কেরাম কোরআন ও হাদিসের আলোকে ৭টি বিশেষ লক্ষণের কথা উল্লেখ করেছেন-
বিজ্ঞাপন
১. জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন ও আমলের স্পৃহা
হজ কবুল হওয়ার সবচেয়ে বড় আলামত হলো- হজ থেকে ফিরে আসার পর হাজির আমলে ও চরিত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন আসা। ওলামায়ে কেরাম বলেন, কোনো ইবাদত কবুল হওয়ার চিহ্ন হলো- সেই ইবাদতের পর আরও একটি ভালো কাজ করার তাওফিক পাওয়া। হজ করার পর যদি আমল ও আখলাকে আগের চেয়ে উন্নতি লক্ষ্য করা যায়, তবে তা হজ কবুলের বড় ইঙ্গিত।
আরও পড়ুন: হজ করার পর যেসব আমলে মনোযোগী হবেন
২. আমল শেষে অন্তরে অদৃশ্য প্রশান্তি
ইবাদতের পর এক অদৃশ্য প্রশান্তি অনুভব করা, যা জাগতিক আনন্দ থেকে ভিন্ন- এটি হজ কবুলের অন্যতম বড় লক্ষণ। ইমাম গাজালি (রহ.)-এর মতে, ইবাদতের পর অন্তরে যে স্বস্তি অনুভূত হয়, তা মূলত আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দার জন্য ওই আমল কবুলের একটি সূক্ষ্ম স্বীকৃতি।
৩. দুনিয়ার মোহ হ্রাস ও পরকালের প্রতি আগ্রহ
হজ শেষে হাজির মন থেকে দুনিয়ার যশ ও সম্পদের পাহাড় গড়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা কমে যায় এবং আখেরাতের পাথেয় গোছানোর চিন্তা প্রবল হয়। বিখ্যাত আলেম হাসান বসরি (রহ.)-কে ‘হজ্জে মাবরুর’ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন- ‘হজ্জে মাবরুর হলো- হজ থেকে ফিরে এসে দুনিয়ার প্রতি বিমুখ হওয়া এবং আখেরাতের প্রতি আগ্রহী হওয়া।’
আরও পড়ুন: হজের সামর্থ্য না থাকলে এই ৫টি আমল করুন
৪. গুনাহের প্রতি ঘৃণা ও তাওবার আধিক্য
হজ থেকে ফিরে আসার পর যদি দেখা যায় যে, যেকোনো গুনাহের কাজের প্রতি হাজির মনে ভয় ও অনীহা তৈরি হয়েছে, তবে বুঝতে হবে আল্লাহ তাকে পছন্দ করেছেন। মানুষের মনে ইস্তেগফার ও তাওবার পরিমাণ বেড়ে যাওয়া এবং অন্যায় কাজ থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখা মকবুল হজের আলামত।
৫. বিনয়, শিষ্টাচার ও পরোপকার
হজ কবুল হওয়া হাজিদের আচার-ব্যবহারে নম্রতা প্রকাশ পায়। সাহাবায়ে কেরাম রাসুলুল্লাহ (স.)-কে হজে মাবরুর সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি দুটি গুণের কথা বলেছিলেন- ‘ক্ষুধার্তকে অন্ন দান করা এবং সবার সাথে নরম ও মিষ্টি ভাষায় কথা বলা।’ (মুসনাদে আহমদ)। অহংকারমুক্ত ও সহজ-সরল জীবনের প্রতি আগ্রহ তৈরি হওয়া কবুল হজের নিদর্শন।
আরও পড়ুন: হজ ও ওমরা পালনকারীরা যেসব প্রতিদান পাবেন
৬. ইবাদতে অতৃপ্তি ও কবুল না হওয়ার ভয়
একজন নিষ্ঠাবান হাজি যত আমলই করুন না কেন, তা তার কাছে অল্প মনে হবে। তার মনে সবসময় এই ভয় থাকবে যে, ‘আমার আমলটি আল্লাহ কবুল করলেন তো?’ এই বিনয় ও ভয়ই তাকে আল্লাহর আরও কাছে নিয়ে যায়। যেকোনো আমল কবুল না হওয়ার এই ভয় মুমিনকে ইবাদতে আরও যত্নবান করে তোলে।
৭. আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি ভালোবাসা বৃদ্ধি
হজ পরবর্তী জীবনে আল্লাহ এবং তাঁর রাসুলুল্লাহ (স.)-এর প্রতি ভালোবাসা ও মহব্বত বহুগুণ বেড়ে যায়। সুন্নাহর প্রতি অনুরাগ এবং দ্বীনি বিষয়ের প্রতি গভীর টান অনুভব করা হজ কবুলের বিশেষ আলামত।
সতর্কতা
হজ করার পর জীবনে যদি কোনো পরিবর্তন না আসে, ভবিষ্যতে গুনাহ থেকে বিরত থাকার আগ্রহ না বাড়ে এবং আল্লাহর আনুগত্যের প্রতি যত্নবান না হওয়া যায়, তাহলে হজ কবুল হওয়ার বিষয়টি সন্দেহমুক্ত নয়। (আপকে মাসায়েল: ৪/২৫)
হজ করা বড় কথা নয়; হজ কবুলের জন্য ইসলামের নির্দেশনা মেনে চলা এবং জীবনব্যাপী হজের শিক্ষা ধারণ করাই আসল সার্থকতা। ‘কবুল হজের প্রতিদান জান্নাত ছাড়া কিছুই নয়।’ (সহিহ বুখারি: ১৭৭৩) আল্লাহ তাআলা সকল হাজির হজকে ‘হজ্জে মাবরুর’ হিসেবে কবুল করুন। আমিন।




