বুধবার, ১৫ এপ্রিল, ২০২৬, ঢাকা

গরম খাবারে ফুঁ: সুন্নাহর নিষেধাজ্ঞা ও স্বাস্থ্যঝুঁকি

ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:০৬ পিএম

শেয়ার করুন:

গরম খাবারে ফুঁ: সুন্নাহর নিষেধাজ্ঞা ও স্বাস্থ্যঝুঁকি

দৈনন্দিন জীবনে খাবার বা পানীয় খুব বেশি গরম হলে আমরা তাড়াহুড়ো করে তাতে ফুঁ দিয়ে থাকি। সাধারণ দৃষ্টিতে এটি স্বাভাবিক অভ্যাস মনে হলেও ইসলামি শরিয়তে এ বিষয়ে সুন্নাহ ও সতর্কতা রয়েছে। প্রিয়নবী (স.)-এর এই সূক্ষ্ম নির্দেশনার মাঝে যে গভীর বরকত ও স্বাস্থ্যগত সুরক্ষা নিহিত, আধুনিক বিজ্ঞানও এর যৌক্তিকতা সমর্থন করছে।

রাসুলুল্লাহ (স.)-এর নিষেধাজ্ঞা

পানপাত্রে নিঃশ্বাস ফেলা বা ফুঁ দেওয়াকে নবীজি অপছন্দ করতেন। হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন- ‘রাসুলুল্লাহ (স.) পানপাত্রে নিঃশ্বাস ফেলতে এবং তাতে ফুঁ দিতে নিষেধ করেছেন।’ (ইবনে মাজাহ: ৩৪২৮, ৩৪২৯) আবু সাঈদ খুদরি (রা.) হতে বর্ণিত আছে, পানীয় দ্রব্যের মধ্যে ফুঁ দিতে রাসুলুল্লাহ (স.) নিষেধ করেছেন। একজন বলল, পানির পাত্রে ময়লা দেখতে পেলে? তিনি বলেন, তা ঢেলে ফেলে দাও। লোকটি বলল, আমি এক নিঃশ্বাসে তৃপ্ত হতে পারি না। তিনি বললেন, পাত্রটিকে নিঃশ্বাসের সময় তোমার মুখ হতে সরিয়ে রাখ। (জামে তিরমিজি: ১৮৮৭)

তৃপ্তিসহ পান করার সুন্নত পদ্ধতি

এক নিঃশ্বাসে পান করলে তৃপ্তি হয় না বা দম বন্ধ হয়ে আসে-এমন সমস্যারও সমাধান দিয়েছেন বিশ্বনবী (স.)। আবু সাঈদ খুদরি (রা.)-এর বর্ণিত হাদিসের বাকি অংশে এসেছে, ওই ব্যক্তি যখন এমন নিবেদন করল, তখন রাসুল (স.) বললেন- ‘তাহলে তুমি পেয়ালা মুখ থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে (বাইরে) নিঃশ্বাস গ্রহণ করো।’ (রিয়াদুস সালেহিন: ৭৬৯)
অর্থাৎ, পাত্রের ভেতরে নিঃশ্বাস না ফেলে পাত্রটি মুখ থেকে সরিয়ে বাইরে নিঃশ্বাস নিয়ে পুনরায় পান করা হলে স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকে না এবং তৃপ্তিও মেটে।

আরও পড়ুন: ইসলামে খাবার গ্রহণের ১১ শিষ্টাচার


বিজ্ঞাপন


বিজ্ঞানের সতর্কবার্তা: কেন ফুঁ দেওয়া ক্ষতিকর?

রাসুল (স.)-এর এই ১৪০০ বছর আগের নির্দেশের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আজ অত্যন্ত স্বচ্ছ। চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে-
কার্বন ডাই-অক্সাইডের প্রভাব: মানুষ শ্বাস-প্রশ্বাসের সময় অক্সিজেন গ্রহণ করে এবং কার্বন ডাই-অক্সাইড ত্যাগ করে। নিঃশ্বাসের সাথে বের হওয়া এই কার্বন ডাই-অক্সাইড মূলত দেহের দূষিত বাষ্প। গরম খাবারে ফুঁ দেওয়ার সময় এই গ্যাস খাবারের উপাদানের সাথে মিশে এক ধরণের অম্লীয় পরিবেশ তৈরি করতে পারে, যা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ: মুখ ও নিঃশ্বাসে থাকা কোটি কোটি অণুজীব ফুঁ দেওয়ার মাধ্যমে পানীয় বা খাবারে মিশে যায়। এতে শরীরে বিভিন্ন রোগ-জীবাণু প্রবেশের সুযোগ তৈরি হয়।

বিশুদ্ধ পানি ও হাদিসের আমল

উন্নত বিশ্বে বিশুদ্ধ পানির জন্য বর্তমানে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়। যেমন জার্মানিতে চারজনের একটি পরিবার বিশুদ্ধ পানির জন্য বছরে প্রায় দেড় হাজার ইউরো ব্যয় করে। এত সচেতনতার পরও যদি কেউ পানি পানের সময় সুন্নাহ পরিপন্থীভাবে পাত্রে ফুঁ দেয় বা নিঃশ্বাস ফেলে, তবে তার পুরো শ্রমই বৃথা হয়ে যায়। কারণ, তার নিজের নিঃশ্বাসের মাধ্যমেই পানিটি পুনরায় দূষিত হয়ে পড়ছে।

আরও পড়ুন: সারাদিন কতবার খাওয়া সুন্নত?

খাবারের বরকত ও গরম খাবার

খাবার খুব বেশি গরম অবস্থায় খাওয়াকেও ইসলাম নিরুৎসাহিত করেছে। হজরত আসমা বিনতে আবু বকর (রা.) গরম খাবার ঠান্ডা না হওয়া পর্যন্ত ঢেকে রাখতেন এবং বলতেন, আমি রাসূলুল্লাহ (স.)-কে বলতে শুনেছি- ‘খাবার ঠান্ডা করে খাওয়া অধিক বরকতময়।’ (সুনানে দারেমি: ২০৪৭)

সুন্নতের অনুসরণে কেবল পরকালীন মুক্তি নয়, বরং ইহকালীন কল্যাণ ও সুস্বাস্থ্যও নিহিত। গরম খাবারে বা পানীয়তে ফুঁ না দেওয়ার এই ছোট আমলটি আমাদের নানাবিধ সংক্রমণ থেকে রক্ষা করতে পারে। আল্লাহ তাআলা আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে রাসুল (স.)-এর সুন্নতের পূর্ণ অনুসরণের তাওফিক দান করুন। আমিন।

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর