মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬, ঢাকা

অজানা শিরক: নিজের ইচ্ছাকে ‘ইলাহ’ বানানো

ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:০০ পিএম

শেয়ার করুন:

অজানা শিরক: নিজের ইচ্ছাকে ‘ইলাহ’ বানানো

মূর্তিপূজা থেকে দূরে থাকা সহজ, কিন্তু মনের ভেতরের ‘অদৃশ্য মূর্তিপূজা’ চেনা কঠিন। শিরকের একটি সূক্ষ্ম রূপ হলো নিজের প্রবৃত্তি বা ইচ্ছাকে আল্লাহর হুকুমের ওপর প্রাধান্য দেওয়া। এটি এমন এক অদৃশ্য জাল, যা মুমিনের ঈমানকে নীরবে ক্ষয় করে। এটি সব ক্ষেত্রে ‘বড় শিরক’ (শিরকে আকবর) নয়; তবে প্রবৃত্তি যখন আল্লাহর বিধানের চেয়ে বেশি প্রিয় হয়ে ওঠে, তখন তা ঈমানের মূল ভিত্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

‘হাওয়া’ বা প্রবৃত্তির অর্থ

আরবি ‘হাওয়া’ (الهوى) শব্দের অর্থ পতন। আলেমরা বলেন, একে ‘হাওয়া’ বলা হয় কারণ এটি মানুষকে সত্য থেকে বিচ্যুত করে গোমরাহির গর্তে নিক্ষেপ করে। যখন নিজের খেয়ালখুশিই মানুষের ‘ধর্ম’ হয়ে দাঁড়ায়, তখনই সে প্রবৃত্তির দাসত্ব শুরু করে।

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন- ‘আপনি কি তাকে লক্ষ্য করেছেন, যে তার প্রবৃত্তিকে নিজের ইলাহ বানিয়ে নিয়েছে?’ (সুরা জাসিয়াহ: ২৩) অন্য আয়াতে এসেছে- ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর হেদায়াত ছেড়ে স্বীয় প্রবৃত্তির অনুসরণ করে, তার চেয়ে অধিক পথভ্রষ্ট আর কে?’ (সুরা কাসাস: ৫০)

আরও পড়ুন: শিরক না করলে যেসব প্রতিদান পাবেন

রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন- ‘তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না তার ইচ্ছা আমার আনীত শরিয়তের অনুগামী হয়।’ (শরহুস সুন্নাহ)


বিজ্ঞাপন


আলী (রা.) বলতেন, ‘প্রবৃত্তির অনুসরণ মানুষকে সত্য থেকে বিমুখ করে রাখে।’ ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) বলেন, ‘প্রবৃত্তি হলো এমন এক গোপন উপাস্য, যা মানুষের অন্তরে লুকিয়ে থাকে।’

কখন নিজের ইচ্ছা ‘ইলাহ’ হয়ে ওঠে?

  • সুবিধাবাদী মানসিকতা: নিজের সুবিধার জন্য শরিয়তের বিধান মানা, আর অসুবিধা হলে তা এড়িয়ে যাওয়া।
  • অজুহাতের আশ্রয়: ‘মন সায় দিচ্ছে না’ বলে বা অলসতার কারণে ফরজ ইবাদত থেকে দূরে থাকা।
  • বিদআতের জন্ম: দ্বীনের মাঝে নিজের যুক্তি বা রুচি অনুযায়ী নতুন কিছু সংযোজন করা।
  • যুক্তি দিয়ে গুনাহ জায়েজ করা: আল্লাহ যা হারাম করেছেন, নিজের পছন্দ অনুযায়ী তাকে আধুনিকতা বা প্রগতির দোহাই দিয়ে বৈধ মনে করা।

আরও পড়ুন: নামাজের মধ্যেও মানুষ শিরক করে যেভাবে

প্রবৃত্তি ও শিরকের ধরন

১. বড় শিরক (শিরকে আকবর): যদি কেউ প্রবৃত্তির তাড়নায় আল্লাহর বিধানকে সরাসরি অস্বীকার করে নিজের ইচ্ছাকেই চূড়ান্ত আইন বা বিধান হিসেবে গ্রহণ করে।
২. ছোট শিরক (শিরকে আসগর): যদি কেউ আল্লাহর বিধান স্বীকার করে কিন্তু নফসের দুর্বলতার কারণে মাঝেমধ্যে নিজের ইচ্ছাকে প্রাধান্য দেয়। এটি ঈমান দুর্বল হওয়ার এবং মারাত্মক গুনাহে লিপ্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করে।

মুক্তির পথ ও প্রতিকার

ইলম অর্জন: কোনটি আল্লাহর হুকুম আর কোনটি নফসের ধোঁকা তা জানার চেষ্টা করা।
তাজকিয়া (আত্মশুদ্ধি): নফসকে আল্লাহর হুকুমের অনুগত করার প্রশিক্ষণ নেওয়া।
রাসুল (স.)-এর শেখানো দোয়া পড়া: ‘ইয়া মুকাল্লিবাল কুলুব, ছাব্বিত কালবি আলা দ্বীনিক’ (হে অন্তর পরিবর্তনকারী! আমার অন্তরকে আপনার দ্বীনের ওপর অটল রাখুন)।

সবচেয়ে কঠিন শিরক হলো সেই শিরক, যা আমরা শিরক মনে করি না। যেমন নিজের ইচ্ছার দাসত্ব। প্রজ্ঞাবান লুকমান (আ.)-এর সেই অমর উপদেশ আজ আমাদের জন্য বড় শিক্ষা- ‘নিশ্চয়ই শিরক বড় জুলুম।’ আর এই জুলুমের হাত থেকে বাঁচতে হলে নিজের ‘অহম’কে আল্লাহর হুকুমের সামনে সমর্পণ করার কোনো বিকল্প নেই।

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর