পোশাক মানুষের ব্যক্তিত্ব, রুচি ও আত্মমর্যাদার প্রতিফলন। ইসলামি জীবনদর্শনে পোশাক শালীনতা, পরিচ্ছন্নতা ও আধ্যাত্মিক ভারসাম্যের প্রতীক। সাম্প্রতিক সময়ে কিছু মানুষের মধ্যে একটি ভ্রান্ত ধারণা লক্ষ্য করা যায় যে তারা দারিদ্র্য বা অনাড়ম্বর জীবন বোঝাতে ইচ্ছাকৃতভাবে ছেঁড়া কাপড় বা জীর্ণ পোশাক পরাকে ‘সুন্নাহ’ হিসেবে প্রচার করেন। কোরআন, সুন্নাহ এবং আলেমদের ব্যাখ্যার আলোকে এ বিষয়ে সঠিক দিকনির্দেশনা জানা জরুরি।
পরিচ্ছন্নতা ও সৌন্দর্য: ইসলামের মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গি
ইসলাম পরিচ্ছন্নতা ও পরিমিত সৌন্দর্যকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ সুন্দর, তিনি সৌন্দর্যকে ভালোবাসেন।’ (সহিহ মুসলিম: ৯১) এই হাদিস থেকে প্রতীয়মান হয়, সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও নিজেকে নোংরা বা জীর্ণ অবস্থায় রাখা ইসলামের শিক্ষা নয়; বরং সামর্থ্য অনুযায়ী পরিচ্ছন্ন ও মার্জিত পোশাক পরা প্রশংসনীয়।
আরও পড়ুন: নবীজির প্রিয় খাবার, পোশাক ও শখ কী ছিল?
নেয়ামতের বহিঃপ্রকাশ ও জীর্ণ পোশাক পরিহার
হজরত আবু আহওয়াস (রা.)-এর পিতা থেকে বর্ণিত, তিনি জীর্ণ পোশাকে রাসুলুল্লাহ (স.)-এর কাছে উপস্থিত হলে নবীজি (স.) জিজ্ঞাসা করেন, তার সম্পদ আছে কি না। তিনি ‘হ্যাঁ’ বললে রাসুল (স.) বলেন, ‘আল্লাহ যখন তোমাকে সম্পদ দিয়েছেন, তখন তোমার ওপর তাঁর নেয়ামতের চিহ্ন থাকা উচিত।’ (সুনানে নাসায়ি: ৫২২৩; সুনানে আবু দাউদ: ৪০৬৩)
বিজ্ঞাপন
এ হাদিস থেকে বোঝা যায়- সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কৃত্রিম দীনতা প্রদর্শনের জন্য জীর্ণ বা ছেঁড়া পোশাক পরা সুন্নত নয়; বরং এটি নেয়ামতের যথাযথ কৃতজ্ঞতার পরিপন্থী।
তালি দেওয়া কাপড়: মিতব্যয়িতা, না সুন্নত?
রাসুলুল্লাহ (স.) ও সাহাবায়ে কেরাম (রা.) কখনো তালি দেওয়া (প্যাচ লাগানো) কাপড় ব্যবহার করেছেন। তবে এটি ছিল তাদের সরলতা, মিতব্যয়িতা এবং অপচয় বর্জনের বাস্তব প্রতিফলন; কোনো প্রদর্শনমূলক আমল নয়। হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (স.) নিজের কাপড় নিজে মেরামত করতেন। (সহিহ বুখারি)
অতএব, কাপড় ছিঁড়ে গেলে তা তালি দিয়ে ব্যবহার করা উত্তম; কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে ছেঁড়া কাপড় পরা বা এটিকে সুন্নত হিসেবে প্রচার করা ভিত্তিহীন।
আরও পড়ুন: সাহাবিদের চোখে প্রিয়নবীজির সৌন্দর্য ও ব্যক্তিত্ব
লোকদেখানো পোশাকের নিষেধাজ্ঞা
ইসলামে ‘লিবাসুশ শুহরাহ’ বা খ্যাতি অর্জনের উদ্দেশ্যে পোশাক পরা নিষিদ্ধ। হাদিসে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি খ্যাতি লাভের জন্য পোশাক পরে, কেয়ামতের দিন আল্লাহ তাকে সেরূপ পোশাক পরাবেন, অতঃপর তাতে আগুন ধরিয়ে দেয়া হবে।’ (সুনানে আবু দাউদ: ৪০২৯)
আলেমদের মতে, এটি এমন পোশাককে বোঝায় যা মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য অস্বাভাবিক- হোক তা অত্যন্ত দামী বা অস্বাভাবিকভাবে জীর্ণ। অতএব, নিজেকে আলাদা বা অধিক পরহেজগার প্রমাণ করার উদ্দেশ্যে ছেঁড়া কাপড় পরাও এই নিষেধাজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
ইসলাম পোশাকের ক্ষেত্রে ভারসাম্যপূর্ণ জীবনযাপনের শিক্ষা দেয়। সুন্নত হলো পরিচ্ছন্ন, মার্জিত ও সামর্থ্য অনুযায়ী পরিমিত পোশাক পরা। কাপড় ছিঁড়ে গেলে তা তালি দিয়ে ব্যবহার করা মিতব্যয়িতার পরিচায়ক; তবে ইচ্ছাকৃতভাবে ছেঁড়া পোশাক পরা বা একে ধর্মীয় মর্যাদা দেওয়া শরিয়তসম্মত নয়।

