ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যা মানুষের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি কাজকে সুশৃঙ্খল ও মার্জিত করার পথ দেখায়। মানবদেহের প্রতিটি অঙ্গ আল্লাহর বড় নেয়ামত। তবে ব্যবহারের ক্ষেত্রে ইসলাম কিছু সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ও শিষ্টাচার নির্ধারণ করেছে। বিশেষ করে ডান ও বাম হাতের সঠিক ব্যবহার রাসুলুল্লাহ (স.)-এর সুন্নাহর এক অনন্য প্রতিফলন।
ডান হাতের গুরুত্ব ও সুন্নাহর আদর্শ
আল্লাহ তাআলা রাসুলুল্লাহ (স.)-কে মানবজাতির জন্য সর্বোত্তম আদর্শ হিসেবে পাঠিয়েছেন। আম্মাজান আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন- ‘নবী (স.) জুতা পরা, চুল আঁচড়ানো, পবিত্রতা অর্জন করা তথা প্রতিটি ভালো কাজই ডান দিক থেকে শুরু করতে ভালোবাসতেন।’ (সহিহ বুখারি: ১৬৮) অজু করতে প্রথমে ডান হাত ও পা ধোয়া এবং পোশাক পরার সময় ডান দিক প্রাধান্য দেওয়া সবই এই সুন্নাহর অন্তর্ভুক্ত।
পানাহারের ক্ষেত্রে হাতের ব্যবহার
ইসলামি শিষ্টাচার অনুযায়ী, পানাহারের ক্ষেত্রে ডান হাত ব্যবহার করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত। রাসুলুল্লাহ (স.) ইরশাদ করেছেন, ‘তোমাদের কেউ যখন খাবে সে যেন ডান হাতে খায় এবং যখন পান করবে সে যেন ডান হাতে পান করে। নিশ্চয়ই শয়তান বাম হাতে পানাহার করে।’ (সুনানে আবু দাউদ: ৩৭৭৬)
আরও পড়ুন: ইসলামে খাবার গ্রহণের ১১ শিষ্টাচার
বিজ্ঞাপন
অনেক সময় অসতর্কতা, অভ্যাস কিংবা অবহেলার কারণে অনেকে বাম হাতে পানাহার করেন। হাদিসে এ বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে। জনৈক ব্যক্তি রাসুল (স.)-এর সামনে বাম হাতে খাচ্ছিল। নবীজি তাকে ডান হাতে খেতে বললে সে অহংকারবশত বলেছিল, ‘আমি পারব না’। নবীজি তাকে লক্ষ্য করে বলেছিলেন, ‘তুমি যেন না-ই পারো; শুধুমাত্র অহমিকাই তাকে বারণ করছে।’ এরপর সেই ব্যক্তি আর কখনো তার ডান হাত মুখ পর্যন্ত তুলতে পারেনি। (সহিহ মুসলিম: ২০২১) এই ঘটনা থেকে বোঝা যায়, সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ইচ্ছাকৃতভাবে সুন্নাহর খেলাফ করা অনুচিত।
বাম হাতের জন্য ইসলামি নির্দেশনা
পরিচ্ছন্নতা ও শৃঙ্খলার খাতিরে ইসলাম বাম হাতকে প্রধানত শরীর থেকে ময়লা দূর করার কাজে ব্যবহারের শিক্ষা দিয়েছে। উম্মুল মুমিনিন হাফসা (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘নবী (স.) খাদ্যগ্রহণ, পানি পান ও বস্ত্র পরিধানের সময় ডান হাত ব্যবহার করতেন, এছাড়া অন্যান্য যাবতীয় কাজে বাম হাত ব্যবহার করতেন।’ (সুনানে আবু দাউদ: ৩২)
বাম হাত ব্যবহারের ক্ষেত্রগুলো হলো-
- ইস্তিঞ্জা বা শৌচকার্য সম্পাদন করা।
- নাক পরিষ্কার করা।
- শরীরের নাপাকি বা ময়লা পরিষ্কার করা।
- জুতা বা পোশাক খোলার সময় বাম দিক থেকে শুরু করা।
আরও পড়ুন: দাঁড়িয়ে পানাহার করলে কি গুনাহ হবে?
আদান-প্রদান ও ইবাদতে হাতের ব্যবহার
কাউকে কোনো কিছু দেওয়া বা কারো কাছ থেকে কিছু নেওয়া উভয় ক্ষেত্রেই ডান হাত ব্যবহার করা গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত ও আদব। রাসুল (স.) বলেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকে যেন ডান হাতে আহার করে, ডান হাতে পান করে, ডান হাতে গ্রহণ করে এবং ডান হাতে দান করে।’ (ইবনে মাজাহ: ৩২৬৬) এছাড়া জিকির ও তাসবিহ গণনার ক্ষেত্রেও ডান হাতের আঙুল ব্যবহার করা অধিকতর ফজিলতপূর্ণ। (তিরমিজি: ৩৫৮৩)
অপারগতা ও বামহাতিদের জন্য বিধান
শরিয়তের সাধারণ নিয়ম হলো, প্রতিটি উত্তম কাজ ডান হাতে করা মোস্তাহাব। তবে যারা জন্মগতভাবে বামহাতি কিংবা যাদের ডান হাতে কোনো শারীরিক সমস্যা রয়েছে, তাদের জন্য জীবন ধারণের প্রয়োজনে বাম হাতে কাজ করা বৈধ। ইমাম নববী (রহ.) বলেন, ‘যদি কোনো ওজর (অসুস্থতা বা জখম) থাকে যার কারণে ডান হাতে পানাহার কষ্টকর হয়, তবে বাম হাত ব্যবহারে কোনো মাকরুহ বা অপছন্দনীয়তা নেই।’ (শরহে মুসলিম ২/১৭২)
সমকালীন অভ্যাস ও বর্জনীয় দিক
বর্তমান সময়ে আধুনিকতার আড়ালে বা অন্যমনস্কতায় অনেককে বাম হাতে চা, কফি বা পানি পান করতে দেখা যায়। এটি একটি সুন্নাহবিরোধী অভ্যাস, যা এড়িয়ে চলা উচিত। আমাদের দৈনন্দিন ছোট ছোট কাজের মাধ্যমেও সুন্নাহর অনুসরণ সম্ভব। পানাহার, আদান-প্রদান ও ইবাদতের ক্ষেত্রে ডান হাত এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজে বাম হাত ব্যবহার করাই ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা।
ইসলামি জীবনদর্শনে ডান ও বাম হাতের এই বিভাজন মূলত কাজের সুশৃঙ্খল বণ্টন ও পরিচ্ছন্নতার বহিঃপ্রকাশ। সুন্নাহর অনুসরণ কেবল ইবাদতেই নয়, বরং প্রতিটি ছোট অভ্যাসেও রহমত বয়ে আনে। শয়তানের সাদৃশ্য বর্জন করে সুন্নাহ অনুযায়ী জীবন গড়াই হোক প্রতিটি মুমিনের লক্ষ্য; কারণ এই ছোট ছোট সুন্নাহর লালনই মুমিনের জীবনে বড় পরিবর্তন এনে দেয়।

