বুধবার, ৭ জানুয়ারি, ২০২৬, ঢাকা

দাঁড়িয়ে পানাহার করলে কি গুনাহ হবে?

ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৫ জানুয়ারি ২০২৬, ০৫:২৪ পিএম

শেয়ার করুন:

দাঁড়িয়ে পানাহার করলে কি গুনাহ হবে?

দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি কাজে ইসলামের সুন্দর, কল্যাণকর ও বিজ্ঞানসম্মত নির্দেশনা রয়েছে। পানাহারের মতো একটি সাধারণ অভ্যাসও এর ব্যতিক্রম নয়। ইসলামে বসে পানাহার করাকে উৎসাহিত করা হয়েছে এবং এটিকে নবী কারিম (স.)-এর পবিত্র সুন্নত হিসেবে গণ্য করা হয়। কিন্তু আধুনিক জীবনের ব্যস্ততায় বা কখনও অজ্ঞতাবশত অনেকে দাঁড়িয়ে পানাহার করে থাকেন। এ নিয়ে মুসলিম সমাজে একটি সাধারণ প্রশ্ন হলো- দাঁড়িয়ে পানাহার করলে কি গুনাহ হবে?

বসে পানাহার: নববি আদর্শ

ইসলামি শরিয়তের বিধান অনুযায়ী, বসে পানাহার করা নবীজি (স.)-এর স্থায়ী অভ্যাস ও একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত। স্বাভাবিক অবস্থায় কোনো গ্রহণযোগ্য কারণ ছাড়া দাঁড়িয়ে পানাহার করাকে ইসলামে মাকরুহ বা অপছন্দনীয় কাজ হিসেবে গণ্য করা হয়। এর কারণ হলো- হাদিস শরিফে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা এসেছে।
প্রখ্যাত সাহাবি আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ (স.) দাঁড়িয়ে পান করতে নিষেধ করেছেন।’ বর্ণনাকারী কাতাদা (রহ.) বলেন, আমরা আনাস (রা.)-কে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘তাহলে দাঁড়িয়ে খাওয়া কেমন?’ তিনি বললেন, ‘এটা তো আরও মন্দ ও নিকৃষ্ট কাজ।’ (সহিহ মুসলিম: ২০২৪)

দাঁড়িয়ে পানের আধ্যাত্মিক ক্ষতি

দাঁড়িয়ে পানাহারের নিষেধাজ্ঞার পেছনে কেবল সাধারণ শিষ্টাচারই নয়, বরং একটি গভীর আধ্যাত্মিক কারণও নিহিত রয়েছে। হাদিসে এটিকে শয়তানের কর্মকাণ্ডের সাথে তুলনা করা হয়েছে। আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (স.) এক ব্যক্তিকে দাঁড়িয়ে পান করতে দেখে বললেন, ‘বমি করে ফেলে দাও।’ লোকটি অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল, কেন? তিনি বললেন, তুমি কি এটা পছন্দ করবে যে তোমার সাথে একটি বিড়াল পান করুক? সে বলল, না। তখন রাসুলুল্লাহ (স.) বললেন, এর চেয়েও নিকৃষ্ট একজন, অর্থাৎ শয়তান তোমার সাথে পান করেছে। (শরহু মুশকিলুল আছার: ২১০২)
এই হাদিসটি অত্যন্ত কঠোরভাবে দাঁড়িয়ে পান করাকে নিরুৎসাহিত করে এবং আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, যখন কোনো ব্যক্তি দাঁড়িয়ে পান করে, তখন তার এই কাজে শয়তান অংশীদার হয়।

আরও পড়ুন: পানি পানের ৮ সুন্নত


বিজ্ঞাপন


বিশেষ প্রয়োজনে ছাড়

ইসলাম একটি বাস্তবসম্মত জীবনব্যবস্থা। তাই কঠোর নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি বিশেষ পরিস্থিতিতে ছাড়ও দিয়েছে। হাদিসেই এর প্রমাণ পাওয়া যায়।
ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘আমি রাসুলুল্লাহ (স.)-কে জমজমের পানি পান করিয়েছি, আর তিনি দাঁড়িয়ে তা পান করেছেন।’ (সহিহ বুখারি: ১৬৩৭)
আলী (রা.) কুফার মসজিদের দরজায় দাঁড়িয়ে পানি পান করেন এবং বলেন, ‘আমি রাসুলুল্লাহ (স.)-কে এমনটিই করতে দেখেছি, যেমনটি তোমরা আমাকে করতে দেখলে।’ (সহিহ বুখারি: ৫৬১৫)

মাকরুহের ধরন: তানজিহি

ইসলামি আইনশাস্ত্রবিদগণ নিষেধাজ্ঞা ও অনুমোদন এই দুই ধরনের হাদিসের মধ্যে অত্যন্ত সুন্দরভাবে সমন্বয় করেছেন। তাঁদের মতে, রাসুল (স.)-এর নিষেধাজ্ঞাটি ছিল এটিকে অনুত্তম ও সুন্নাহর পরিপন্থী হিসেবে শেখানোর জন্য। আর তাঁর নিজের দাঁড়িয়ে পান করার কারণ ছিল এটা স্পষ্ট করা যে, এই কাজটি হারাম বা মাকরুহে তাহরিমি (যা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত) নয়।

আরও পড়ুন: পাত্রে ফুঁ দেওয়া ইসলামে নিষেধ কেন?

এই সমন্বয়ের ভিত্তিতে ফুকাহায়ে কেরামের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হলো- বিনা ওজরে দাঁড়িয়ে পানাহার করা মাকরুহে তানজিহি। এটি এমন অপছন্দনীয় কাজ যা গুনাহ নয়, তবে এর মাধ্যমে সুন্নতের সওয়াব ও বরকত থেকে বঞ্চিত হতে হয়। এটি উত্তম আদর্শের পরিপন্থী।

বসে পানাহার করা সুন্নত ও মুস্তাহাব। এটিই সর্বোত্তম পন্থা এবং এর মধ্যেই রয়েছে শারীরিক ও আধ্যাত্মিক কল্যাণ। ওজরের কারণে (যেমন: বসার জায়গা না থাকা, অসুস্থতা ইত্যাদি) দাঁড়িয়ে পানাহার করা সম্পূর্ণরূপে জায়েজ। এতে কোনো অসুবিধা নেই।

উপরোক্ত আলোচনা থেকে এটি সুস্পষ্ট যে, স্বাভাবিক অবস্থায় দাঁড়িয়ে পানাহার করলে সরাসরি গুনাহ হবে না। তবে এটি একটি অপছন্দনীয় কাজ এবং নবীজি (স.)-এর উত্তম আদর্শের পরিপন্থী। বসে পান করার মতো একটি ছোট সুন্নত অনুসরণের মাধ্যমে আমরা কেবল শারীরিক উপকারই লাভ করি না, বরং শয়তানের প্রভাব থেকে সুরক্ষিত থাকি এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি ও অশেষ সওয়াব অর্জন করি।

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর