পবিত্র রমজান মাস ছিল কোরআন নাজিলের মাস। মাসজুড়ে মসজিদে তারাবির সালাতে কোরআন শ্রবণ ও খতম করার এক অনন্য জোয়ার আমরা দেখেছি। কিন্তু এই আধ্যাত্মিক সময় শেষে আমাদের সামনে এক কঠিন বাস্তবতা এসে দাঁড়ায়- রমজান শেষ হওয়ার সঙ্গে আমাদের জীবনে কোরআনের তেলাওয়াতও ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে পড়ে। অথচ কোরআন কেবল এক মাসের ইবাদত নয়; এটি মুমিনের জীবনের পাথেয় এবং সারাজীবনের পথনির্দেশিকা।
রমজানপরবর্তী সময়ে কোরআনের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত- তা নিয়ে আজকের এই বিশেষ আলোচনা।
কোরআন নাজিলের উদ্দেশ্য: তেলাওয়াত নাকি অনুধাবন?
কোরআন তেলাওয়াত নিঃসন্দেহে অশেষ সওয়াবের কাজ। তবে এটি অবতীর্ণের মূল লক্ষ্য কেবল ছন্দময় পাঠ নয়, বরং এর মর্মার্থ অনুধাবন করে বাস্তব জীবনে তার প্রতিফলন ঘটানো। আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে ইরশাদ করেছেন- ‘এটি এক বরকতময় কিতাব, যা আমি আপনার প্রতি নাজিল করেছি, যাতে তারা এর আয়াতসমূহ নিয়ে গভীর চিন্তা-ভাবনা (তাদাব্বুর) করে এবং বুদ্ধিমানরা উপদেশ গ্রহণ করে।’ (সুরা সোয়াদ: ২৯)
এই আয়াতটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, ‘তাদাব্বুর’ বা অর্থের গভীরে না নামলে কোরআনের প্রকৃত হক আদায় সম্ভব নয়।
আরও পড়ুন: কোরআন না বুঝলে প্রকৃত জ্ঞান লাভ হয় না
সাহাবায়ে কেরামের কোরআন শিক্ষার পদ্ধতি
সাহাবায়ে কেরাম (রা.) কোরআন খতমের সংখ্যার চেয়ে এর অনুধাবন ও আমলের ওপর বেশি গুরুত্ব দিতেন। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বলেন- ‘আমাদেরকে আগে ঈমান শেখানো হতো, তারপর কোরআন। যখন কোনো সুরা নাজিল হতো, আমরা তার হালাল-হারাম ও নির্দেশনাগুলো শিখতাম।’ (সুনানে বায়হাকি)
বর্ণিত আছে, হজরত ওমর (রা.) কেবল সুরা বাকারা শিখতে ও তা জীবনে প্রয়োগ করতে দীর্ঘ ৮ বছর সময় নিয়েছিলেন। কারণ তাঁদের লক্ষ্য ছিল- একটি আয়াতও না বুঝে আমল ছাড়া পরবর্তী আয়াতে অগ্রসর না হওয়া।
বিজ্ঞাপন
পরিমাণ নয়, গুণগত মানই ইবাদতের সৌন্দর্য
রমজানে আমরা হয়তো দ্রুত পড়ার মাধ্যমে একাধিক খতম দেওয়ার চেষ্টা করেছি, যা ওই সময়ের জন্য ফজিলতপূর্ণ ছিল। তবে বছরের বাকি সময়ে আমাদের কোরআন পাঠ হওয়া উচিত ধীরস্থির, অর্থবোধক ও মননশীল।
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-এর একটি উক্তি এ ক্ষেত্রে প্রণিধানযোগ্য- ‘পুরো কোরআন দ্রুত পড়ে শেষ করার চেয়ে সুরা বাকারা ও সূরা আলে ইমরান ধীরে ধীরে বুঝে পড়া আমার কাছে বেশি প্রিয়।’
এমনকি রাসুলুল্লাহ (স.) এক রাতে কেবল একটি আয়াত বারবার তেলাওয়াত করে রাত পার করে দিয়েছিলেন কেবল সেই আয়াতের গভীর তাৎপর্য হৃদয়ঙ্গমের জন্য। (সুনানে নাসায়ি)
আরও পড়ুন: রমজানের যে শিক্ষাগুলো সারাবছরের আলোকবর্তিকা
কোরআনের সাথে স্থায়ী সম্পর্ক গড়ার ৫ উপায়
রমজানের এই প্রাপ্তিকে বছরের বাকি ১১ মাস ধরে রাখতে নিচের পদক্ষেপগুলো সহায়ক হতে পারে-
- দৈনিক রুটিনে রাখা: প্রতিদিন অন্তত ১০–১৫ মিনিট কোরআনের জন্য নির্দিষ্ট রাখা। রাসুল (স.) বলেছেন, আল্লাহর কাছে প্রিয় আমল তা-ই, যা নিয়মিত করা হয়, যদিও তা পরিমাণে অল্প হয়।
- তর্জমা ও তাফসির পাঠ: আপনি যে ভাষাটি ভালো বোঝেন, সেই ভাষায় কোরআনের অর্থ পড়ুন। এটি আপনার হৃদয়ে সরাসরি আল্লাহর সাথে কথোপকথনের অনুভূতি তৈরি করবে।
- সালাতে তেলাওয়াতকৃত সুরার অর্থ জানা: নামাজের ছোট ছোট সুরাগুলোর অর্থ জানলে সালাতে একাগ্রতা বা ‘খুশু-খুজু’ কয়েকগুণ বেড়ে যায়।
- তাদাব্বুর বা চিন্তাগবেষণা: একটি আয়াত পড়ার পর নিজেকে প্রশ্ন করুন- ‘এখানে আল্লাহ আমাকে কী আদেশ করেছেন? কোন মন্দ কাজ থেকে বিরত থাকতে বলেছেন?’
- কোরআনের মজলিসে বসা: মসজিদে বা দ্বীনি মাহফিলে কোরআনের আলোচনা শোনার অভ্যাস করা, যা ঈমানকে সতেজ রাখে।
কোরআন থেকে দূরে সরে যাওয়ার ভয়াবহতা
রমজান শেষে কোরআনকে যদি আমরা কেবল গিলাফে মুড়ে তুলে রাখি, তাহলে কেয়ামতের দিন রাসুলুল্লাহ (স.) আল্লাহর কাছে যে অভিযোগটি করবেন, তা হবে অত্যন্ত করুণ: ‘আর রাসুল বলবেন, হে আমার প্রতিপালক! আমার জাতি তো এই কোরআনকে ‘পরিত্যাজ্য’ (হিজরত করা) মনে করেছিল।’ (সুরা ফুরকান: ৩০)
আরও পড়ুন: কোরআন ভুলে যাওয়ার পরিণাম
ইমাম ইবনুল কাইয়্যুম (রহ.) বলেন, কোরআন না পড়া যেমন একে পরিত্যাগ করা, তেমনি এর অর্থ না বোঝা এবং এর বিধান অনুযায়ী আমল না করাও একে পরিত্যাগ করার শামিল।
রমজান আমাদের কোরআনের সাথে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। আর রমজান পরবর্তী সময়টি হলো সেই পরিচয়কে গভীর মিতালিতে রূপান্তর করার সুযোগ। কোরআন কেবল খতমের কিতাব নয়; এটি আমাদের চিন্তা, চরিত্র ও জীবন বদলানোর দর্পণ।
অতএব, রমজানে কতবার খতম করলাম সেই গর্বের চেয়ে বড় প্রশ্ন হওয়া উচিত- কোরআন আমার জীবনকে কতটা বদলে দিল? যার জীবনে কোরআনের সাথে সত্যিকারের মিতালি গড়ে উঠবে, দুনিয়া ও আখেরাতের কোনো অন্ধকারেই সে কখনো পথ হারাবে না। আল্লাহ আমাদের সকলকে কোরআনের সাথে মিতালি গড়ার এবং এর বিধান অনুযায়ী জীবন গড়ার তাওফিক দিন। আমিন।

