ঈদুল ফিতরের আগে ‘সদকাতুল ফিতর’ আদায় সামর্থ্যবান মুসলমানদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ওয়াজিব ইবাদত। এর মূল উদ্দেশ্য- রোজার ত্রুটি-বিচ্যুতি থেকে পবিত্রতা অর্জন এবং অভাবী মানুষের খাবারের ব্যবস্থা করা। হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (স.) ফিতরা নির্ধারণের কারণ হিসেবে রোজাদারকে পবিত্র করা এবং দরিদ্রদের আহারের কথা উল্লেখ করেছেন। (সুনানে আবু দাউদ: ১৬০৯)
তবে ফিতরা নিয়ে প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা এই ইবাদতের সওয়াব ও উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করতে পারে। এর সঠিক ব্যাখ্যা নিচে তুলে ধরা হলো-
বিজ্ঞাপন
ফিতরা: ইবাদত ও সামাজিক দায়বদ্ধতার সমন্বয়
ফিতরা কেবল একটি ধর্মীয় রীতি নয়; এটি যেমন রোজাদারকে পবিত্র করে, তেমনি সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের মুখে হাসি ফোটায়। সঠিক নিয়মে ফিতরা আদায় করা ঈমানি দায়িত্ব ও মানবিক কর্তব্যের এক অনন্য মেলবন্ধন।
১. ফিতরা শুধু ধনীদের জন্য—এটি একটি প্রচলিত ভুল ধারণা
অনেকে মনে করেন, জাকাতের মতো ফিতরাও কেবল নিসাব পরিমাণ মালের মালিকদের ওপর ওয়াজিব। কিন্তু ফিতরার শর্ত জাকাতের চেয়ে সহজ। শরিয়তের নিয়ম হলো, ঈদের দিন ও রাতে যার কাছে নিজের ও পরিবারের প্রয়োজনীয় খাবারের অতিরিক্ত সম্পদ থাকবে, তাকেই ফিতরা দিতে হবে। (ফতোয়ায়ে শামি)
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন: কার কার ফিতরা আপনাকে আদায় করতে হবে
২. শিশুদের ফিতরা লাগে না—এটিও একটি ভুল ধারণা
ফিতরা কোনো ব্যক্তিগত উপার্জনের ওপর নির্ভর করে না; বরং এটি মাথাপিছু আদায় করতে হয়। সহিহ বুখারি (১৫১২)-এর হাদিসে রাসুলুল্লাহ (স.) ছোট-বড় সবার ওপর ফিতরা ওয়াজিব করেছেন। এমনকি ঈদের দিন ভোরের আগে জন্ম নেওয়া নবজাতকের পক্ষ থেকেও ফিতরা দেওয়া অভিভাবকের দায়িত্ব।
৩. রোজা না রাখলে ফিতরা দিতে হয় না—এটি সঠিক নয়
অসুস্থতা বা অন্যকোনো কারণে যারা রোজা রাখতে পারেননি, তাদের ফিতরা দিতে হবে না—এমন ধারণা অমূলক। সামর্থ্য থাকলে রোজা না রাখলেও প্রত্যেক মুসলিমের ওপর ফিতরা আদায় করা ওয়াজিব। (সহিহ বুখারি: ১৫০৩)
৪. নামাজের পর দিলেও আদায় হয়ে যায়—এটি সঠিক নিয়ম নয়
আমাদের দেশে অনেকেই দেরিতে, বিশেষ করে ঈদের নামাজের পর ফিতরা আদায় করেন। এতে ইবাদতের মূল সওয়াব ও উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়। নবী কারিম (স.) বলেছেন, নামাজের আগে আদায় করলে তা ফিতরা হিসেবে গণ্য হবে, আর নামাজের পর আদায় করলে তা সাধারণ সদকা হিসেবে গণ্য হবে। (আবু দাউদ: ১৬০৯)
আরও পড়ুন: কোন কোন আত্মীয়কে ফিতরা দেওয়া যাবে?
৫. শুধু খাদ্য দিতে হবে, টাকা নয়—এটি একটি অপূর্ণাঙ্গ ধারণা
হাদিসে নির্দিষ্ট কিছু খাদ্যের কথা এলেও বর্তমান প্রেক্ষাপটে অধিকাংশ আলেমের মতে, খাদ্যের সমপরিমাণ নগদ টাকা দিয়ে ফিতরা আদায় করা জায়েজ। ফতোয়ায়ে শামি অনুযায়ী, অভাবীদের তাৎক্ষণিক উপকারের কথা চিন্তা করে নগদ টাকা দেওয়া ক্ষেত্রবিশেষে উত্তম।
৬. ফিতরা মসজিদে দিতে হবে—এটি সঠিক তথ্য নয়
ফিতরা কোনো মসজিদ উন্নয়ন তহবিল নয়। পবিত্র কোরআনে জাকাত ও সদকার যে খাতগুলোর কথা বলা হয়েছে (সুরা তাওবা: ৬০), ফিতরার ক্ষেত্রেও দরিদ্র ও মিসকিনদের দিতে হবে। বিশেষ করে অভাবী আত্মীয়-স্বজন বা প্রতিবেশীদের ফিতরা দেওয়া সবচেয়ে বেশি সওয়াবের কাজ।
আরও পড়ুন: ফিতরা আদায়ের সঠিক সময় ও প্রয়োজনীয় বিধান
৭. পরিবারের সবার আলাদা ফিতরা দেওয়া জরুরি—এটি একটি ভুল ধারণা
পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের পক্ষ থেকে আলাদাভাবে ফিতরা বের করা জরুরি নয়; বরং পরিবারের কর্তা বা অভিভাবক তার ওপর নির্ভরশীল সবার (স্ত্রী, সন্তান ও অন্যান্য) পক্ষ থেকে একত্রে ফিতরা আদায় করতে পারেন। হানাফি মাজহাব অনুযায়ী, বালেগ সন্তান ও স্ত্রীর ফিতরা তাদের নিজেদের দায়িত্ব হলেও পারিবারিক প্রধান যদি তাদের অনুমতি নিয়ে সবার পক্ষ থেকে ফিতরা আদায় করেন, তবে তা সুন্নাহ অনুযায়ী সঠিক হবে এবং সবার পক্ষ থেকে আদায় হয়ে যাবে।
৮. ফিতরা না দিলেও রোজা পূর্ণ হয়—এটি একটি ভুল ধারণা
ফিতরা রোজার ঘাটতি পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বর্ণিত আছে যে, সদকাতুল ফিতর আদায় না করা পর্যন্ত রোজা আকাশ ও জমিনের মাঝখানে ঝুলন্ত থাকে। (দায়লামি)। এই বর্ণনার সনদ নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ থাকলেও রোজার আধ্যাত্মিক পূর্ণতা অর্জনে ফিতরা আদায় করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
মোটকথা, শরিয়তের সদ্ব্যবহার ছাড়া ইবাদত পূর্ণতা পায় না, তাই ফিতরা আদায়ে সঠিক মাসয়ালা সম্পর্কে সচেতনতা জরুরি। ভুল ধারণা পরিহার করে যথাসময়ে ফিতরা আদায় করলে যেমন আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা যায়, তেমনি সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষও ঈদের আনন্দে শামিল হওয়ার সুযোগ পায়।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিকভাবে ফিতরা আদায় করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

