রমজান মাস রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের অনন্য এক সুযোগ। এই মাসের শেষ দশকের সর্বশ্রেষ্ঠ রজনী হলো শবে কদর বা লাইলাতুল কদর। মহান আল্লাহ এই রাতকে ‘হাজার মাসের চেয়ে উত্তম’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন (সুরা আল-কদর: ৩) রাসুল (সা.)-এর হাদিস অনুযায়ী, ‘যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে এবং সওয়াবের আশায় এই রাতে ইবাদতে দাঁড়ায়, তার পূর্বের সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়।’ (সহিহ বুখারি: ১৯০১)
তবে এই অবারিত ক্ষমার রাতেও কিছু গুরুতর অপরাধের কারণে কিছু মানুষ আল্লাহর বিশেষ রহমত থেকে বঞ্চিত হতে পারে। সত্যিকারের তওবা এবং আমল সংশোধন ছাড়া শবে কদরের বরকত তাদের কপালে জোটে না। শরয়ি দলিলের আলোকে সেই বিশেষ শ্রেণিগুলো নিচে তুলে ধরা হলো।
বিজ্ঞাপন
১. শিরকে লিপ্ত ব্যক্তি
ইসলামে সবচেয়ে বড় গুনাহ হলো শিরক বা আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করা। পবিত্র কোরআনে এর ভয়াবহতা সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সাথে শরিক করাকে ক্ষমা করেন না; তবে এর বাইরে যা আছে তিনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন।’ (সুরা নিসা: ৪৮) শিরকের গুনাহ থেকে তওবা না করলে শবে কদরের ইবাদত কোনো উপকারে আসবে না।
আরও পড়ুন: শিরকের বিষাক্ত ছোবল: কীভাবে ঈমান হারায় মুমিন
২. মানুষের হক নষ্টকারী (হক্কুল ইবাদ)
মানুষের অধিকার নষ্ট করা ইসলামে অত্যন্ত ভয়াবহ অপরাধ। কারও সম্পদ আত্মসাৎ, প্রতারণা বা অন্যায়ভাবে অধিকার হরণ করলে কেবল আল্লাহর কাছে তওবা করলেই তা মাফ হয় না; বরং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছ থেকে ক্ষমা নিতে হয়। রাসুল (স.) এমন ব্যক্তিকে ‘প্রকৃত নিঃস্ব’ হিসেবে অভিহিত করেছেন, যার নেক আমলগুলো কেয়ামতের দিন পাওনাদারদের মধ্যে বণ্টন করে দেওয়া হবে। (সহিহ মুসলিম: ২৫৮১)
৩. পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তান
পিতা-মাতার সম্মান ও আনুগত্য ইসলামের অন্যতম মৌলিক শিক্ষা। তাঁদের অবজ্ঞা করা বা কষ্ট দেওয়াকে বড় গুনাহ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। রাসুল (স.) ইরশাদ করেছেন- ‘তিন শ্রেণির মানুষের দিকে আল্লাহ কেয়ামতের দিন তাকাবেন না: পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তান, মদপানে আসক্ত ব্যক্তি এবং যে ব্যক্তি উপকার করে তা স্মরণ করিয়ে অপমান করে।’ (সুনান নাসাঈ: ২৫৬২)
আরও পড়ুন: শিরক ও হারাম উপার্জন: ঈমান ও আমল নষ্টকারী দুই মহাবিপদ
৪. মদপান ও নেশায় আসক্ত ব্যক্তি
নেশা জাতীয় দ্রব্য বিবেক ও চরিত্র ধ্বংস করে। যারা নিয়মিত মদ বা মাদক সেবন করে এবং এই অভ্যাস ত্যাগ করে তওবা করে না, হাদিসে এমন ব্যক্তিদের জন্য কঠোর সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। (সহিহ বুখারি: ৫৫৭৫) নেশাগ্রস্ত ব্যক্তি তওবা ছাড়া শবে কদরের বিশেষ রহমত থেকে দূরে থাকে।
৫. বিদ্বেষ ও হিংসা পোষণকারী
অন্তর যদি অন্যের প্রতি ঘৃণা ও শত্রুতায় পূর্ণ থাকে, তবে তা ইবাদতের গ্রহণযোগ্যতা নষ্ট করে। রাসুল (স.) বলেছেন, প্রতি সোমবার ও বৃহস্পতিবার আমলনামা আল্লাহর কাছে পেশ করা হয় এবং প্রত্যেক মুমিনকে ক্ষমা করা হয়; কিন্তু পারস্পরিক বিদ্বেষ পোষণকারী দুই ব্যক্তিকে ক্ষমা করা হয় না। আল্লাহ বলেন, ‘তাদেরকে অপেক্ষা করতে দাও যতক্ষণ না তারা মিলমিশ করে।’ (সহিহ মুসলিম: ২৫৬৫)
আরও পড়ুন: শিরকমুক্ত জীবন ক্ষমার উপযুক্ত
৬. আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী
নিকটাত্মীয়দের সঙ্গে অহেতুক সম্পর্ক ছিন্ন করা আল্লাহর অসন্তুষ্টির বড় কারণ। রাসুল (স.) কঠোরভাবে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ‘আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ (সহিহ বুখারি: ৫৯৮৪) শবে কদরের ক্ষমা পেতে হলে আত্মীয়দের সঙ্গে সুসম্পর্ক পুনঃস্থাপন জরুরি।
শবে কদরের শ্রেষ্ঠ দোয়া
শবে কদরের এই মহিমান্বিত রাতে নিজেকে ক্ষমাশীলদের অন্তর্ভুক্ত করতে হলে প্রয়োজন আন্তরিক তওবা। এই রাতে রাসুল (স.) আমাদের একটি বিশেষ দোয়া বেশি বেশি পড়ার শিক্ষা দিয়েছেন-
দোয়া: اللَّهُمَّ إِنَّكَ عَفُوٌّ تُحِبُّ العَفْوَ فَاعْفُ عَنِّي
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নাকা ‘আফুউউন তুহিব্বুল ‘আফওয়া ফা‘ফু ‘আন্নি।
অর্থ: হে আল্লাহ! নিশ্চয়ই তুমি পরম ক্ষমাশীল, তুমি ক্ষমা করতে ভালোবাসো; অতএব তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও। (সুনান তিরমিজি: ৩৫১৩)
আরও পড়ুন: শবে কদরে যেভাবে ইবাদত করবেন
শবে কদর কেবল ইবাদতের রাত নয়, বরং এটি আত্মশুদ্ধি ও আমল সংশোধনের রাত। শিরক বর্জন করা, মানুষের হক আদায় করা, পিতা-মাতার সন্তুষ্টি অর্জন এবং হিংসা-বিদ্বেষ দূর করার মাধ্যমেই এই রাতের পূর্ণ বরকত হাসিল করা সম্ভব। যে ব্যক্তি সত্যিকারের তওবা করে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে, আল্লাহ তাকে নিরাশ করেন না। তবে গুনাহে অটল থাকা ব্যক্তিরা এই মহাসুযোগ থেকেও বঞ্চিত হতে পারে।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে হৃদয়ের কলুষতা মুক্ত হয়ে শবে কদরের বরকত ও মাগফিরাত নসিব করুন। আমিন।

