পবিত্র রমজানের শেষ দশকের বিজোড় রাতগুলো মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভের শ্রেষ্ঠ সময়। এই রাতগুলোতে মুমিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হলো তাহাজ্জুদ। এই নামাজের প্রকৃত সৌন্দর্য ফুটে ওঠে নবীজি (স.)-এর সুন্নাহ অনুযায়ী ধীরস্থিরতা, দীর্ঘ তেলাওয়াত ও গভীর একাগ্রতার মধ্য দিয়েই।
ইবাদতে নবীজির বিশেষ প্রস্তুতি
রমজানের শেষ দশকে রাসুলুল্লাহ (স.)-এর ইবাদতের চিত্র ছিল অন্য সময়ের চেয়ে ভিন্ন। হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, ‘যখন রমজানের শেষ দশক আসত, তখন নবীজি (স.) কোমর বেঁধে নামতেন (ইবাদতের জন্য বিশেষ প্রস্তুতি নিতেন), রাত জেগে ইবাদত করতেন এবং তাঁর পরিবারকেও জাগিয়ে দিতেন।’ (সহিহ বুখারি: ২০২৪) সুতরাং লাইলাতুল কদরের অন্বেষণে পরিবারকে নিয়ে ইবাদতে মশগুল হওয়া সুন্নাহর অন্তর্ভুক্ত।
নামাজের সৌন্দর্য ও গুণগত মান
তাহাজ্জুদ নামাজ যেন কোনোভাবেই তাড়াহুড়ো করে আদায় করা না হয়। হজরত আয়েশা (রা.)-কে যখন নবীজি (স.)-এর তাহাজ্জুদ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তিনি বলেছিলেন- ‘রাসুলুল্লাহ (স.) চার রাকাত পড়তেন, আপনি তার সৌন্দর্য ও দীর্ঘতা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবেন না (অর্থাৎ তা ছিল অবর্ণনীয় সুন্দর ও দীর্ঘ)।’ (সহিহ বুখারি: ১১৪৭) অনেক সময় মানুষ রাকাতের সংখ্যা নিয়েই বেশি গুরুত্ব দেয়, অথচ হাদিসের মূল শিক্ষা হলো নামাজের মান ও সৌন্দর্য বৃদ্ধি করা।
আরও পড়ুন: তাহাজ্জুদ নামাজের মর্যাদা
বিজ্ঞাপন
ধীরস্থির তেলাওয়াত ও তারতিল
তাহাজ্জুদে কোরআন তেলাওয়াত হতে হবে অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে। আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন- ‘কোরআন তেলাওয়াত করুন সুবিন্যস্তভাবে ও স্পষ্টভাবে (তারতিলসহ)।’ (সুরা মুজ্জাম্মিল: ০৪) নবীজি (স.) যখন নামাজে কোরআন পড়তেন, তখন প্রতিটি আয়াত আলাদা আলাদা করে স্পষ্টভাবে পড়তেন। যদি রহমতের কোনো আয়াত আসত, তবে তিনি আল্লাহর কাছে রহমত চাইতেন। আর যদি আজাবের আয়াত আসত, তবে তিনি আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করতেন।
পা ফুলে যাওয়া ইবাদত ও কৃতজ্ঞতা
আমাদের নবীজি (স.) নিষ্পাপ হওয়া সত্ত্বেও রাতভর দাঁড়িয়ে এমন দীর্ঘ সময় নামাজ পড়তেন যে, তাঁর পা মোবারক ফুলে যেত। হজরত মুগিরা ইবনে শুবা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (স.) এত দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে নামাজ পড়তেন যে তাঁর পা ফুলে যেত। তাঁকে যখন বলা হলো, আল্লাহ কি আপনার আগের ও পরের সব গুনাহ ক্ষমা করে দেননি? তিনি উত্তর দিলেন- ‘আমি কি একজন কৃতজ্ঞ বান্দা হবো না?’ (সহিহ বুখারি: ৪৮৩৬)। এই দীর্ঘ কিয়াম বা দাঁড়িয়ে থাকা মূলত আল্লাহর প্রতি বান্দার সর্বোচ্চ ভালোবাসারই বহিঃপ্রকাশ।
আরও পড়ুন: তাহাজ্জুদ কষ্টকর হলে ন্যূনতম যে আমলটি করবেন
দীর্ঘ রুকু ও সেজদা
তাহাজ্জুদ নামাজের প্রকৃত স্বাদ পাওয়া যায় দীর্ঘ রুকু ও সেজদায়। হাদিসে এসেছে, ‘বান্দা যখন সেজদাবনত হয়, তখন সে তার রবের সবচেয়ে নিকটবর্তী হয়।’ (সহিহ মুসলিম: ৪৮২) বিজোড় রাতগুলোতে আমাদের সেজদা হওয়া উচিত অন্য দিনের চেয়ে দীর্ঘ। সেজদায় গিয়ে তাসবিহ শেষে আল্লাহর কাছে আকুলভাবে দোয়া করা এবং নিজের অভাব ও গুনাহের কথা বলে ক্ষমা চাওয়া উচিত।
হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ এই মহিমান্বিত রাতগুলোকে অবহেলায় বা কেবল ঘুমের মধ্যে নষ্ট করা মুমিনের কাজ নয়। তাই আসুন, এই রমজানের বিজোড় রাতগুলোকে আমরা গাফেলতিতে নষ্ট না করে ধীরস্থির তাহাজ্জুদ, দীর্ঘ রুকু-সেজদা, বেশি বেশি তাওবা-ইস্তেগফার ও দান-সদকার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভের সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করি।

