বুধবার, ১১ মার্চ, ২০২৬, ঢাকা

রোজা ভাঙলে কখন কাজা, কখন কাফফারা দিতে হবে?

ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: ১১ মার্চ ২০২৬, ০২:০০ পিএম

শেয়ার করুন:

রোজা ভাঙলে কখন কাজা, কখন কাফফারা দিতে হবে?

রমজানের রোজা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ ফরজ ইবাদত। প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ ও সামর্থ্যবান মুসলমানের ওপর রোজা পালন করা আবশ্যক। আল্লাহ তাআলা বলেন- ‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।’ (সুরা বাকারা: ১৮৩)

তবে কখনো কোনো ওজর বা বিশেষ পরিস্থিতির কারণে রোজা রাখা সম্ভব হয় না বা রোজা ভেঙে যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে শরিয়তে কাজা ও কাফফারা- এই দুই ধরনের বিধান রয়েছে।


বিজ্ঞাপন


কাজা ও কাফফারা কী

রমজানের একটি রোজা ভেঙে গেলে বা রাখা না হলে পরে তার পরিবর্তে একটি রোজা রাখাকে কাজা বলা হয়। আর কাফফারা হলো ইচ্ছাকৃতভাবে রোজা ভঙ্গ করার শাস্তিমূলক বিধান। এর নিয়ম হলো- একটি রোজার কাজা আদায়ের পাশাপাশি টানা ৬০টি রোজা রাখা। অর্থাৎ মোট ৬১টি রোজা।

যদি কেউ শারীরিকভাবে এত রোজা রাখতে অক্ষম হন, তবে ৬০ জন মিসকিনকে দুই বেলা তৃপ্তিসহ খাবার খাওয়াতে হবে অথবা একজন গরিবকে ৬০ দিন খাবার দিতে হবে। (ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া: ১/৫১৩)

শরিয়তসম্মত ওজরে রোজা না রাখার অনুমতি

ইসলামে মানুষের কষ্ট দূর করার জন্য কিছু ক্ষেত্রে রোজা না রাখার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন- ‘আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজটাই চান, কঠিন করতে চান না।’ (সুরা বাকারা: ১৮৫)

আরও পড়ুন: জীবনে ছেড়ে দেওয়া নামাজ ও রোজা কীভাবে আদায় করবেন

যেসব কারণে শুধু কাজা করতে হবে

কিছু ক্ষেত্রে রোজা ভেঙে গেলে বা রাখা না গেলে শুধু কাজা করলেই যথেষ্ট, কাফফারা দিতে হয় না।

১. অসুস্থতা ও সফর: রোগাক্রান্ত ব্যক্তি বা মুসাফির রোজা না রাখলে পরে কাজা করতে পারবেন।

২. গর্ভবতী ও দুগ্ধদানকারী মা: নিজের বা সন্তানের ক্ষতির আশঙ্কা থাকলে রোজা না রেখে পরে কাজা করা যাবে।

৩. নারীদের বিশেষ অবস্থা: মাসিক (হায়েজ) ও প্রসব-পরবর্তী রক্তস্রাব (নিফাস) চলাকালে রোজা রাখা নিষেধ। পরে তা কাজা করতে হবে।

৪. জোরপূর্বক রোজা ভঙ্গ: কেউ জোর-জবরদস্তি করে রোজা ভঙ্গ করতে বাধ্য করলে পরে কাজা করতে হবে।

৫. জীবননাশের আশঙ্কা বা বিষধর প্রাণীর আক্রমণ: প্রাণরক্ষার জন্য রোজা ভাঙতে হলে পরে কাজা করতে হবে।

৬. সাময়িক মানসিক অসুস্থতা: কেউ নির্দিষ্ট সময়ের জন্য মানসিক ভারসাম্য হারালে বা অজ্ঞান হয়ে গেলে সুস্থ হওয়ার পর কাজা আদায় করতে হবে।

৭. ভুলবশত কিছু গিলে ফেলা: অজু বা গোসলের সময় অনিচ্ছাকৃতভাবে পানি গলায় চলে গেলে রোজা ভেঙে যায় এবং কাজা করতে হয়।

৮. অন্যান্য কারণ: দাঁত থেকে বের হওয়া রক্ত বেশি হয়ে গিলে ফেললে, নাকে বা কানে দেওয়া তরল ওষুধ খাদ্যনালীর ভেতরে চলে গেলে, হস্তমৈথুন করলে এবং ইচ্ছাকৃত বমি করলে। এসব ক্ষেত্রে রোজা ভেঙে যায় এবং পরে কাজা করতে হবে। (ফতোয়ায়ে শামি, খণ্ড ৩)

আরও পড়ুন: মৃতব্যক্তির কাজা নামাজ-রোজার ফিদিয়া আদায়ের বিধান 

যেসব কারণে কাজা ও কাফফারা দুটোই দিতে হবে

শরিয়তসম্মত কারণ ছাড়া ইচ্ছাকৃতভাবে রোজা ভেঙে ফেললে কাজা ও কাফফারা উভয়ই আদায় করতে হবে।

১. ইচ্ছাকৃত পানাহার: কোনো বৈধ কারণ ছাড়া রোজা রেখে ইচ্ছাকৃতভাবে খাওয়া বা পান করলে কাজা ও কাফফারা দিতে হবে। (মাবসুত সারাখসি: ৩/৭২)

২. স্ত্রী সহবাস: রমজানের দিনে রোজা অবস্থায় সহবাস করলে স্বামী-স্ত্রী উভয়ের ওপর কাজা ও কাফফারা ওয়াজিব হবে। (সহিহ বুখারি: ৬৭০৯)

তবে পানাহার বা সহবাস ছাড়া অন্যকোনো উপায়ে ইচ্ছাকৃতভাবে রোজা ভাঙলে কাফফারা নয়, শুধু কাজা করতে হবে। (মাবসুত সারাখসি: ৩/৭২)

কাজা রোজা আদায়ের নিয়ম

কাজা রোজা সাধারণ রোজার মতোই রাখতে হবে। একাধিক রোজা কাজা হয়ে থাকলে তা ধারাবাহিকভাবে রাখা বাধ্যতামূলক নয়, তবে ধারাবাহিকভাবে রাখা উত্তম।

নাবালেগ শিশু রোজা রেখে ভেঙে ফেললে তার ওপর কাজা বা কাফফারা কোনোটিই ওয়াজিব হবে না। (আল হিদায়া)

কাফফারা আদায়ের নিয়ম

টানা ৬০ রোজা: কাফফারার রোজা বিরতিহীনভাবে ৬০ দিন রাখতে হবে। মাঝখানে একদিনও বাদ পড়লে পুনরায় শুরু করতে হবে। (মাবসুতে সারাখসি: ৩/৮২)

নারীদের ক্ষেত্রে কাফফারা আদায়ের সময় হায়েজ শুরু হলে পবিত্র হওয়ার পর আবার রোজা রাখা শুরু করতে হবে।

মিসকিনকে খাবার খাওয়ানো

৬০ জন মিসকিনকে দুই বেলা খাবার খাওয়ালে কাফফারা আদায় হবে। প্রত্যেককে এক ফিতরা পরিমাণ গম বা তার সমমূল্যের অর্থও দেওয়া যেতে পারে। (বাদায়েউস সানায়ে: ২/১০১, রদ্দুল মুখতার: ২/৪১৩)

তবে ৬০ দিনের ফিতরা একদিনে দেওয়া যাবে না; প্রতিদিন দিতে হবে অথবা ৬০ জনকে দিতে হবে। (ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া: ১/৫১৩)

একই রমজানে একাধিক রোজা ইচ্ছাকৃতভাবে ভাঙলেও একটি কাফফারা যথেষ্ট।

গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়

১. কাফফারা বা ফিদিয়া তাদেরকেই দেওয়া যাবে, যাদেরকে জাকাত দেওয়া যায়। ‘সদকা তো ফকির, মিসকিন, ঋণগ্রস্ত প্রভৃতির জন্য।’ (সুরা তওবা: ৬০)

২. কাফফারা আদায় করলেও ভেঙে ফেলা ফরজ রোজার ঘাটতি পূর্ণ হয় না। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন- ‘যে ব্যক্তি শরিয়তসম্মত কারণ বা অসুস্থতা ছাড়া রমজানের একটি রোজা ভাঙে, তার ওই রোজার বিপরীতে সারা জীবনের রোজাও রমজানের একটি রোজার সমমর্যাদা পাবে না।’ (সুনানে তিরমিজি: ৭২৩)

রমজানের রোজা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। তাই ইচ্ছাকৃতভাবে রোজা ভঙ্গ করা থেকে বিরত থাকা এবং কোনো কারণে রোজা ছুটে গেলে শরিয়তের বিধান অনুযায়ী কাজা বা কাফফারা আদায় করা প্রত্যেক মুসলমানের কর্তব্য।

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর