দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ও রমজানের রোজা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ ফরজ ইবাদত। ইচ্ছাকৃতভাবে নামাজ না পড়া কিংবা রোজা ভেঙে ফেলা গুরুতর গুনাহ। অনেক সময় দেখা যায়- কেউ দ্বীনের সঠিক জ্ঞান না থাকার কারণে, আবার কেউবা অবহেলায় জীবনের অনেক নামাজ ও রোজা আদায় করেননি। পরে অনুতপ্ত হয়ে জানতে চান- এসব ইবাদতের কাজা ও কাফফারা কীভাবে আদায় করতে হবে।
ছেড়ে দেওয়া রোজার কাজা ও কাফফারা
ফুকাহায়ে কেরামের মতে, কেউ যদি বিনা ওজরে রমজানের রোজা ভেঙে ফেলে বা না রাখে, তাহলে প্রতিটি রোজার জন্য একটি করে কাজা আদায় করতে হবে।
তবে কাফফারার বিষয়ে একটি গ্রহণযোগ্য মত হলো- বিনা ওজরে যত রোজা ভাঙা হয়েছে, সেগুলোর জন্য একটি কাফফারার ৬০টি রোজা রাখাই যথেষ্ট। প্রতিটি রোজার জন্য আলাদা আলাদা কাফফারা আদায় করতে হবে না।
মনে রাখতে হবে, ইচ্ছাকৃতভাবে রোজা ভঙ্গ করা অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ। কারণ রমজানের একটি রোজার প্রকৃত ক্ষতিপূরণ কোনোভাবেই পূর্ণ করা সম্ভব নয়।
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন- ‘যে ব্যক্তি সফর বা অসুস্থতা ছাড়া ইচ্ছাকৃতভাবে রমজানের একটি রোজা ভঙ্গ করবে, সে যদি সারাজীবন রোজা রাখে তবুও এর প্রকৃত বদলা আদায় হবে না।’ (মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা: ৯৮৯৩)
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন: যেসব কারণে রোজা ভেঙে দিলে কাফফারা জরুরি নয়
তাই ভবিষ্যতে এমন ভুল না করার জন্য সতর্ক থাকতে হবে এবং অতীতের ভুলের জন্য কাজা ও কাফফারার পাশাপাশি আন্তরিকভাবে তওবা-ইস্তেগফার করতে হবে। (কিতাবুল আসল: ২/১৫৩; খুলাসাতুল ফতোয়া: ১/২৬০; আলবাহরুর রায়েক: ২/২৭৭; আদ্দুররুল মুখতার: ২/৪১৩)
ছেড়ে দেওয়া নামাজের বিধান
জীবনে ছুটে যাওয়া ফরজ নামাজ অবশ্যই কাজা আদায় করতে হবে। শুধু তওবা করলেই দায়মুক্ত হওয়া যাবে না। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন- ‘কেউ যদি নামাজের কথা ভুলে যায়, সে যেন স্মরণ হওয়া মাত্রই তা আদায় করে নেয়। কেননা তার কাফফারা একমাত্র সেই নামাজই।’ (সহিহ মুসলিম: ৬৮৪)
মুসলিম উম্মাহর সব মুজতাহিদ ইমাম এ ব্যাপারে একমত যে ফরজ নামাজ নির্ধারিত সময়ে আদায় করতে না পারলে পরে তা কাজা করা আবশ্যক। প্রখ্যাত তাফসিরকার ইমাম কুরতুবি (রহ.) বলেন- সব আলেম এ বিষয়ে একমত যে ইচ্ছাকৃতভাবে নামাজ পরিত্যাগ করলেও তা কাজা করা জরুরি। (তাফসিরে কুরতুবি: ১/১৭৮)
আরও পড়ুন: নামাজ ত্যাগের ৫টি বড় শাস্তি
কাজা নামাজের হিসাব যেভাবে করবেন
প্রথমে বালেগ হওয়ার পর থেকে কতগুলো ফরজ নামাজ ও বিতির নামাজ ছুটেছে—প্রবল ধারণার ভিত্তিতে একটি হিসাব বের করতে হবে। এরপর ধীরে ধীরে সেই নামাজগুলো কাজা আদায় করতে হবে।
কাজা নামাজ পড়ার সময় এভাবে নিয়ত করা যেতে পারে- ‘আমার জিম্মায় থাকা প্রথম ফজর নামাজের কাজা পড়ছি।’ এভাবে প্রত্যেক ওয়াক্তের নামাজের জন্য নিয়ত করে কাজা আদায় করতে হবে। পাশাপাশি অতীতের ভুলের জন্য আল্লাহর কাছে আন্তরিকভাবে তওবা-ইস্তেগফার করা জরুরি। (আততাজনিস ওয়াল মাজিদ: ২/৬৯; মুখতারাতুন নাওয়াজেল: ১/৩৪৯; ইমদাদুল ফাত্তাহ, পৃ. ৪৯৪; হাশিয়াতুত তাহতাবি আলাল মারাকি, পৃ. ২৪৩)
কাজা নামাজ আদায়ের পদ্ধতি
একই ওয়াক্তে কয়েক ওয়াক্তের কাজা নামাজ পড়লেও সমস্যা নেই। সুযোগ অনুযায়ী যেকোনো সময় কাজা নামাজ আদায় করা যায়।
তবে মনে রাখতে হবে- সুন্নত নামাজের কাজা নেই; কেবল ফরজ ও বিতির নামাজের কাজা আদায় করা যায়। (বুখারি: ৫৯৬; আল ইসতিজকার: ১/৩০২; আদ্দুররুল মুখতার, খণ্ড ২, পৃ. ৬৮; ফতোয়া দারুল উলুম জাকারিয়া, খণ্ড ৪, পৃ. ৩৩২)
কাজা নামাজ আদায়ের আগে মৃত্যু হলে
যদি কেউ জীবদ্দশায় সব কাজা নামাজ আদায় করতে না পারেন এবং মৃত্যুর আশঙ্কা থাকে, তাহলে তার উচিত কাজা নামাজের ফিদিয়া দেওয়ার জন্য ওসিয়ত করা।
নামাজের ফিদিয়ার নিয়ম হলো- প্রতিদিনের ছয় ওয়াক্ত নামাজ (পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ ও বিতির) হিসেবে প্রতিটি ওয়াক্তের জন্য প্রায় পৌনে দুই সের গম বা আটা, অথবা এর সমমূল্যের অর্থ গরিব-মিসকিনকে দান করতে হবে।
অথবা প্রতিটি নামাজের বদলে একজন গরিবকে দুই বেলা তৃপ্তিসহ খাবার খাওয়ানো যেতে পারে, যা সদকায়ে ফিতরের সমপরিমাণ হয়। (ফতোয়ায়ে শামি: ২/৭২)
ফরজ নামাজ ও রোজা ইসলামের মৌলিক ইবাদত। তাই এগুলো অবহেলা করা কখনোই উচিত নয়। অতীতে যদি কোনো কারণে নামাজ বা রোজা ছুটে যায়, তাহলে দ্রুত কাজা আদায় করা এবং আন্তরিকভাবে তওবা-ইস্তেগফার করা একজন মুমিনের দায়িত্ব।

