ইসলাম একটি শাশ্বত ও পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। মহান আল্লাহ এই দ্বীনকে কেয়ামত পর্যন্ত আগত সকল মানুষের জন্য নিখুঁত ও সম্পূর্ণ করে দিয়েছেন। কিন্তু ইবাদতের নামে যখন দ্বীনের মাঝে এমন কিছু নতুন পদ্ধতি বা প্রথা সংযোজন করা হয়, যা রাসুলুল্লাহ (স.) ও সাহাবায়ে কেরামের যুগে প্রচলিত ছিল না, তাকেই বলা হয় বিদআত। বাহ্যিক দৃষ্টিতে এসব কাজ নেক আমল মনে হলেও বাস্তবে তা ইসলামের মৌলিক কাঠামোর জন্য এক গুরুতর হুমকি। পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে বিদআতের ধ্বংসাত্মক আটটি ক্ষতি নিচে সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো-
১. আমল কবুল না হওয়া ও ইবাদত পণ্ড হওয়ার ঝুঁকি
বিদআতের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হলো- এটি মানুষের বহু কষ্টে করা আমলকেও মূল্যহীন করে দেয়। ইবাদত কবুলের অন্যতম প্রধান শর্ত হলো, তা রাসুলুল্লাহ (স.)-এর সুন্নাহ অনুযায়ী হতে হবে। এ প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ (স.) ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বীনের মধ্যে নতুন কিছু উদ্ভাবন করল, যা তার অন্তর্ভুক্ত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত।’ (সহিহ বুখারি: ২৬৯৭) অর্থাৎ পদ্ধতিগত ভুলের কারণে বড় ইবাদতও আল্লাহর দরবারে গৃহীত হয় না।
২. ইসলামের পূর্ণাঙ্গতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা
পবিত্র কোরআনের সুস্পষ্ট ঘোষণা অনুযায়ী দ্বীন ইসলাম সম্পূর্ণ। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম।’ (সুরা মায়েদা: ৩) এখন কেউ যদি দ্বীনের মধ্যে নতুন কোনো পদ্ধতি সংযোজন করে, তবে তা প্রকারান্তরে এই ধারণাই প্রকাশ করে যে ইসলাম পূর্ণাঙ্গ নয় (নাউজুবিল্লাহ)। ইমাম মালিক (র.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি ইসলামে কোনো নতুন প্রথা উদ্ভাবন করল, সে যেন দাবি করল যে মুহাম্মদ (স.) রিসালতের দায়িত্ব পালনে অপূর্ণতা রেখেছেন।’
আরও পড়ুন: বিদআতি লোককে আশ্রয়দাতার ব্যাপারে যা বলেছেন নবীজি (স.)
বিজ্ঞাপন
৩. পথভ্রষ্টতা ও জাহান্নামের দিকে ধাবিত হওয়া
বিদআত মানুষকে ধীরে ধীরে সিরাতুল মুস্তাকিম থেকে বিচ্যুত করে। রাসুলুল্লাহ (স.) তাঁর খুতবায় নিয়মিত সতর্ক করে বলতেন, ‘নিশ্চয়ই সর্বোত্তম বাণী আল্লাহর কিতাব এবং সর্বোত্তম আদর্শ মুহাম্মদ (স.)-এর আদর্শ। আর নিকৃষ্টতম কাজ হলো দ্বীনের মধ্যে নতুন উদ্ভাবিত বিষয়সমূহ এবং নতুন উদ্ভাবিত বিষয়গুলো হলো বিদআত আর বিদআতের পরিণাম জাহান্নাম।’ (সুনানে নাসায়ি: ১৫৭৮)
৪. সুন্নাহর বিলুপ্তি ও কুসংস্কারের বিস্তার
বিদআত ও সুন্নাহ পরস্পরবিরোধী। যখনই কোনো সমাজে একটি বিদআত প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন সেখান থেকে একটি সুন্নাহ ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়। সাহাবি আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘মানুষ যখনই কোনো বিদআত সৃষ্টি করে, তখনই তার সমপরিমাণ সুন্নাহ বিলুপ্ত হয়ে যায়।’ এর ফলে সমাজে প্রকৃত নববী আদর্শের পরিবর্তে নানা কুসংস্কার ও মনগড়া প্রথা জায়গা করে নেয়।
৫. হাউজে কাউসারের নেয়ামত থেকে বঞ্চিত হওয়া
কেয়ামতের দিন রাসুলুল্লাহ (স.) নিজ হাতে উম্মতকে হাউজে কাউসারের পানি পান করাবেন। তবে বিদআতের সঙ্গে জড়িতদের বিষয়ে এসেছে কঠোর সতর্কবার্তা। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘আমি হাউজে কাউসারে তোমাদের জন্য অপেক্ষা করব… তখন কিছু লোককে আমার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া হবে। আমি বলব, ‘হে আমার রব! এরা তো আমার উম্মত।’ তখন বলা হবে- আপনি জানেন না, আপনার পরে তারা দ্বীনের মধ্যে কী কী নতুন বিষয় উদ্ভাবন করেছিল। এ শুনে আমি বলব, যারা আমার পরে পরিবর্তন করেছে, তারা দূর হোক, দূর হোক। (সহিহ বুখারি: ৭০৫০)
আরও পড়ুন: বিদআত দেখলে সাহাবি-তাবেয়িরা যা করতেন
৬. তাওবার সুযোগ রুদ্ধ হওয়া ও চারিত্রিক অন্ধত্ব
বিদআতের একটি মারাত্মক দিক হলো- এটি তাওবার পথকে কঠিন করে তোলে। ইমাম তাবারানি (র.) বর্ণিত এক হাদিসে এসেছে, ‘আল্লাহ বিদআতকারীর জন্য তাওবার পথ বন্ধ করে দেন, যতক্ষণ না সে বিদআত ত্যাগ করে।’ বিদআতকারী ব্যক্তি নিজের ভুল কাজকে ‘নেক আমল’ মনে করে; ফলে তার মনে গুনাহের অনুশোচনা সৃষ্টি হয় না। আর অনুশোচনা না থাকলে তাওবা করাও সম্ভব হয় না।
৭. কেয়ামতে চরম অনুশোচনা ও আমল বিফল হওয়া
বিদআতিদের কেয়ামতের দিন কঠোর জবাবদিহি করতে হবে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘বলুন, আমি কি তোমাদেরকে সংবাদ দেব সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্তদের সম্পর্কে? তারা সেইসব লোক, যাদের পার্থিব জীবনের সব প্রচেষ্টা নিস্ফল হয়ে গেছে, অথচ তারা মনে করত যে তারা ভালো কাজ করছে।’ (সুরা কাহাফ: ১০৩–১০৪) এটি সুন্নাহবহির্ভূত আমলের ভয়াবহ পরিণাম সম্পর্কে এক সুস্পষ্ট সতর্কতা।
৮. উম্মাহর ঐক্য বিনষ্ট ও সামাজিক বিভক্তি
বিদআত মুসলিম উম্মাহর ঐক্য বিনষ্ট করে। সুন্নাহ সবাইকে এক পথে রাখে, কিন্তু বিদআত নানা রূপে বিভক্তি সৃষ্টি করে। এর ফলে দলাদলি, ফেরকাবাজি ও সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হয়, যা উম্মাহর শক্তির ভিতকে দুর্বল করে দেয়। এটি সমাজকে ভ্রান্ত আকিদা ও বিশৃঙ্খলার দিকে ঠেলে দেয়।
বিদআত বাহ্যিকভাবে যতই আকর্ষণীয় মনে হোক না কেন, বাস্তবে তা ইসলামের বিশুদ্ধ রূপকে বিকৃত করে এবং আমল ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এটি মানুষকে রাসুলুল্লাহ (স.)-এর শাফায়াত ও হাউজে কাউসারের মহান নেয়ামত থেকে বঞ্চিত করবে। তাই প্রত্যেক মুমিনের কর্তব্য হলো সাহাবায়ে কেরাম ও খোলাফায়ে রাশেদিনের অনুসৃত সুন্নাহর পথ দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরা। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সুন্নাহর ওপর অবিচল রেখে সব ধরনের বিদআত থেকে হেফাজত করুন। আমিন।

