শুক্রবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ঢাকা

ইনসাফ শান্তির ভিত্তি

ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: ২১ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:০২ পিএম

শেয়ার করুন:

ইনসাফ শান্তির ভিত্তি

ইসলামি শরিয়তে ‘ইনসাফ’ বা ন্যায়বিচার কেবল আদালতের বিচারিক কার্যক্রমের নাম নয়, বরং এটি একটি ব্যাপক ধারণা। পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহ নির্দেশিত পন্থায় ইনসাফভিত্তিক ফয়সালাকেই মূলত ন্যায়বিচার বলা হয়। যেখানে কোনো স্বজনপ্রীতি, ব্যক্তিগত বা সম্প্রদায়গত স্বার্থ, কিংবা ধনী-গরিবের ভেদাভেদ থাকবে না। অপরাধ অনুযায়ী শাস্তি হবে এবং প্রত্যেকের প্রাপ্য হক যথাযথভাবে বুঝিয়ে দেওয়াই হলো ইনসাফ। সমাজে চলমান অন্যায়-অনাচার ও বিশৃঙ্খলার অন্যতম মূল কারণ হলো ন্যায়বিচারহীনতা।

কোরআনে ইনসাফের নির্দেশ

আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে ইনসাফ প্রতিষ্ঠাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন। ব্যক্তিগত আবেগ বা আত্মীয়তার সম্পর্কের ঊর্ধ্বে উঠে ন্যায়বিচার করার নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ ইরশাদ করেন- 

সর্বাবস্থায় ন্যায়বিচার: ‘হে মুমিনগণ! তোমরা ন্যায়বিচারে দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত থাকবে আল্লাহর সাক্ষীস্বরূপ; যদিও তা তোমাদের নিজেদের বা পিতা-মাতা এবং আত্মীয়-স্বজনের বিরুদ্ধে হয়; সে বিত্তবান হোক বা বিত্তহীন হোক আল্লাহ উভয়েরই ঘনিষ্টতর। কাজেই তোমরা ন্যায়বিচার করতে প্রবৃত্তির অনুগামী হয়ে না।’ (সুরা নিসা: ১৩৫)

শত্রুর প্রতিও ইনসাফ: ইসলামে কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে অবিচার করার সুযোগ নেই। আল্লাহ বলেন, ‘কোনো কওমের প্রতি শত্রুতা যেন তোমাদেরকে কোনোভাবে প্ররোচিত না করে যে, ইনসাফ করবে না। তোমরা ইনসাফ করো, তা তাকওয়ার নিকটতর।’ (সুরা মায়েদা: ৮)

আরও পড়ুন: তায়েফের বেদনার স্মৃতি: নবীজির (স.) ধৈর্য ও ক্ষমার অনন্য দৃষ্টান্ত


বিজ্ঞাপন


আমানত ও শাসনকার্য: বিচারিক দায়িত্ব ও আমানত রক্ষার বিষয়ে ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিয়েছেন, যেন তোমরা প্রাপ্য আমানতসমূহ প্রাপকদের কাছে পৌঁছে দাও। আর যখন তোমরা মানুষের মধ্যে কোনো বিচার-ফয়সালা করো, তখন ইনসাফভিত্তিক ফয়সালা করো।’ (সুরা নিসা: ৫৮)

ন্যায়বিচারের মানদণ্ড

ইসলামে ন্যায়বিচারের একমাত্র উৎস হলো কোরআন ও সুন্নাহ। আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের অবাধ্য হয়ে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার কোনো সুযোগ নেই। ‘যারা আল্লাহর নাজিলকৃত বিধান অনুযায়ী বিচার ফয়সালা করে না, কোরআনে তাদের সম্পর্কে কঠোর সতর্কবার্তা এসেছে।’ (সুরা মায়েদা: ৪৪)। অন্য আয়াতে মুমিন হওয়ার শর্ত হিসেবে রাসুল (স.)-এর ফয়সালাকে বিনা দ্বিধায় মেনে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। (সুরা নিসা: ৬৫)

রাসুল (স.)-এর জীবনে ইনসাফের দৃষ্টান্ত

নবুয়তপ্রাপ্তির আগেও রাসুল (স.) ‘হিলফুল ফুজুল’ গঠন এবং হাজরে আসওয়াদ স্থাপনের ঘটনায় নিজের ন্যায়পরায়ণতার প্রমাণ দিয়েছিলেন। নবুয়তের পর মদিনার সনদে তিনি যে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করেন, তা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা।

আরও পড়ুন: নবীজির ৫টি মহামূল্যবান কথা জানেন না অনেকে

১. আইনের চোখে সবাই সমান
হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, মাখজুম গোত্রের এক সম্ভ্রান্ত নারী চুরির অপরাধে ধরা পড়লে কোরাইশরা বিচলিত হয়ে পড়ে। তারা রাসুল (স.)-এর প্রিয়ভাজন ওসামা বিন জায়েদ (রা.)-কে সুপারিশের জন্য পাঠায়। এতে রাসুল (স.) রাগান্বিত হয়ে বলেন, ‘তোমাদের আগের জাতিকে এ কাজই ধ্বংস করেছে যে যখন তাদের মধ্যে কোনো বিশিষ্ট অভিজাত লোক চুরি করত, তখন তারা বিনা সাজায় তাকে ছেড়ে দিত। আর গরিব লোক চুরি করলে দণ্ড জারি করত।’ এরপর তিনি ঐতিহাসিক শপথ করে বলেন, ‘আল্লাহর কসম, যদি মুহাম্মদ (স.)-এর কন্যা ফাতিমাও চুরি করত; তাহলে আমি তাঁর অবশ্যই হাত কেটে দিতাম।’ (দ্র. সহিহ বুখারি: ৩৪৬৫)

২. ভিন্ন ধর্মাবলম্বীর সঙ্গেও ন্যায়বিচার
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত একটি ঘটনায় দেখা যায়, একজন ইহুদি ও একজন মুসলিমের (আশআস রা.) মধ্যে জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ দেখা দেয়। রাসুল (স.) মুসলিম সাহাবির পক্ষে রায় না দিয়ে প্রমাণের ভিত্তিতে বিচার করেন। মুসলিম সাহাবির সাক্ষী না থাকায় ইহুদি ব্যক্তিকে কসম করতে বলেন এবং তার অধিকার সাব্যস্ত করেন। অর্থাৎ, প্রতিপক্ষ অমুসলিম বা শত্রু হলেও তার প্রতি বেইনসাফি করা ইসলামে হারাম। (সহিহ বুখারি: ২২৫৬)

ইনসাফ মানুষের মৌলিক অধিকার। গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যায়, ইনসাফ ছাড়া উত্তম চরিত্রের অধিকারী হওয়া অসম্ভব। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে শান্তি ফিরিয়ে আনতে হলে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার প্রতি ইনসাফ নিশ্চিত করতে হবে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে প্রিয়নবী (স.)-এর আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে ইনসাফভিত্তিক সমাজ গড়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর