রোববার, ১৮ জানুয়ারি, ২০২৬, ঢাকা

অনুমতি ছাড়া দেয়ালে পোস্টার: ইসলামি বিধান ও সামাজিক শিষ্টাচার

ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ০৪:৩৫ পিএম

শেয়ার করুন:

অনুমতি ছাড়া দেয়ালে পোস্টার: ইসলামি বিধান ও সামাজিক শিষ্টাচার

নির্বাচন, ওয়াজ মাহফিল, পণ্যের প্রচারণা কিংবা বিভিন্ন দিবস ও উপলক্ষকে কেন্দ্র করে আমাদের দেশে দেয়ালে পোস্টার লাগানোর প্রবণতা মহামারি আকার ধারণ করেছে। অনেক সময় দেখা যায়, বাড়ির মালিক বিরক্ত হয়ে নিজের সুন্দর দেয়ালে লিখে রাখতে বাধ্য হন- ‘এখানে পোস্টার লাগানো নিষেধ’। তবুও রাতের আঁধারে বা গোপনে সেখানে পোস্টার সাঁটানো হয়।
ব্যক্তিমালিকানাধীন বাসা-বাড়ি বা প্রতিষ্ঠানের দেয়ালে মালিকের অনুমতি ছাড়া পোস্টার লাগানো ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে নাজায়েজ এবং বান্দার হক (হক্কুল ইবাদ) নষ্ট করার শামিল। এ বিষয়ে কোরআন ও সুন্নাহর সুস্পষ্ট নির্দেশনা নিচে তুলে ধরা হলো।

১. অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে ব্যবহার নিষিদ্ধ

কারও ব্যক্তিগত দেয়াল বা স্থাপনা তার কষ্টার্জিত সম্পদ। ইসলামে অন্যের সম্পদ তার অনুমতি ছাড়া ভোগ বা ব্যবহার করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। দেয়াল ব্যবহার করে নিজের প্রচারণা চালানো এক প্রকার ‘সম্পদ গ্রাস’ বা জবরদখলের অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেন- ‘হে মুমিনগণ! তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না...।’ (সুরা বাকারা: ১৮৮)
সুতরাং, মালিকের অনুমতি ছাড়া তার দেয়াল ব্যবহার করা কোরআনের এই আয়াতের লঙ্ঘনের শামিল।

২. অন্যের ক্ষতি করা হারাম 

পোস্টার লাগানোর আঠা, চিকা মারার রং কিংবা পেরেক ঠোকার ফলে দেয়ালের প্লাস্টার ও সৌন্দর্য নষ্ট হয়। মালিক আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন এবং মনে কষ্ট পান। অথচ ইসলামে অন্যের ক্ষতি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। হজরত উবাদা ইবন সামিত (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) নির্দেশ দিয়েছেন- ‘অন্যের ক্ষতি করা যাবে না এবং (ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে) ক্ষতির প্রতিশোধ নেওয়ার ক্ষেত্রেও বাড়াবাড়ি করা যাবে না।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ: ২৩৪০)
যিনি পোস্টার লাগাচ্ছেন, তিনি নিজের সামান্য প্রচারণার স্বার্থে অন্যের স্থায়ী ক্ষতি করছেন, যা হাদিসের আলোকে নাজায়েজ।

আরও পড়ুন: নেতার যোগ্যতা সম্পর্কে কোরআন-হাদিস


বিজ্ঞাপন


৩. মালিকের সন্তুষ্টি ব্যতীত ব্যবহার অবৈধ

কোনো মুমিনের সম্পদ তার মনের সন্তুষ্টি বা অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা হালাল নয়। রাসুলুল্লাহ (স.) বিদায় হজের ভাষণে অন্যের সম্পদ ও সম্মানের ব্যাপারে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন- ‘কোনো মুসলিমের সম্পদ তার আন্তরিক সন্তুষ্টি ছাড়া (ব্যবহার করা) হালাল নয়।’ (মুসনাদে আহমদ: ২০৬৯৫)
তাই বাড়ির মালিক যদি মৌখিকভাবে অনুমতি না দেন, তবে সেখানে পোস্টার লাগানো আমানতের খেয়ানত এবং অন্যের অধিকার হরণের নামান্তর।

৪. পরিচ্ছন্নতা ও সৌন্দর্যের খেলাপ

আল্লাহ তাআলা সুন্দর, তিনি সৌন্দর্য পছন্দ করেন। রাস্তাঘাট ও অন্যের স্থাপনা নোংরা করা মুমিনের কাজ হতে পারে না।

আরও পড়ুন: ভোট দেওয়া কি শরিয়তসম্মত?

করণীয় ও সমাধান

নির্বাচন বা মাহফিলের আয়োজকদের মনে রাখতে হবে, জনসেবা বা দ্বীনের দাওয়াতের শুরুটা যেন অন্যের অধিকার হরণ দিয়ে না হয়। এ ক্ষেত্রে ইসলামি শিষ্টাচার ও সমাধানগুলো হলো-

১. অনুমতি গ্রহণ: পোস্টার লাগানোর আগে অবশ্যই বাড়ির মালিক বা কর্তৃপক্ষের মৌখিক বা লিখিত অনুমতি নিতে হবে। মালিক আপত্তি করলে জোর করা যাবে না।

২. বিকল্প পদ্ধতি: দেয়ালে আঠা দিয়ে না লাগিয়ে রশি দিয়ে ঝোলানোর পদ্ধতি (Laminated Poster) ব্যবহার করা যেতে পারে, যাতে দেয়ালের ক্ষতি না হয়।

৩. নির্ধারিত স্থান: পৌরসভা বা কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নির্ধারিত বোর্ড বা স্থানে পোস্টার লাগানো।

৪. ডিজিটাল প্রচারণা: দেয়াল নোংরা না করে সোশ্যাল মিডিয়া ও ডিজিটাল মাধ্যমের সর্বোচ্চ ব্যবহার করা।

অতএব, জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী বা মাহফিল আয়োজক সবার উচিত অন্যের অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া। দুনিয়ার সামান্য প্রচারণার জন্য অন্যের মনে কষ্ট দিয়ে বা সম্পদ নষ্ট করে আখেরাতে জবাবদিহিতার কাঠগড়ায় দাঁড়ানো বুদ্ধিমানের কাজ নয়। আল্লাহ আমাদের সবাইকে বান্দার হকের ব্যাপারে সচেতন হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর