বুধবার, ১২ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

কাবার দিকে তাকিয়ে থাকলে কি সওয়াব হয়? 

ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: ১২ জানুয়ারি ২০২৬, ০৫:২০ পিএম

শেয়ার করুন:

কাবার দিকে তাকিয়ে থাকলে কি সওয়াব হয়? 

বায়তুল্লাহ বা কাবা শরিফ পৃথিবীর বুকে আল্লাহর একত্ববাদের জীবন্ত প্রতীক। হজ বা ওমরায় গিয়ে হারামে উপস্থিত প্রত্যেক মুসলমানের হৃদয়ের আকুতি থাকে তাওয়াফ ও নামাজের মাধ্যমে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করা। তবে অনেক সময় শারীরিক ক্লান্তি, অসুস্থতা বা ভিড়ের কারণে তাওয়াফ করা সম্ভব হয় না। এমতাবস্থায় কেবল কাবার দিকে তাকিয়ে বসে থাকলে কি সওয়াব হবে? এ নিয়ে সাধারণ মুসল্লিদের মনে নানামুখী প্রশ্ন দেখা দেয়। কোরআন, হাদিস ও ফিকহি মতামতের আলোকে বিষয়টির দালিলিক বিশ্লেষণ ও শরয়ি সমাধান নিচে তুলে ধরা হলো।

হাদিসের পর্যালোচনা ও ফজিলত

কাবার দিকে তাকানোর ফজিলত সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (স.) থেকে একটি হাদিস বর্ণিত হয়েছে। হাদিসটিতে বলা হয়েছে- ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা এই ঘরের (কাবার) জিয়ারতকারীদের ওপর প্রতিদিন ও রাতে ১২০টি রহমত নাজিল করেন। এর মধ্যে ৬০টি রহমত তাওয়াফকারীদের জন্য, ৪০টি নামাজ আদায়কারীদের জন্য এবং ২০টি কাবার দিকে তাকিয়ে থাকাদের জন্য।’ (আল-মুজামুল কাবির, তাবারানি: ১১/৪৪৯; শুআবুল ঈমান, বায়হাকি)

মুহাদ্দিসগণের বিশ্লেষণ: সনদের বিচারে এই হাদিসটিকে মুহাদ্দিসরা ‘জয়িফ’ বা দুর্বল হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তাই এটিকে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতের অকাট্য দলিল হিসেবে গ্রহণ করা হয় না। তবে ইসলামি শরিয়তের মূলনীতি হলো- ফজিলত বা নেক আমলের উৎসাহ প্রদানের ক্ষেত্রে ‘দুর্বল হাদিস’ গ্রহণযোগ্য, যদি তা শরিয়তের মৌলিক বিধানের বিরোধী না হয় এবং সাহাবি ও তাবেয়িদের আমল দ্বারা সমর্থিত হয়।
সুতরাং, কাবার দিকে তাকানো জরুরি কোনো ইবাদত না হলেও, এটি নিঃসন্দেহে একটি মোস্তাহাব (প্রশংসনীয়) আমল এবং আল্লাহর রহমত লাভের মাধ্যম।

আরও পড়ুন: হজে কোন আমল বেশি করা ভালো

ফকিহ ও ইমামদের অভিমত

ইসলামি স্কলারগণ কাবার দিকে তাকানোকে ‘আল্লাহর নিদর্শনের প্রতি সম্মান’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
ইমাম নববী (রহ.) বলেন- ‘কাবার দিকে দৃষ্টি রাখাকে মোস্তাহাব মনে করা হয়, কারণ এটি আল্লাহর নিদর্শনের প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার প্রকাশ।’ (আল-মাজমু শরহুল মুহাজ্জাব)
ইমাম জারকাশি (রহ.) উল্লেখ করেন- ‘কাবার দিকে তাকিয়ে থাকা ইবাদত, যা অন্যকোনো মসজিদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।’
তাই তাওয়াফ ও নামাজে অক্ষম ব্যক্তি অলস বসে না থেকে কাবার দিকে তাকিয়ে জিকির ও দোয়া করলে অন্তরে প্রশান্তি আসবে এবং সওয়াব অর্জিত হবে ইনশাআল্লাহ।

সতর্কতা: নামাজে কেবলার দিকে তাকানো

একটি প্রচলিত ভুল ধারণা হলো- কাবার সামনে নামাজ পড়লে কাবার দিকেই তাকিয়ে থাকতে হয়। ফিকহি দৃষ্টিকোণ থেকে এটি সঠিক নয়।
হানাফি, শাফেয়ি ও হাম্বলি মাজহাবসহ অধিকাংশ ফকিহদের মতে, কাবার সামনে নামাজ পড়লেও দৃষ্টি কাবার দিকে নয়, বরং সেজদার জায়গায় রাখতে হবে। মা আয়েশা (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (স.) যখন কাবায় প্রবেশ করে নামাজ পড়েন, তখন তাঁর দৃষ্টি সেজদার স্থান অতিক্রম করেনি।’ (মুসতাদরাকে হাকেম)

আরও পড়ুন: হজে গিয়ে যেসব কাজ করার চিন্তাও করবেন না

ছবি বা অনলাইনে কাবা দেখা: শরয়ি বিধান

প্রযুক্তির কল্যাণে এখন ঘরে বসেই টিভিতে বা মোবাইলে লাইভ কাবা দেখা যায়। এতে কি সওয়াব হবে? আসলে এতে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। হাদিসে যে ‘২০টি রহমতের’ কথা বলা হয়েছে, তা হারামে উপস্থিত হয়ে সরাসরি কাবার দিকে তাকানোর জন্য খাস। ছবি বা ভিডিওর মাধ্যমে দেখলে সেই নির্দিষ্ট সওয়াব পাওয়ার দলিল নেই।

করণীয়: ভক্তি ও ভালোবাসার সাথে আল্লাহর নিদর্শন হিসেবে কাবার দৃশ্য দেখলে অন্তরে ঈমানি জজবা তৈরি হয় এবং আল্লাহর কথা স্মরণ হয়। এটি প্রশংসনীয় এবং এতে সওয়াব হতেও পারে। কিন্তু ছবির দিকে তাকিয়ে ইবাদতের নিয়ত করা বা ছবিকে সম্মান জানিয়ে হাত তোলা বিদআত।

সারসংক্ষেপে বলা যায়, কাবার দিকে তাকানো স্বতন্ত্র কোনো ফরজ ইবাদত নয়, তবে এটি মোস্তাহাব এবং ঈমানি প্রশান্তি বৃদ্ধির অনন্য মাধ্যম। হারামে অবস্থানকালে একজন মুমিনের সময়গুলো এভাবে ভাগ করা উচিত: প্রথম অগ্রাধিকার: তাওয়াফ করা (সর্বোচ্চ সওয়াব)। দ্বিতীয় অগ্রাধিকার: নামাজ ও তেলাওয়াতসহ অন্যান্য ইবাদত এবং বিশ্রামের সময় যখন শরীর ক্লান্ত থাকে, তখন গল্পগুজব পরিহার করে মহান নিদর্শন কাবার দিকে তাকিয়ে জিকির ও দোয়া করা।

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর