বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও জনপরিসরে নেকাব নিয়ে একটি প্রশ্ন প্রায়ই ঘুরপাক খায়- ‘নেকাব কি ইসলামের অবিচ্ছেদ্য বিধান, নাকি কেবল আরবীয় সংস্কৃতির অংশ?’ আধুনিকতার দোহাই দিয়ে অনেকে দাবি করেন, ইসলামে শালীনতার নির্দেশ আছে, কিন্তু মুখমণ্ডল ঢাকার সুনির্দিষ্ট হুকুম নেই। কেউ কেউ দুর্বল বা বিচ্ছিন্ন কিছু দলিলের ওপর ভিত্তি করে বলেন, নারীদের চেহারা খোলা রাখা বৈধ।
তবে কোরআন, সুন্নাহ এবং ফিকহি শাস্ত্রের দালিলিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই ধারণাগুলো ভুল। নেকাব কোনো সাংস্কৃতিক প্রথা নয়; বরং এটি কোরআন ও সুন্নাহ নির্দেশিত শালীনতার সর্বোচ্চ স্তর এবং উম্মাহর অবিচ্ছিন্ন আমল।
বিজ্ঞাপন
কোরআনের নির্দেশনা ও মুফাসসিরদের ব্যাখ্যা
পর্দা ও নেকাব প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনের সুরা আল আহজাবের ৫৯ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ তাআলা বলেন- ‘হে নবী! আপনি আপনার স্ত্রীদের, আপনার কন্যাদের ও মুমিনদের নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের ‘জিলবাবের’ (বড় চাদর) একাংশ নিজেদের ওপর নামিয়ে রাখে।’
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় ‘রইসুল মুফাসসিরিন’ হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন- ‘আল্লাহ মুমিন নারীদের নির্দেশ দিয়েছেন, যখন তারা প্রয়োজনের জন্য ঘর থেকে বের হবে, তখন মাথা থেকে চাদর টেনে সম্পূর্ণ মুখমণ্ডল আবৃত রাখবে, শুধু (চলার জন্য) এক চোখ খোলা রাখবে।’ (জামিউল বায়ান, তাবারি: ১০/৩৩২; তাফসিরুল কোরআনিল আজিম, ইবনে কাসির: ৩/৮২৫)
বিখ্যাত তাবেয়ি ইসমাইল ইবনে উলাইয়্যা (রহ.) এই আয়াতের ব্যাখ্যায় নিজে চাদর পরে হাতে-কলমে দেখিয়েছেন যে, কীভাবে কপাল, নাক ও বাম চোখ ঢেকে শুধু ডান চোখ খোলা রাখতে হয়।
বিজ্ঞাপন
ইমাম আবু বকর আল-জাসসাস (রহ.) লিখেছেন, ‘এই আয়াত প্রমাণ করে, বাইরে বের হওয়ার সময় নারীর মুখমণ্ডল আবৃত রাখা অপরিহার্য, যাতে দুষ্ট প্রকৃতির লোক তাদের দিকে লোলুপ দৃষ্টিতে না তাকায়।’ (আহকামুল কোরআন, জাসসাস: ৩/৩৭২)
আরও পড়ুন: যাদের সামনে নারীর পর্দা করার প্রয়োজন হয় না
অনেকে সুরা নূরের ৩১ নম্বর আয়াতে ‘প্রকাশমান সৌন্দর্য’ (ইল্লা মা যাহারা মিনহা) অংশের ভুল ব্যাখ্যা করে চেহারা খোলা রাখার বৈধতা খোঁজেন। অথচ বিশিষ্ট সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর মতে, এখানে ‘প্রকাশমান সৌন্দর্য’ বলতে ‘কাপড় বা চাদর’ বোঝানো হয়েছে, যা ইচ্ছা না থাকলেও দেখা যায়; চেহারা নয়। (তাফসিরুল কোরআনিল আজিম: ৩/৩১২)
সহিহ হাদিসে নেকাবের প্রমাণ
রাসুলুল্লাহ (স.) এবং সাহাবিদের আমল থেকেও নেকাবের আবশ্যকতা প্রমাণিত। সহিহ বুখারিতে বর্ণিত হয়েছে- ‘ইহরাম গ্রহণকারী নারী যেন নেকাব ও দস্তানা পরিধান না করে।’ (সহিহ বুখারি ৪/৬৩, হাদিস ১৮৩৮)
মুহাদ্দিসগণ বলেন, ইহরামের সময় বিশেষ নির্দেশনার অর্থই হলো স্বাভাবিক সময়ে তারা নেকাব পরতেন। উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়েশা (রা.) বিদায় হজের বর্ণনায় উল্লেখ করেছেন- ‘ইহরামের কারণে আমরা নেকাব খুলে রাখতাম, কিন্তু যখন পুরুষেরা আমাদের পাশ দিয়ে অতিক্রম করত, আমরা মাথার ওপর থেকে চাদর টেনে মুখমণ্ডল আবৃত করতাম।’ (সুনানে আবু দাউদ: ১৮৩৩; মুসনাদে আহমদ: ৬/৩০)
এছাড়াও হজরত আসমা বিনতে আবু বকর (রা.) বলেন, ‘আমরা পুরুষদের সামনে মুখমণ্ডল আবৃত রাখতাম।’ (মুসতাদরাক হাকিম: ১/৪৫৪)
বিভ্রান্তি নিরসন: যারা সুনানে আবু দাউদের একটি হাদিস দিয়ে চেহারা খোলা রাখার দলিল দেন (যেখানে চেহারা ও হাতের কবজি খোলা রাখার কথা আছে), মুহাদ্দিসদের মতে সেই হাদিসটি ‘মুনকাতি’ বা বিচ্ছিন্ন সনদের। স্বয়ং ইমাম আবু দাউদ (রহ.) হাদিসটি বর্ণনার পর একে দুর্বল বলেছেন। তাই সহিহ হাদিসের বিপরীতে এমন দুর্বল দলিল গ্রহণযোগ্য নয়।
আরও পড়ুন: ৩ শ্রেণির নারীর মধ্যে না পড়লে আপনার জন্য পর্দা ফরজ নয়
চার মাজহাবের ফিকহি সিদ্ধান্ত
ইসলামের চারটি প্রধান মাজহাবই নেকাব বা মুখমণ্ডল আবৃত রাখাকে ইসলামি পর্দার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
১. হানাফি মাজহাব: হানাফি মাযহাব নিয়ে সমাজে ব্যাপক ভুল প্রচার আছে যে, তারা চেহারা খোলা রাখার অনুমতি দেয়। এটি সঠিক নয়। হানাফি ফিকহের নির্ভরযোগ্য কিতাব ‘ফাতাওয়া কাজিখান’ ও ‘রদ্দুল মুহতার’-এ স্পষ্ট বলা হয়েছে- ‘নারীর মুখমণ্ডল সতর নয় (নামাজের ক্ষেত্রে), কিন্তু ফিতনার আশঙ্কা থাকলে পরপুরুষের সামনে চেহারা ঢাকা ওয়াজিব।’ বর্তমান যুগে ফিতনার ব্যাপকতা সর্বজনবিদিত, তাই হানাফি ফুকাহাগণ সর্বসম্মতিক্রমে নেকাব পরাকে আবশ্যক বলেছেন। (আহকামুল কোরআন, জাসসাস: ৩/৩৭১; রদ্দুল মুহতার: ১/৪০৬)
২. শাফেয়ি মাজহাব: নারীর চেহারা ও দেহ আবৃত থাকা অপরিহার্য। (রওজাতুত তালেবিন: ৭/২১)
৩. মালেকি মাজহাব: মুখমণ্ডল ও শরীর আবৃত রাখা জরুরি। (আলজামি লি আহকামিল কোরআন, কুরতুবি: ১২/১১৫)
৪. হাম্বলি মাজহাব: মুখমণ্ডল ও দেহ আবৃত রাখার সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে। (আলমুগনি, ইবনে কুদামা: ২/৩২৮)
আরও পড়ুন: ইসলামে পর্দা: ইবাদত, নিরাপত্তা ও মর্যাদার সামগ্রিক ব্যবস্থা
সংস্কৃতি নাকি শরিয়ত?
অনেকে নেকাবকে ‘আরবীয় সংস্কৃতি’ বলে উড়িয়ে দিতে চান। অথচ শত শত বছর ধরে এশিয়া থেকে আফ্রিকা পর্যন্ত মুসলিম নারীরা এই বিধান পালন করে আসছেন। এটি কোনো আঞ্চলিক প্রথা নয়, বরং আল্লাহর নির্দেশ। বোরকা বা নেকাব নিয়ে উপহাস করা ঈমানের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা কি আল্লাহ, তাঁর আয়াত ও রাসুলকে নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করছ? ...তোমরা ঈমান আনার পর কুফুরি করেছ।’ (সুরা তওবা: ৬৫-৬৬)
দালিলিক বিশ্লেষণে এটি দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে, নেকাব ইসলামি শরিয়তের বিধান, কোনো সংস্কৃতি নয়। কোরআন, সহিহ হাদিস ও চার মাজহাবের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, পরপুরুষের সামনে নারীর মুখমণ্ডল আবৃত রাখা পর্দার অপরিহার্য অংশ। নেকাব কেবল একটি কাপড় নয়; এটি আল্লাহর হুকুম মানার প্রতীক, নারীর সম্ভ্রম রক্ষার ঢাল এবং ইসলামি চেতনার জীবন্ত প্রকাশ।

