বুধবার, ১ এপ্রিল, ২০২৬, ঢাকা

‘চোখে দেখবই আল্লাহকে!’ বনি ইসরাইলের সেই অহংকারের পরিণতি

ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: ১১ নভেম্বর ২০২৫, ০৮:৩৭ পিএম

শেয়ার করুন:

‘চোখে দেখবই আল্লাহকে!’ বনি ইসরাইলের সেই অহংকারের পরিণতি

ইতিহাসে এমন এক বিস্ময়কর ও ভীতিপ্রদ ঘটনা লিপিবদ্ধ হয়ে আছে, যখন মানুষের একগুঁয়েমি ও সীমালঙ্ঘনের কারণে মহান আল্লাহর গজব নেমে এসেছিল। এটি বনি ইসরাইলের সেই শিক্ষণীয় ঘটনা, যারা নবী মুসা (আ.)-এর মাধ্যমে প্রাপ্ত আল্লাহর কিতাবের প্রতি বিশ্বাস না রেখে তাঁকে সরাসরি দেখতে চেয়ে ধ্বংসের মুখোমুখি হয়েছিল। পবিত্র কোরআনে এই ঘটনাটি সংরক্ষিত আছে, যা যুগে যুগে মুমিনদের জন্য এক সতর্কবার্তা হয়ে আছে।

আল্লাহর সাক্ষাৎ দাবি ও গজবের সূচনা

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: হজরত মুসা (আ.) ছিলেন আল্লাহ তাআলার বিশেষ অনুগ্রহপ্রাপ্ত নবী, যাঁর সঙ্গে আল্লাহ সরাসরি কথা বলেছেন। তাফসির ও হাদিস অনুযায়ী, তিনি চল্লিশ দিন রোজা রেখে তূর পর্বতে যান, যেখানে আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রতি তাওরাত নাজিল করেন। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘ইবরাহিম (আ.)-এর সহিফা রমজানের প্রথম রাতে অবতীর্ণ হয়, তাওরাত রমজানের ছয় তারিখে, ইনজিল তেরো তারিখে, আর জবুর আঠারো তারিখে।’ (মুসনাদে আহমদ: ১৬৯৮৪)
 
কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন-‘নিশ্চয়ই আমি তাওরাত নাজিল করেছি, যাতে রয়েছে হেদায়াত ও নূর।’ (সুরা মায়েদা: ৪৪)

আরও পড়ুন: হজরত মুসা ও খিজির (আ.)-এর ঘটনা

বনি ইসরাইলের অবাধ্যতা ও অহংকার: তাওরাত নিয়ে ফিরে এসে হজরত মুসা (আ.) বনি ইসরাইলকে বললেন, ‘এটি আল্লাহপ্রদত্ত কিতাব। তোমরা এর আদেশ-নিষেধ মানলে দুনিয়া ও আখিরাতে সফল হবে।’ কিন্তু তাদের মধ্যে কিছু উদ্ধত লোক বলল- ‘আমরা বিশ্বাস করব না যতক্ষণ না আল্লাহ স্বয়ং এসে বলেন যে, এ কিতাব তাঁর প্রদত্ত।’

আল্লাহর নির্দেশে মুসা (আ.) তাদের মধ্য থেকে ৭০ জন প্রতিনিধিকে নিয়ে আবার তূর পর্বতে গেলেন। সেখানে তারা আল্লাহর বাণী শুনতেও পেল। তবুও তারা বলল- ‘শুধু কথা শুনে তো আমাদের তৃপ্তি হচ্ছে না; আমরা চাই আল্লাহকে নিজ চোখে দেখতে!’


বিজ্ঞাপন


মহাগজব নেমে আসা

মানবজাতি দুনিয়ায় আল্লাহকে দেখা বা ধারণ করার ক্ষমতা রাখে না। তাদের এই ধৃষ্টতার কারণে ভয়াবহ বজ্রপাত নেমে আসে। মুহূর্তেই তারা সবাই মৃত্যুবরণ করে অথবা অচেতন হয়ে পড়ে। পরে আল্লাহ তাআলা তাঁর অসীম রহমতে তাদের পুনরায় জীবিত করেন।

আরও পড়ুন: মুসা (আ.)-এর থাপ্পড়ে আজরাইলের চোখ বেরিয়ে যাওয়ার ঘটনা

পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে- ‘আর যখন তোমরা বলেছিলে, ‘হে মূসা! আমরা তোমাকে বিশ্বাস করব না, যতক্ষণ না আল্লাহকে নিজেদের চোখে প্রকাশ্যে দেখতে পাব।’ তখন বজ্রপাত তোমাদের পাকড়াও করল, অথচ তোমরা তাকিয়ে ছিলে। এরপর আমি তোমাদের মৃত্যুর পর পুনরায় জীবন দান করলাম, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞ হও।’ (সুরা বাকারা: ৫৫–৫৬)

ইমাম ইবনে কাসির (রহ.) বলেন, ‘এটি ছিল এমন এক সীমালঙ্ঘন, যা কোনো নবীর উম্মতের পক্ষেও শোভন নয়। তারা আল্লাহর গৌরবের ধারণা হারিয়ে ফেলে অহংকারে পতিত হয়েছিল।’ (ইবনে কাসির) ইমাম কুরতুবি (রহ.) লিখেছেন- ‘তারা বজ্রপাতে মৃত হয়ে গিয়েছিল, পরে আল্লাহ তাদের জীবিত করেন, যাতে তারা কৃতজ্ঞ হয়ে ঈমান দৃঢ় করে।’ (আল-জামিউ লি আহকামিল কোরআন)

দুনিয়ায় আল্লাহকে দেখা সম্ভব নয়

আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন- ‘চোখসমূহ তাকে আয়ত্ব করতে পারে না। আর তিনি চোখসমূহকে আয়ত্ব করেন। আর তিনি সূক্ষ্মদর্শী, সম্যক অবহিত।’ (সুরা আনআম: ১০৩)

এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন- ‘তোমাদের কেউ কখনো তার রবকে দেখতে পাবে না, যতক্ষণ না সে মৃত্যুবরণ করবে।’ (মুসলিম: ১৬৯; তিরমিজি: ২২৩৫)

তবে আখিরাতে মুমিনরা আল্লাহর সৌন্দর্য দর্শনের সৌভাগ্য লাভ করবে- ‘সেদিন কিছু মুখ দীপ্তিময় হবে; তারা তাদের প্রতিপালকের দিকে চেয়ে থাকবে।’ (সুরা কিয়ামাহ: ২২–২৩)

আরও পড়ুন: মুসা (আ.)-এর সেই কালজয়ী দোয়া: প্রতিটি চ্যালেঞ্জের চূড়ান্ত সমাধান

ঘটনার শিক্ষা ও আজকের বার্তা

১. ঈমান মানে অদেখার প্রতি বিশ্বাস: আল্লাহকে দেখা বা প্রমাণ চাওয়া ঈমানের দাবি নয়, বরং তাঁর বাণীর প্রতি বিনা শর্তে বিশ্বাসই প্রকৃত ঈমান।

২. সীমালঙ্ঘন ধ্বংস ডেকে আনে: আল্লাহর নির্দেশের সীমানা অতিক্রমকারীরা কখনো রক্ষা পায়নি; বনী ইসরাইলের এই ঘটনা তার জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত।

৩. আল্লাহর মহিমা অনুধাবন: দুনিয়ার চোখে আল্লাহকে দেখা অসম্ভব—এটি মুমিনের বিনয় ও বিশ্বাসের পরীক্ষা।

৪. কৃতজ্ঞতা ও তওবা: মৃত্যুর পর জীবিত হওয়াও আল্লাহর রহমতের নিদর্শন, যাতে মানুষ কৃতজ্ঞ হয় ও তওবার দিকে ফিরে আসে।

বনি ইসরাইলের এই করুণ পরিণতি মানবজাতির জন্য এক শাশ্বত শিক্ষা। আল্লাহর বিধানের সামনে বিনয়ী হওয়া, অহংকার ত্যাগ করা এবং অদেখার প্রতি ঈমান রাখা- এগুলোই মুক্তির চাবিকাঠি। ‘যেখানে ঈমান বিনা শর্তের আত্মসমর্পণ, সেখানে অহংকার হলো অবিশ্বাসের সূচনা।’ 

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে পূর্ববর্তী উম্মতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে ঈমান দৃঢ় রাখার, আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের এবং সীমালঙ্ঘন থেকে নিরাপদ থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর