বুধবার, ১ এপ্রিল, ২০২৬, ঢাকা

রহমাতুল্লিল আলামিন: নবীজির রহমতের ৮ অনন্য দিক

ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৭ নভেম্বর ২০২৫, ০৫:৫৬ পিএম

শেয়ার করুন:

রহমাতুল্লিল আলামিন: নবীজির রহমতের ৮ অনন্য দিক

‘রহমাতুল্লিল আলামিন’ বিশ্বজগতের জন্য রহমত। এই মহান উপাধিটি স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাঁর প্রিয় হাবিব মুহাম্মাদ (স.)-কে দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِّلْعَالَمِينَ ‘আমি আপনাকে সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য রহমতস্বরূপই প্রেরণ করেছি।’ (সুরা আম্বিয়া: ১০৭) নবীজি (স.)-এর সমগ্র জীবনই ছিল মানবতা ও সৃষ্টিজগতের জন্য আল্লাহর অফুরান রহমত। তাঁর চরিত্রের আলোয় শিক্ষা-সংস্কৃতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি ও রাজনীতিসহ মানবজীবনের সব ক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটেছে। আসুন দেখি এই রহমতের ৮টি অনন্য দিক।

১. সার্বজনীন ক্ষমার মহান দৃষ্টান্ত

তায়েফে রক্তাক্ত অবস্থায় ফেরেশতারা তায়েফবাসীদের ধ্বংসের প্রস্তাব দিলে নবীজি (স.) তা প্রত্যাখ্যান করেন এবং বলেন- ‘আশা করি মহান আল্লাহ তাদের বংশ থেকে এমন সন্তান জন্ম দেবেন যারা এক আল্লাহর ‘ইবাদাত করবে আর তাঁর সঙ্গে কাউকে শরীক করবে না।’ (সহিহ বুখারি: ৩২৩১)
মক্কা বিজয়ের দিনও তিনি সবাইকে ক্ষমা করে দিয়ে বলেছিলেন- ‘আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই। যাও, তোমরা সবাই মুক্ত।’ (সিরাতে ইবনে হিশাম, খণ্ড ৪, পৃ. ৪১) এটাই ছিল রাসুল (স.)-এর উদারতা ও মহনুভবতার দৃষ্টান্ত। হাদিসে তিনি স্পষ্ট বলেছেন, ‘যে মানুষের প্রতি দয়া করে না, আল্লাহও তার প্রতি দয়া করেন না।’ (মুসলিম: ২৩১৯)
ওহুদের ময়দানে হারাতে হয়েছে পবিত্র দাঁত। তারপরও তিনি বদদোয়া করেননি। নবীজি রক্তাক্ত চেহারা মুছতে মুছতে বলতেন, ‘আমি অভিশাপ দেওয়ার জন্য আসিনি, বরং আমি এসেছি ক্ষমা প্রার্থনার জন্য।’ এরপর তিনি দোয়া করতেন, ‘হে আমার মালিক! আমার লোকদের ক্ষমা করুন। তারা জানে না যে, তারা কী করছে।’ (মুসলিম: ২৫৯৯, ইবনে হিব্বান: ৯৮৫)

আরও পড়ুন: সুন্দর জীবনের জন্য নবীজির সংক্ষিপ্ত নসিহত 

২. অমুসলিমদের জন্যও রহমত

নবীজি (স.) শুধু মুসলমানদের জন্যই নন, অমুসলিমদের জন্যও রহমত। তাঁর আগমনে অমুসলিমরা দুনিয়ার শাস্তি থেকে রক্ষা পেয়েছে। মাওলানা শাব্বির আহমদ উসমানি (রহ.) বলেন- ‘রাসুল (স.)-এর জিহাদও এক অর্থে রহমতের প্রকাশ।’ (তাফসিরে উসমানি, ২১: ১০৭ ব্যাখ্যা) যুদ্ধবন্দিদের সঙ্গে যেন কোনো অমানবিক আচরণ না ঘটে, সেদিকে খেয়াল রাখার জন্য নবীজি সাহাবাদের কঠোর নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, ‘যে মুসলিম তার বন্দির সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।’ (মুসনাদে আহমদ: ৩২)


বিজ্ঞাপন


৩. উম্মতের জন্য অফুরান দরদ

রাসুল (স.) বলেন, ‘আমার ও তোমাদের দৃষ্টান্ত সেই ব্যক্তির মতো, যে আগুন জ্বালাল; ফলে ফড়িং দল আর পতঙ্গ তাতে ঝাপিয়ে পড়তে লাগল আর সে লোক তাদের তা থেকে বিতাড়িত করতে লাগল। আমিও আগুন থেকে রক্ষার জন্য তোমাদের কোমরবন্ধ ধরে টানছি, আর তোমরা আমার হাত থেকে ছুটে যাচ্ছ।’ (সহিহ মুসলিম: ৫৮৫২) 

তিনি প্রতি নামাজে উম্মতের জন্য দোয়া করতেন- ‘হে আল্লাহ! আমার উম্মতের আগে ও পরের এবং প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সব গুনাহ ক্ষমা করে দিন।’ (সহিহ ইবনে হিব্বান: ৭১১১)

আরও পড়ুন: নবীজির জীবন দর্শন: সংকটে পথ দেখাবে যে শিক্ষা 

৪. নির্যাতন সহ্যের অতুলনীয় নমুনা

মক্কার মুশরিকরা তাঁর উপর প্রচণ্ড নির্যাতন চালিয়েছে। নামাজরত অবস্থায় আবু জাহেল তাঁর কাঁধে উটের নাড়িভুঁড়ি ফেলেছিল, হিজরতের সময় নানাভাবে হত্যাচেষ্টা করেছিল। এছাড়াও জাতুর রিকা যুদ্ধ থেকে ফেরার পথে গাছের নিচে বিশ্রামরত অবস্থায় হত্যাচেষ্টা, তাবুক অভিযান থেকে ফেরার পথে মুখোশধারী মুনাফিকরা নিরিবিলিতে হত্যার প্রচেষ্টা, এমনকি বিষ খাইয়েও হত্যার চেষ্টা হয়েছে নবীজিকে। তবু নবীজি (স.) ছিলেন ধৈর্য ও সহনশীলতার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ।

৫. নারীমুক্তির বৈপ্লবিক পরিবর্তন

নবীজি (স.) ঘোষণা করেন- ‘إِنَّمَا النِّسَاءُ شَقَائِقُ الرِّجَالِ ‘নারীরা হলো পুরুষদের সহোদর অংশ বা অর্ধাঙ্গ।’ (সুনান আবু দাউদ: ২৩৬) রাসুল (স.) আরও ইরশাদ করেন, ‘যার ঘরে কন্যা সন্তান জন্মগ্রহণ করলো, অতঃপর সে ওই কন্যাকে কষ্ট দেয়নি, মেয়ের ওউপর অসন্তুষ্টও হয়নি এবং পুত্র সন্তানকে তার ওপর প্রধান্য দেয়নি, তাহলে ওই কন্যার কারণে আল্লাহ তাআলা তাকে জান্নাতে প্রবশে করাবেন। ’ (মুসনাদ আহমদ: ১/২২৩)

আরও পড়ুন: নবীজির ৫টি মহামূল্যবান কথা জানেন না অনেকে

৬. দাসমুক্তির ঐতিহাসিক অভিযান

তিনি বলেন- ‘জেনে রেখো, তোমাদের দাস-দাসী তোমাদেরই ভাই। আল্লাহ্ তা’আলা তাদের তোমাদের অধীনস্থ করে দিয়েছেন। তাই যার ভাই তার অধীনে থাকবে, সে যেন তাকে নিজে যা খায় তাকে তা-ই খাওয়ায় এবং নিজে যা পরিধান করে, তাকেও তা-ই পরায়। তাদের উপর এমন কাজ চাপিয়ে দিও না, যা তাদের জন্য অধিক কষ্টদায়ক। যদি এমন কষ্টকর কাজ করতে দাও, তাহলে তোমরাও তাদের সে কাজে সহযোগিতা করবে।’ (সহিহ বুখারি: ৩০)
দাসমুক্তিকে ইবাদতের মর্যাদা দিয়ে তিনি মানবাধিকারের ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করেন।

৭. শিশু ও দুর্বল গোষ্ঠীর প্রতি মমতা

‘রাসুলুল্লাহ (স.) একদা হাসান ইবনু আলীকে চুম্বন করেন। সেসময় তাঁর নিকট আকরা ইবনু হাবিস তামিমি উপবিষ্ট ছিলেন। আকরা ইবনু হাবিস বললেন, আমার দশটি পুত্র আছে, আমি তাদের কাউকেই কোনোদিন চুম্বন দেইনি। রাসুলুল্লাহ (স.) তাঁর পানে তাকালেন, অতঃপর বললেন- যে দয়া করে না, সে দয়া পায় না।’ (সহিহ বুখারি: ৫৯৯৭)
এতিম, বিধবা ও অসহায়দের জন্য নবীজির ভালোবাসা ছিল অফুরন্ত।

আরও পড়ুন: মুমিন নারীর ৭টি মূল্যবান গুণ

৮. প্রাণীকুল ও পরিবেশের প্রতি দয়া

‘সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন- হে আল্লাহর রাসুল! জীব-জন্তুর (প্রতি দয়া প্রদর্শনের) জন্যও কি আমাদের পুরস্কার আছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ, প্রত্যেক দয়ালু অন্তরের অধিকারীদের জন্যে প্রতিদান আছে।’ (সহিহ বুখারি: ৬০০৯)

উম্মতের জন্য বিশেষ কল্যাণ

নবীজি (স.) উম্মতের কল্যাণে সর্বদা অতুলনীয় যত্ন ও দয়া দেখিয়েছেন। বিশেষত কোরবানির ক্ষেত্রে তিনি দুটি কোরবানি করতেন: একটি নিজের পরিবার এবং ব্যক্তিগত পক্ষ থেকে, আর অপরটি সমগ্র উম্মতের (যারা আল্লাহর ও তাঁর নবুয়তের সাক্ষ্য দেয়) পক্ষ থেকে। (সুনানে ইবনে মাজাহ: ৩১২২)

নবীজি (স.)-এর রহমতের এই আট দিক আজকের অস্থির বিশ্বে শান্তি, সহনশীলতা ও মানবতার অনন্ত উৎস। তিনি মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে সকলের জন্য রহমত হয়ে এসেছেন। তাঁর জীবন আমাদের শেখায় কীভাবে অন্ধকারে আলো ছড়াতে হয়, হিংসায় ক্ষমাশীল হতে হয় এবং বিভেদে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে হয়। এই মহান রহমতের ধারা চিরকাল বিশ্ববাসীর হৃদয় আলোকিত করে রাখুক। আমিন।

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর