শনিবার, ২৩ মে, ২০২৬, ঢাকা

কোরবানির পশু জবাইয়ের সুন্নত পদ্ধতি ও দোয়া, যা অনেকেই জানেন না

ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৬ জুন ২০২৪, ০৭:১৫ পিএম

শেয়ার করুন:

কোরবানির পশু জবাইয়ের নিয়ম ও দোয়া

কোরবানি ইবরাহিম (আ.)-এর অতুলনীয় আত্মত্যাগের স্মৃতিবাহী এক মহান ইবাদত। আল্লাহ তাআলা বলেন- ‘আপনি আপনার রবের উদ্দেশ্যে নামাজ পড়ুন এবং কোরবানি আদায় করুন।’ (সুরা কাউসার: ২) রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন- ‘কোরবানির দিন আদম সন্তানের কোনো আমলই আল্লাহর কাছে রক্ত প্রবাহিত করার চেয়ে অধিক প্রিয় নয়।’  (তিরমিজি: ১৪৯৩)

এই ইবাদত কবুল হওয়ার জন্য বিশুদ্ধ নিয়তের পাশাপাশি সুন্নাহ অনুযায়ী পশু জবাই করাও অপরিহার্য। অনেকেই জবাইয়ের সঠিক পদ্ধতি, দোয়া ও মাসয়ালা সম্পর্কে অজ্ঞ থাকেন। এই প্রতিবেদনে দলিলসহ বিষয়গুলো তুলে ধরা হলো।


বিজ্ঞাপন


কোরবানির সময়সীমা

১০ জিলহজ ঈদের নামাজের পর থেকে ১২ জিলহজ সূর্যাস্তের আগ পর্যন্ত কোরবানি করা যায়। তিন দিনের মধ্যে প্রথম দিন কোরবানি করা অধিক উত্তম। ১২ জিলহজ সূর্যাস্তের পর কোরবানি করা শুদ্ধ নয়। যে এলাকায় ঈদের জামাত হয় না, সেখানে ১০ জিলহজ ফজরের পর থেকেই কোরবানি করা জায়েজ। (রদ্দুল মুহতার: ৬/৩১৬; ফতোয়ায়ে আলমগিরি: ৫/২৯৬)

কোরবানির পশু: বয়স ও ধরন

শরিয়ত নির্ধারিত পশু ছাড়া কোরবানি শুদ্ধ হয় না। গ্রহণযোগ্য পশু ও বয়সসীমা নিচে দেওয়া হলো-

পশু          ন্যূনতম বয়স            অংশ
উট           ৫ বছর            ৭ জন পর্যন্ত
গরু / মহিষ   ২ বছর           ৭ জন পর্যন্ত
ছাগল / ভেড়া / দুম্বা ১ বছর        ১ জন

তবে ভেড়া বা দুম্বা যদি ছয় মাসেই এতটা মোটা-তাজা হয় যে দেখতে এক বছরের মতো লাগে, তাহলে সেটি দিয়েও কোরবানি জায়েজ। (হেদায়া: ৪/৪৩২; ফতোয়ায়ে শামি: ৫/২৯৮)
পশুতে যেসব ত্রুটি থাকলে কোরবানি শুদ্ধ হয় না: অন্ধ, খোঁড়া, অত্যন্ত কৃশকায় বা কান-লেজ কাটা পশু। (আবু দাউদ: ২৮০২)

জবাইকারীর প্রস্তুতি ও আদব

নিজ হাতে জবাই: নিজের কোরবানির পশু নিজ হাতে জবাই করা মোস্তাহাব। অসমর্থ হলে অন্যকে দিয়ে জবাই করানো যাবে, তবে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা উত্তম। (ফতোয়ায়ে শামি: ৫/২৭২)
ছুরি ধারালো করা: জবাইয়ের আগে ছুরি ভালোভাবে ধার দিয়ে নেওয়া মোস্তাহাব, যাতে পশুর অপ্রয়োজনীয় কষ্ট না হয়। হাদিসে এসেছে, ‘তোমরা ছুরি ধারালো করো এবং পশুকে কষ্ট দিও না।’ (সহিহ মুসলিম: ১৯৫৫)

পশুকে পানি পান করানো: জবাইয়ের আগে পশুকে পানি পান করানো উত্তম ও দয়ার আচরণ হিসেবে বিবেচিত।
সাহায্যকারীর বিধান: জবাইয়ে কেউ সাহায্য করলে তার জন্যও ‘বিসমিল্লাহ আল্লাহু আকবার’ বলা ওয়াজিব। (হেদায়া: ৪/৪৩৮)

জবাইয়ের সুন্নতি পদ্ধতি

ধাপ ১- কিবলামুখী শোয়ানো: পশুকে কিবলামুখী করে বাঁ কাতে শোয়াতে হবে।

ধাপ ২- পা বাঁধা: পশুর তিনটি পা বেঁধে ডান পা খোলা রাখা সুন্নাহ।

ধাপ ৩- দোয়া পড়া: পশু শোয়ানোর পর জবাইয়ের আগে নিচের দোয়াটি পাঠ করা মোস্তাহাব।

আরবি: إِنِّي وَجَّهْتُ وَجْهِيَ لِلَّذِي فَطَرَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ حَنِيفًا وَمَا أَنَا مِنَ الْمُشْرِكِينَ، إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ، لَا شَرِيكَ لَهُ وَبِذَلِكَ أُمِرْتُ وَأَنَا مِنَ الْمُسْلِمِينَ، اللَّهُمَّ مِنْكَ وَلَكَ
উচ্চারণ: ইন্নি ওয়াজ্জাহতু ওয়াজহিয়া লিল্লাজি ফাতারাস সামাওয়াতি ওয়াল আরদা হানিফাঁও ওয়ামা আনা মিনাল মুশরিকিন। ইন্না সালাতি ওয়া নুসুকি ওয়া মাহইয়ায়া ওয়া মামাতি লিল্লাহি রাব্বিল আলামিন। লা শারিকা লাহু ওয়া বিজালিকা উমিরতু ওয়া আনা মিনাল মুসলিমিন। আল্লাহুম্মা মিনকা ওয়ালাক।
অর্থ: আমি একনিষ্ঠভাবে সেই সত্তার দিকে মুখ করলাম যিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন। আমি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত নই। নিশ্চয়ই আমার নামাজ, আমার কোরবানি, আমার জীবন ও মৃত্যু সবই আল্লাহর জন্য। হে আল্লাহ! এটি তোমার পক্ষ থেকে এবং তোমারই জন্য। (আবু দাউদ: ২৭৯৫)
ধাপ ৪- জবাই: ছুরি চালানোর মুহূর্তে বলতে হবে- আরবি: بِسْمِ اللهِ اللهُ أَكْبَر উচ্চারণ: বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার
‘বিসমিল্লাহ’ বলা ওয়াজিব। ইচ্ছাকৃতভাবে ছেড়ে দিলে জবাই শুদ্ধ হবে না। তবে ভুলক্রমে ছুটে গেলে পশু হালাল থাকবে। (হেদায়া: ৪/৪৩৫)
ধাপ ৫- রগ কাটা: জবাইয়ের সময় কণ্ঠনালি, খাদ্যনালি ও দুই পাশের প্রধান রগ কেটে দেওয়া সুন্নতি পদ্ধতি। অন্তত তিনটি কাটা হলে জবাই শুদ্ধ হবে। (হেদায়া: ৪/৪৩৭)
ধাপ ৬- জবাইয়ের পর দোয়া: আরবি: اللَّهُمَّ تَقَبَّلْهُ مِنِّي كَمَا تَقَبَّلْتَ مِنْ حَبِيبِكَ مُحَمَّدٍ وَخَلِيلِكَ إِبْرَاهِيمَ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা তাকাব্বালহু মিন্নি কামা তাকাব্বালতা মিন হাবিবিকা মুহাম্মাদিঁও ওয়া খালিলিকা ইবরাহিম।
অর্থ: হে আল্লাহ! এটি আমার পক্ষ থেকে কবুল করুন, যেমন কবুল করেছিলেন আপনার হাবিব মুহাম্মদ (সা.) ও বন্ধু ইবরাহিম (আ.)-এর পক্ষ থেকে।
একাধিক শরিক থাকলে 'মিন্নি'র স্থলে 'মিন্না' বলতে হবে এবং মনে মনে শরিকদের নিয়ত করতে হবে।

কিছু জরুরি মাসয়ালা

পশুকে কষ্ট না দেওয়া: প্রাণ সম্পূর্ণ বের হওয়ার আগে চামড়া ছাড়ানো বা হাড় কাটা শরিয়তে নিষিদ্ধ; এতে পশুর তীব্র কষ্ট হয়।
নিয়ত: মুখে নিয়ত উচ্চারণ জরুরি নয়, মনে মনে আল্লাহর সন্তুষ্টির সংকল্পই যথেষ্ট।
পরিষ্কার স্থানে জবাই: পরিচ্ছন্ন স্থানে জবাই করা এবং রক্ত নির্দিষ্ট স্থানে পড়ার ব্যবস্থা করা সুন্নাহর অংশ।

মাংস বণ্টনের বিধান

কোরবানির মাংস তিন ভাগে ভাগ করা মোস্তাহাব- এক ভাগ নিজের জন্য, এক ভাগ আত্মীয়-প্রতিবেশীর জন্য এবং এক ভাগ গরিব-মিসকিনদের জন্য। তবে পুরো মাংস নিজে রেখে দেওয়াও জায়েজ, তবে কিছু অংশ গরিবদের দেওয়া উত্তম। (ফতোয়ায়ে শামি: ৫/৩০৪)
কোরবানির চামড়া বিক্রি করলে সেই অর্থ সদকা করে দিতে হবে, নিজে ব্যবহার করা যাবে না। (হেদায়া: ৪/৪৫৫)

কোরবানি ত্যাগ, আনুগত্য ও আল্লাহর প্রতি পূর্ণ সমর্পণের প্রতীক। সুন্নতি পদ্ধতিতে ও সঠিক দোয়া পাঠের মাধ্যমে জবাই সম্পন্ন করলে এই ইবাদত আল্লাহর দরবারে মকবুল হওয়ার আশা বাড়ে। পাশাপাশি পশুর প্রতি সদয় আচরণ এবং পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখাও কোরবানির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

তথ্যসূত্র: সূরা কাউসার, সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম, সুনানে আবু দাউদ, জামে তিরমিজি, আল-হেদায়া, ফতোয়ায়ে শামি, রদ্দুল মুহতার, ফতোয়ায়ে আলমগিরি

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর