রোববার, ১৬ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

নেপথ্যের কারিগর থেকে বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরামে

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৬ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৫০ পিএম

শেয়ার করুন:

নেপথ্যের কারিগর থেকে বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরামে
ইসমাইল জবিউল্লাহ। ছবি: সংগৃহীত

ক্ষমতাসীন বিএনপির সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী ফোরামে চারজন নতুন সদস্য যুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে সাবেক সচিব মো. ইসমাইল জবিউল্লাহও রয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি নেপথ্যে থেকে বিএনপির রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও নীতিনির্ধারণী নানা বিষয়ে ভূমিকা রাখছিলেন। দলটির নীতি, ভিশন ও নির্বাচন পরিচালনাসংক্রান্ত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ফোরামে পেছনে থেকে কাজ করেছেন তিনি। সেই স্বীকৃতি হিসেবেই এবার তিনি জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন বলে জানা গেছে।

নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা (ক্যাবিনেট মন্ত্রীর পদমর্যাদায়) হিসেবে দায়িত্ব পাওয়া ইসমাইল জবিউল্লাহকে তার দীর্ঘ প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা, আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও পর্দার আড়ালের নীতি নির্ধারণী অবদানের পুরস্কারস্বরূপ স্থায়ী কমিটির শীর্ষ পদে স্থান দেওয়া হয়।

রাজনৈতিক ও গবেষণা কার্যক্রমে নেপথ্যে ছিলেন জবিউল্লাহ

সরকারি চাকরি থেকে অবসরের পর ইসমাইল জবিউল্লাহ বিএনপির নীতি নির্ধারণী প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে যাচ্ছেন। ২০১৬ সাল থেকে তিনি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য, কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটি-২০২৬-এর প্রধান সমন্বয়ক এবং পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

দলীয় গবেষণা কার্যক্রমেও তিনি ভূমিকা রেখেছেন বলে জানা গেছে। তিনি বিএনপি সমর্থিত গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট রিসার্চ সেন্টার’ (বিএনআরসি)-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) এবং ‘পলিসি ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রিসার্চ সোসাইটি’ (পিএমআরএস)-এর চেয়ারম্যান।

বিএনপির মূল রাজনৈতিক রুপরেখা ভিশন-২০৩০, ২৭ দফা, রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতের ৩১ দফা এবং ২০২৬ সালের নির্বাচনি ইশতেহার প্রণয়নে তিনি মূল সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় গঠিত সংস্কার বিষয়ক ঐকমত্য কমিশন এবং প্রশাসনিক ও নির্বাচন কমিশন সংস্কার সংক্রান্ত দলীয় কমিটিতেও তিনি বিএনপির পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। বর্তমানে তিনি ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স অব এশিয়ান পলিটিক্যাল পার্টিজের (আইসিএপিপি) স্থায়ী কমিটিতে বিএনপির প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

জন্ম, শিক্ষা ও সামাজিক অবদান

মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ ১৯৫০ সালে তৎকালীন নোয়াখালী জেলার (বর্তমান লক্ষ্মীপুর) রামগতি থানার চরকাদিরা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা মরহুম সুজাউদ্দিন আহমেদ লক্ষ্মীপুর সামাদ একাডেমীর শিক্ষক ছিলেন। পরে তার পরিবার লক্ষ্মীপুর সদরের শমসেরবাদে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে।

আরও পড়ুন

বিএনপির স্থায়ী কমিটিতে কে এই ইসমাইল জবিউল্লাহ ও ফরহাদ হালিম?

কে হচ্ছেন বিএনপির পরবর্তী মহাসচিব?

তুখোড় ছাত্র নেতা থেকে বিএনপির স্থায়ী কমিটিতে দুই নেতা

তিনি ১৯৬৫ সালে লক্ষ্মীপুর সামাদ একাডেমি থেকে মাধ্যমিক (এসএসসি) পরীক্ষায় কুমিল্লা বোর্ডে ১২তম এবং ১৯৬৭ সালে লক্ষ্মীপুর কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিকে (এইচএসসি) ৩য় স্থান অর্জন করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৭০ সালে ইংরেজি সাহিত্যে বিএ (অনার্স) এবং ১৯৭১ সালে (অনুষ্ঠিত ১৯৭৩) স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। পরে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি এলএলবি পরীক্ষায় প্রথম স্থান অর্জন করেন। এরপর তিনি যুক্তরাজ্যের বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং জাপানের এডিবি (ADB) ইনস্টিটিউট থেকে উচ্চতর শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ নেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মহসিন হলের প্রথম ব্যাচের আবাসিক ছাত্র হিসেবে ইসমাইল জবিউল্লাহ ১৯৬৭ সালে হল ছাত্র সংসদে প্রতিনিধি নির্বাচিত হন। লক্ষ্মীপুরে শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রসারে তিনি ‘কাকলি’ ও ‘ত্রিধারা’ নামের সাহিত্য-সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং ‘ত্রিধারা শিক্ষা নিকেতন’ প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

বর্ণাঢ্য সিভিল সার্ভিস ও কূটনৈতিক জীবন

১৯৭৩ সালে চৌমুহনী কলেজে ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক হিসেবে পেশাগত জীবন শুরু করেন তিনি। পরে নোয়াখালী সরকারি কলেজেও শিক্ষকতা করেন। ১৯৭৩ সালের প্রথম নিয়মিত সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ১৯৭৭ সালে সহকারী কমিশনার পদে চট্টগ্রামে জেলা প্রশাসনে যোগ দেন।

দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট, বিশেষ ট্রাইব্যুনাল ম্যাজিস্ট্রেট এবং সামরিক আইন আদালতের বিচারকের দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া যোগাযোগ, স্বরাষ্ট্র, স্থানীয় সরকার ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রীদের একান্ত সচিব (পিএস), ভূঞাপুরের ইউএনও এবং ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

তিনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপসচিব, নির্বাচন কমিশনের যুগ্ম সচিব এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) অতিরিক্ত সচিবের দায়িত্ব সামলান। পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহায়তাপুষ্ট ‘প্রমোট’ প্রকল্পের পরিচালক হিসেবে নারী শিক্ষার উন্নয়নে ভূমিকা রাখেন। পরবর্তীতে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়, রাষ্ট্রপতির কার্যালয়, ইআরডি এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে ২০০৮ সালে সরকারি চাকরি থেকে অবসরে যান।

১৯৯৩ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত ব্রুনাই ও মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ হাই কমিশনে শ্রম কাউন্সিলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। এছাড়া তিনি আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা (আইএমও)-এর সদস্য (২০০৩–২০০৪), ওয়ার্ল্ড মেরিটাইম ইউনিভার্সিটির গভর্নর, ইসলামিক উন্নয়ন ব্যাংকের (আইডিবি) নির্বাহী পরিচালক (২০০৪–২০০৬) এবং বিশ্বব্যাংক, এডিবি ও আইএমএফ-এর বিকল্প গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

অবসরোত্তরকালে তিনি বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, আইডিসিওএল ও আইআইএফসির চেয়ারম্যান এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইংরেজি বিভাগ অ্যালামনাই সোসাইটির সভাপতি ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হিসেবে যুক্ত আছেন।

বিইউ/জেবি

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর