ক্ষমতাসীন বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির শূন্য পদে কারা আসতে পারেন সেই আলোচনা চলছে দীর্ঘদিন ধরে। এর মধ্যেই চার নেতাকে স্থায়ী কমিটির সদস্য পদে নিয়োগ দিয়েছেন দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। চার নেতার মধ্যে দুজন বিএনপির রাজনীতিতে আলোচিত মুখ। দেশের ছাত্ররাজনীতিতে তাদের রয়েছে বর্ণাঢ্য অতীত। অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী ও আমানুল্লাহ আমান বিএনপির রাজনীতির দীর্ঘদিনের পরিচিত মুখ।
তবে স্থায়ী কমিটিতে জায়গা পাওয়া সাবেক সচিব মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ ও ক্যানসার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. ফরহাদ হালিম ডোনারকে নিয়ে অনেকের মনে কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছে। মূলধারার রাজনীতিতে দীর্ঘদিন সক্রিয়ভাবে দৃশ্যমান না থাকার পরও তারা কীভাবে স্থায়ী কমিটিতে স্থান করে নিলেন সেটা নিয়ে কারও কারও মনে প্রশ্নও দেখা দিয়েছে। তবে বিএনপির সূত্র জানায়, প্রশাসন ও চিকিৎসা পেশায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি এই দুই নেতা বিএনপির সঙ্গে সম্পৃক্ত দীর্ঘদিন ধরে। তারা বিভিন্ন সময় দলের হয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও পালন করেছেন। তাদের নিজ নিজ যোগ্যতা বলেই দলের শীর্ষ নেতৃত্বের দৃষ্টি কাড়তে সক্ষম হয়েছেন।
বিএনপির ১৯ সদস্যের স্থায়ী কমিটিতে আগে থেকে ১৩ জন রয়েছেন। তারা হলেন—তারেক রহমান, খন্দকার মোশাররফ হোসেন, রফিকুল ইসলাম মিয়া, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, সেলিমা রহমান, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু ও এ জেড এম জাহিদ হোসেন।
স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য জমির উদ্দিন সরকার গত ১২ জুলাই মারা গেছেন। নতুন চার সদস্য মিলিয়ে এখন সদস্য সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৭ জনে। তাদের মধ্যে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি হলে তাকে দলীয় পদ ছেড়ে দিতে হবে। সেক্ষেত্রে সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী ফোরামে নতুন করে আরও তিনজনের যাওয়ার পথ খুলবে।
কে এই মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ?
সাবেক সচিব মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের পূর্ণমন্ত্রীর পদমর্যাদায় উপদেষ্টা হিসেবেও দায়িত্ব পেয়েছেন। তার গ্রামের বাড়ি লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলার চরকাদিরা ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের মোক্তার বাড়ি।
আরও পড়ুন
এক পদের ‘ধাক্কা’, বিএনপিতে নানা সমীকরণ
রাজপথের লড়াই পেরিয়ে বঙ্গভবনের পথে ‘সজ্জন’ মির্জা ফখরুল
দীর্ঘ প্রশাসনিক জীবনে তিনি সরকারের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগে সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০০৫ সালে তৎকালীন বিএনপি সরকারের নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব ছিলেন তিনি। এর আগে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
অবসর নেওয়ার পর বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হন ইসমাইল জবিউল্লাহ। বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। স্থায়ী কমিটিতে জায়গা পাওয়ার আগে বিএনপির উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটিরও গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন তিনি। প্রশাসনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ততার সমন্বয়ে এবার বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরামে স্থান পেলেন সাবেক এই আমলা।
কে এই অধ্যাপক ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার?
অধ্যাপক ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার মূলত চিকিৎসক ও ক্যানসার বিশেষজ্ঞ হিসেবে পরিচিত। দীর্ঘ পেশাগত জীবনে ক্যানসার চিকিৎসা, চিকিৎসা শিক্ষা ও গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন তিনি।
জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের প্রথম প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ডা. ডোনার। দেশে আধুনিক ক্যানসার চিকিৎসার প্রসারেও তাঁর ভূমিকার কথা বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় এসেছে।
চিকিৎসা পেশার পাশাপাশি পেশাজীবী সংগঠন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) সঙ্গে দীর্ঘদিন সম্পৃক্ত তিনি। সংগঠনটির সাবেক আহ্বায়ক এবং বর্তমান প্রধান উপদেষ্টা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
পেশাগত পরিচয়ের আড়ালে বিএনপির রাজনীতিতেও দীর্ঘদিন সক্রিয় ছিলেন ফরহাদ হালিম ডোনার। তিনি ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক এবং বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
চিকিৎসা ও রাজনীতির পাশাপাশি উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রেও দায়িত্ব পালন করছেন ডা. ডোনার। চলতি বছরের জুলাইয়ে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য মনোনীত হন।
বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটি সাধারণত দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত ও মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয় নেতাদের নিয়ে গঠিত হলেও ইসমাইল জবিউল্লাহ ও ফরহাদ হালিম ডোনারের ক্ষেত্রে চিত্রটি কিছুটা ভিন্ন। একজন দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক কর্মকর্তা, অন্যজন চিকিৎসা ও পেশাজীবী সংগঠনের পরিচিত মুখ। তবে দুজনই বিএনপির সঙ্গে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক সম্পৃক্ততা বজায় রেখেছেন। দলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দায়িত্ব পালন, নির্বাচন পরিচালনা, পেশাজীবী সংগঠনের নেতৃত্ব এবং নীতিনির্ধারণী কাজে সম্পৃক্ততার অভিজ্ঞতা তাদের নতুন দায়িত্ব পাওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জেবি




