রোববার, ১৬ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

কে হচ্ছেন বিএনপির পরবর্তী মহাসচিব?

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৬ আগস্ট ২০২৬, ০৬:৩১ পিএম

শেয়ার করুন:

কে হচ্ছেন বিএনপির পরবর্তী মহাসচিব?
বিএনপির একটি কর্মসূচির মুহূর্ত। ফাইল ছবি

দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হতে চলেছেন বিএনপির বর্তমান মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে সামনে রেখে দলীয় প্রার্থী হিসেবে সরকারি দল জ্যেষ্ঠ এবং ক্লিন ইমেজের এই নেতার নামই ঘোষণা করেছে। 

যেহেতু এই নির্বাচনে ভোট দেবেন সংসদ সদস্যরা এবং যেহেতু বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিএনপি সরকার গঠন করেছে, তাই মির্জা ফখরুলের রাষ্ট্রপতি হওয়ার পথে একটি আনুষ্ঠানিকতাই বাকি। তা হলো ২০ আগস্টের নির্বাচন। নিয়ম অনুযায়ী, এর পরই শূন্য হবে বিএনপির মহাসচিবের পদটি। 

আরও পড়ুন: বিএনপির সব পদ ছাড়লেন মির্জা ফখরুল  

ফলে এই শূন্য পদে আগামীতে কে বসতে চলেছেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পাশাপাশি সেটি নিয়েও এখন চলছে নানা আলোচনা।

প্রথমে ভারপ্রাপ্ত তারপর কাউন্সিলের মাধ্যমে মহাসচিব নির্বাচিত হওয়ার পর প্রায় ১৬ বছর ধরে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ এই পদে আসীন ছিলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তার এই পদে ভবিষ্যতে কে দায়িত্ব পালন করবেন, সেই প্রশ্নে দলের ভেতর কিংবা বিভিন্ন গণমাধ্যমে কয়েকজন নেতার নামই ঘুরেফিরে আসছে।

2
বিএনপির বর্তমান মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর

তবে বিএনপির একাধিক নেতা জানিয়েছেন, দলের পক্ষ থেকে এখনো পর্যন্ত কাউকে মহাসচিব পদের জন্য চূড়ান্ত বা ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়নি।

বিএনপির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, দলের স্থায়ী মহাসচিব নির্বাচিত হন জাতীয় কাউন্সিলের মাধ্যমে। তার আগে পর্যন্ত কোনো নেতা সাময়িকভাবে বা ভারপ্রাপ্ত হিসাবে মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করতে পারেন।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান জানিয়েছেন, এই মুহূর্তে যিনি সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব আছেন রুহুল কবির রিজভী, দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী তিনিই ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হবেন।

আরও পড়ুন: রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুলের মনোনয়নপত্র জমা দিলেন মঈন খান

মির্জা ফখরুল ইসলামের আলমগীরের স্থলে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে রিজভীর বিষয়টি দলের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হলেও পূর্ণাঙ্গ দায়িত্ব পাওয়ার বিষয়টি এখনো নিশ্চিত করে বলতে পারেনি কেউ।

কেননা, এক্ষেত্রে রিজভী ছাড়াও আরও দুই-তিনজনের নাম দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে নানা আলোচনায় শোনা গেছে। যদিও সে বিষয়গুলো নিয়ে দলীয় হাইকমান্ড বা স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এখনো আলোচনা হয়নি।

বিএনপির সূত্রগুলো বলছে, বিএনপির জাতীয় কাউন্সিলে কিংবা সেই সময়ে পূর্ণাঙ্গভাবে কাউকে মহাসচিবের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। তবে আর আগ পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে রুহুল কবির রিজভী দায়িত্ব পালন করতে পারেন।

3
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী

বিএনপির সিনিয়র এই যুগ্ম মহাসচিব বলেছেন, ‘আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এখনো আসেনি। পার্টি যেটা সিদ্ধান্ত নেবে, সেটার জন্যই অপেক্ষা করে আছি।’

তবে বিএনপির নেতারা আভাস দিয়েছেন, দলীয় ফোরামে আলোচনা হলেও মহাসচিব কে হবেন, সেটা মূলত নির্ভর করবে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সিদ্ধান্তের ওপরে।

প্রথমে ভারপ্রাপ্ত, তারপর পূর্ণাঙ্গ দায়িত্ব?

বিএনপির সিনিয়র নেতা খন্দকার দেলোয়ার হোসেন দলটির মহাসচিবের দায়িত্ব পেয়েছিলেন ২০০৭ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে। ২০১১ সালে খন্দকার দেলোয়ার যখন মারা যান, তখন দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ছিলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

আরও পড়ুন: রাজপথের লড়াই পেরিয়ে বঙ্গভবনের পথে ‘সজ্জন’ মির্জা ফখরুল

দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যুজনিত কারণে পদ শূন্য হলে তখন ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব করা হয় মির্জা ফখরুলকে। পরে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত হিসেবেই দায়িত্ব পালন করেন তিনি। পরে ২০১৬ সালের জাতীয় কাউন্সিলে তিনি পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব নির্বাচিত হন। তিনি রাষ্ট্রপতি হলে পদটি শুন্য হবে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এখনো কিন্তু প্রার্থী। তিনি এখনো নির্বাচিত হননি। সেই হিসেবে এখনো মহাসচিব পদটা শূন্য হয়নি। যখন তিনি শপথ নিবেন বা নির্বাচনে জিতে যাবেন, তখন তার এমপি পদসহ সব পদই শূন্য হবে।’

4
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান

দলের কয়েকটি সুত্র বলছে, প্রাথমিকভাবে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। তারপর দল থেকে পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব যখন দেওয়া হবে, তখন এই পদে রুহুল কবির রিজভী থাকতেও পারেন বা তার পরিবর্ততে অন্য কাউকেও দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে।

এ ব্যাপারে রিজভী বলেন, ‘কখনো কাউন্সিলের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব পদ দেওয়া হয়েছে, কখনো আবার আবার কাউন্সিল ছাড়াও মহাসচিব পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এটার সমস্ত ক্ষমতা দেওয়া আছে চেয়ারম্যানকে। এই দায়িত্ব কাউন্সিল থেকেই দেওয়া হয়েছে।’

আরও পড়ুন: তুখোড় ছাত্র নেতা থেকে বিএনপির স্থায়ী কমিটিতে দুই নেতা

২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত নানান চড়াই উৎরাইয়ের মধ্য দিয়ে গেছে বিএনপির রাজনীতি। মাঠে থেকে যেসকল রাজনীতিবিদ দলীয় দায়িত্ব পালন করছেন, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের পর সেখানে নাম ছিল রুহুল কবির রিজভীর।

সেই হিসেবে দলীয় কর্মী সমর্থক থেকে শুরু করে সিনিয়র নেতাদেরও অনেকেই মনে করছেন, প্রাথমিকভাবে মহাসচিব পদে রিজভীর নামটিই সবচেয়ে এগিয়ে।

যদিও কোনো কোনো গণমাধ্যমের খবরে স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদসহ আরও কয়েকজন সিনিয়র নামও সম্ভাব্য হিসেবে সামনে আসছে। সেখানে বলা হয়েছে, সালাহউদ্দিন আহমদকে মন্ত্রণালয় বদলে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় দেওয়া হতে পারে। অতীতে রাজনৈতিক দলগুলোর মহাসচিব বা সাধারণ সম্পাদককে এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেখা গেছে।

5
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ

আবার কোনো কোনো গণমাধ্যমে সম্ভাব্য মহাসচিব হিসাবে দুই যুগ্ম মহাসচিব শহীদউদ্দিন চৌধুরী অ্যানি ও হাবিব উন নবী খান সোহেলের নামও এসেছে।

তবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান বলেন, ‘বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন নাম আমরা শুনি। কিন্তু পার্টির ভেতর তো এ নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। এই যে নামগুলো আসে, নিউজগুলো আসে, নেতাকর্মীরা যা বলতে থাকে, সেই পরিপ্রেক্ষিতে গণমাধ্যম বলে থাকে।’

আরও পড়ুন: রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আগের ৭০ অনুচ্ছেদের প্রশ্ন অবান্তর: গয়েশ্বর

তিনি আরও বলেন, ‘মহাসচিব হওয়ার মতো যোগ্য তো অনেকেই আছেন। প্রশ্নটা হলো- নিয়ম অনুযায়ী আপাতত রুহুল কবির রিজভী হওয়ার কথা। প্রোটোকল অনুযায়ী উনি আসছেন। যদি অন্য কিছু হয়, সেটা পরের ব্যাপার।’

মহাসচিব পদে কে কতদিন ছিলেন?

বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামোতে মহাসচিব পদটি গুরুত্বপূর্ণ। দলের চেয়ারপারসনের পর সাংগঠনিক ও নির্বাহী কর্মকাণ্ডে মহাসচিবের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। যে কারণে মির্জা ফখরুলের স্থলাভিষিক্ত কে হবেন, সেই প্রশ্নের সঙ্গে এটিও আসছে যে, তিনি কি পূর্ণাঙ্গ নাকি ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব পাবেন শুরুতে।

6
বিএনপির দুই যুগ্ম মহাসচিব শহীদউদ্দিন চৌধুরী অ্যানি ও হাবিব উন নবী খান সোহেল

যদিও স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান বলেছেন, ‘আগামীতে যাকে মহাসচিবের দায়িত্ব দেওয়া হবে, তাকে ভারপ্রাপ্ত নাকি পূর্ণাঙ্গ দায়িত্ব দেওয়া হবে, সেটি নিয়ে দলের হাইকমাণ্ডে কোনো আলোচনা হয়নি।’

১৯৭৮ সালে বিএনপি প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে একাধিক প্রবীণ ও প্রভাবশালী নেতা দলের মহাসচিব পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৭৮ সাল থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত বিএনপির প্রথম মহাসচিব ছিলেন অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী।

এরপর মহাসচিব হন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি ১৯৮৬ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত প্রায় এক বছর মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ১৯৮৭ সালে মহাসচিব করা হয় কে এম ওবায়দুর রহমানকে। এক বছরের মতো দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

আরও পড়ুন: রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অলি আহমদের মনোনয়নপত্র জমা

১৯৮৮ সালে আবদুস সালাম তালুকদারকে বিএনপির মহাসচিব করা হয়। তিনি ১৯৮৮ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত প্রায় আট বছর এ পদে ছিলেন।

১৯৯৬ সালের জুনে বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্ব পান আবদুল মান্নান ভূঁইয়া। এর আগে তিনি দলটির যুগ্ম মহাসচিব ছিলেন। ওয়ান ইলেভেনের সরকারের সময় ২০০৭ সালে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।

167516
বর্তমান ক্ষমতাসীন বিএনপির দলীয় লোগো

আবদুল মান্নান ভূঁইয়ার মৃত্যুর পর ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব করা হয় খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনকে। ২০১১ সালের ১৬ মার্চ মৃত্যুর আগ পর্যন্ত প্রায় চার বছর বিএনপির মহাসচিব ছিলেন তিনি।

খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব করা হয় তৎকালীন সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে। দলের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় এ পদে ছিলেন তিনি।

আরও পড়ুন: এক পদের ‘ধাক্কা’, বিএনপিতে নানা সমীকরণ

২০১১ সালে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০১৬ সালের জাতীয় কাউন্সিলে পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল। গত ১৩ আগস্ট তাকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী ঘোষণা করেছে বিএনপি। আগামী ২০ আগস্ট এমপিদের ভোটে নির্বাচিত হলে একইসঙ্গে বিএনপির মহাসচিব ও স্থায়ী কমিটির একটি পদ শূন্য হবে। 

সেইসঙ্গে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী পদের পাশাপাশি ঠাকুরগাঁওয়ের যে আসন থেকে মির্জা ফখরুল সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন, সেই আসনটিও শূন্য হতে যাচ্ছে। পরে সেখানে উপ-নির্বাচনের আয়োজন করবে নির্বাচন কমিশন। সূত্র: বিবিসি বাংলা

এএইচ

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর