বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ঢাকা

প্রধানমন্ত্রীর প্রতিবেশী হচ্ছেন বিরোধীদলীয় নেতা?

বোরহান উদ্দিন
প্রকাশিত: ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৮:৫৯ পিএম

শেয়ার করুন:

প্রধানমন্ত্রীর প্রতিবেশী হচ্ছেন বিরোধীদলীয় নেতা?
সংস্কারকাজ চলছে রাজধানীর মিন্টোরোডের বিরোধীদলীয় নেতার বাসভবনের (বামে) ও রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনা। ছবি: সংগৃহীত

  • যমুনায় থাকবেন প্রধানমন্ত্রী, পাশেই প্রস্তুত হচ্ছে বিরোধীদলীয় নেতার বাসা
  • ২৫ বছরের মধ্যে কেউ ওঠেননি এই বাংলোয়
  • এবার কি ভাঙবে ২৯ নম্বর বাড়ির নীরবতা?

রাজধানী ঢাকার অভিজাত ও সুরক্ষিত এলাকা মিন্টো রোড। রাস্তার পাশে সারিবদ্ধভাবে রয়েছে সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বাংলো ও মন্ত্রীদের বাসভবন। এখানকার বেশিরভাগ ভবনে মানুষের বসবাস ও যাতায়াত থাকলেও অনেকটাই নিস্তব্ধ ২৯ নম্বর বাড়িটি। আড়াই একর জায়গার ওপর ব্রিটিশ আমলে নির্মিত লাল রঙের এই দোতলা ভবনটি সংসদের বিরোধীদলীয় নেতার জন্য নির্ধারিত। কিন্তু ২০০১ সালে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়া এই ভবন ছাড়ার পর গত ২৫ বছরে আর কোনো নেতা এখানে ওঠেননি।

এদিকে সহসাই মন্ত্রিপাড়ায় অবস্থিত রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় উঠতে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তবে বিরোধীদলীয় নেতা জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান তাঁর জন্য নির্ধারিত এই বাসায় থাকবেন কি না, সে বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত জানা যায়নি। তিনি এখানে উঠলে প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতা কাছাকাছি বসবাস করবেন।

জামায়াতের দলীয় সূত্র বলছে, দলটির আমির বর্তমানে বসুন্ধরার বাসায় থাকেন। বিরোধীদলীয় নেতার জন্য নির্ধারিত বাসভবনে তাঁর ওঠার সম্ভাবনা কম।

তবে বিরোধীদলীয় নেতার বসবাস নিয়ে সিদ্ধান্ত না এলেও গণপূর্ত অধিদপ্তর সংশ্লিষ্টদের দ্রুত সময়ের মধ্যে বাসাটি প্রস্তুত করতে বলেছে। সে অনুযায়ী কাজ চলছে।


বিজ্ঞাপন


picture

দুই যুগের বেশি সময় ধরে কেউ বসবাস না করায় ভবনটি তার আগের সৌন্দর্য হারিয়েছে। দীর্ঘদিন ফাঁকা থাকায় আশপাশে বসবাসরত সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মচারীরা ভবনের খোলা জায়গায় নানা ধরনের সবজি চাষ করছেন। কেউ কেউ মুরগিও পালন করছেন।

ভবন সংস্কার বিষয়ে জানতে চাইলে গণপূর্ত অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা বলেন, বাসার ভেতরের কাজ অনেকাংশে শেষ। বাইরের সংস্কারকাজ চলছে। বিরোধীদলীয় নেতা উঠবেন কি না জানা নেই। তবে ভবন প্রস্তুত রাখতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পুরো প্রস্তুতিতে কিছুটা সময় লাগবে।

ড. ইউনূস চলে গেলে সংস্কার হবে যমুনা

এদিকে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনাকেই প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন হিসেবে বেছে নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সরকার-প্রধানের নিরাপত্তা এবং সচিবালয় ও কার্যালয়ে যাতায়াতের সুবিধা বিবেচনায় রাজধানীর হেয়ার রোডের এই ভবনটি নির্বাচন করা হয়েছে।

সরকারি আবাসন পরিদফতর সূত্রে জানা গেছে, সদ্যবিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বর্তমানে যমুনায় অবস্থান করছেন। আগামী শুক্র অথবা শনিবার তিনি বাসভবনটি ছেড়ে দেবেন বলে কথা রয়েছে।  

গণপূর্ত অধিদফতরের প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরী জানান, প্রধানমন্ত্রী যমুনায় থাকার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছেন। সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ভবনটি ছাড়ার পরপরই সংস্কারকাজ শুরু হবে এবং তা শেষ হলেই প্রধানমন্ত্রী সেখানে উঠবেন।

জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী বর্তমানে গুলশানের বাসভবন থেকে দাফতরিক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। তবে আসন্ন ঈদুল ফিতরের শুভেচ্ছা বিনিময় এবং রমজানের ইফতার অনুষ্ঠান যমুনায় আয়োজন করার ইচ্ছার কথা জানানো হয়েছে। সেভাবে করে ড. ইউনূস চলে গেলে দ্রুত সংস্কার শেষ করা হবে যমুনা।

সদ্যসমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর রাজনৈতিক দৃশ্যপট বদলে গেছে। বিএনপি জোট ২১২টি আসন পেয়ে সরকার গঠন করেছে। অন্যদিকে ৭৭টি আসন নিয়ে প্রধান বিরোধী দল হয়েছে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোট। বিরোধীদলীয় নেতা হয়েছেন ডা. শফিকুর রহমান। তিনি সরকারি এই ভবনে থাকতে আগ্রহী কি না, তার ওপরই নির্ভর করছে বাড়িটির ভবিষ্যৎ।

নির্বাচনের আগে ও পরে জামায়াতের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, তাদের সংসদ সদস্যরা শুল্কমুক্ত গাড়ি ও প্লট নেবেন না। তবে মিন্টো রোডের এই ভবনটি বিরোধীদলীয় নেতার জন্য নির্ধারিত সরকারি বাসভবন।

নিরাপত্তার বিবেচনায় বসুন্ধরার বাসার তুলনায় মিন্টো রোডের ২৯ নম্বর বাড়িটিকে বেশি উপযুক্ত হিসেবে ধরা হয়। বাংলোর পশ্চিমে প্রধান নির্বাচন কমিশনার, বিটিসিএল চেয়ারম্যান ও একজন বিচারপতির বাসভবন রয়েছে। পাশেই রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনা। সেখানে বর্তমানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস বসবাস করছেন। শিগগিরই সেখানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উঠবেন।

এ ছাড়া ভবনের পূর্ব পাশে ডিএমপি পুলিশ কমিশনার ও একজন বিচারপতির বাসভবন রয়েছে। উত্তরে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, মুখ্য সচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক, ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার, ডিএমপি কমিশনার, একজন বিচারপতি ও ঢাকা জেলা প্রশাসকের বাসভবন। অল্প দূরত্বে রয়েছে ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগের কার্যালয়।

দুই যুগেও কেউ ওঠেননি ২৯ নম্বর বাড়িতে

মিন্টো রোডের ২৯ নম্বর সরকারি দোতলা লাল ভবনটি বিরোধীদলীয় নেতার জন্য বরাদ্দ। তবে গত ২৫ বছরে কেউ সেখানে বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে বসবাস করেননি। ভবনটিতে সবশেষ ছিলেন প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়া। ২০০১ সালে তিনি এটি ছাড়ার পর আর কেউ ওঠেননি।

তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা জাতীয় পার্টির রওশন এরশাদ বাড়িটি বরাদ্দ চেয়ে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেন। তবে তাঁর নামে বাড়িটি বরাদ্দ দেওয়া হয়নি।

২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বাড়িটি বরাদ্দের জন্য আবেদন করেন। তখন বাড়িটি তাঁর নামে বরাদ্দ দেওয়া হলেও তিনি সেখানে ওঠেননি।

picture

২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিরোধীদলীয় নেতা জি এম কাদেরও বাড়িটি বরাদ্দ চেয়ে আবেদন করেন। তিনি উঠতে পারেনএমন বিবেচনায় তখন ভবনটি নতুন করে সংস্কার করা হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি আর ওঠেননি।

যেমন আছে বিরোধীদলীয় নেতার বাসভবন

দীর্ঘদিন বসবাস না থাকায় বাড়ির চারপাশ অনেকটাই বনজঙ্গলে পরিণত হয়েছে। ভবনের ভেতরে রং উঠে গেছে, কোথাও কোথাও পলেস্তারা খসে পড়েছে। গণপূর্ত অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, নিচতলায় ছয়টি কক্ষ ও চারটি ওয়াশরুম এবং দোতলায় চারটি কক্ষ ও চারটি ওয়াশরুম রয়েছে।

ভেতরে কোনো আসবাব নেই। বিরোধীদলীয় নেতা উঠলে তাঁর চাহিদা অনুযায়ী আসবাব সরবরাহ করা হবে। প্রস্তুতির অংশ হিসেবে নতুন টাইলস ও কমোড বসানো হয়েছে।

বিরোধীদলীয় নেতার বাসভবনের জন্য নির্ধারিত তিনজন কর্মচারীর মধ্যে মালি লাল মিয়া, পরিচ্ছন্নতাকর্মী কামাল হোসেন ও পানির লাইনের মিস্ত্রি আকরাম হোসেনের পরিবার বাড়ির পেছনের অংশে থাকে। এ ছাড়া আরও চারটি পরিবার অস্থায়ীভাবে সেখানে বসবাস করছে।

বাড়ি প্রস্তুতের পাশাপাশি এসব পরিবারকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়াও চলছে।

ভবনের কাজ তদারকির সঙ্গে যুক্ত গণপূর্তের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, বাড়ির ভেতরের বেশিরভাগ কাজ শেষ। বাইরে রাস্তা মেরামত ও কিছু রঙের কাজ বাকি। বিরোধীদলীয় নেতা এখানে উঠলে তাঁর নির্দেশনা অনুযায়ী আসবাব সরবরাহ করা হবে।

বিইউ/এআর

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর