দেশের রাজনীতিতে আবারো আলোচনার কেন্দ্রে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। বিশেষ করে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্মরণকালের সেরা সাফল্য পাওয়ায় দলটি নতুন করে নজরে এসেছে। শীর্ষ নেতৃত্বের পাশাপাশি আওয়ামী লীগ আমলে ফাঁসির রশিতে ঝুলে প্রাণ হারানো কয়েকজন জামায়াত নেতার সন্তানদের এমপি হওয়ার বিষয়টি নিয়েও আছে নানা আলোচনা। তবে এই আলোচনায় অনুপস্থিত এক গুরুত্বপূর্ণ নাম-জামায়াতের প্রথম ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত নেতা আব্দুল কাদের মোল্লার পরিবার। সংগঠনের জন্য যিনি জীবন দিয়েছেন, রাজনৈতিক উত্থানের এই সময়ে তার পরিবার কেন সামনে আসছে না-তা প্রশ্ন তুলছেন দলের কেউ কেউ।
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে প্রায় ১৬ বছর দোর্দণ্ড প্রতাপে দেশ শাসন করে আওয়ামী লীগ সরকার। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে জামায়াতের কয়েকজন শীর্ষ নেতার ফাঁসি কার্যকর করে। এর মধ্যে প্রথম ফাঁসি কার্যকর হয় আব্দুল কাদের মোল্লার। পরবর্তীতে মুহাম্মদ কামারুজ্জামান, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, মতিউর রহমান নিজামী এবং মীর কাসেম আলীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। সর্বশেষ কারাগারে নির্যাতনের শিকার হয়ে শহীদ হন মাওলানা দেলওয়ার হোসাইন সাঈদী।
বিজ্ঞাপন
ছাত্র-জনতার তীব্র আন্দোলনের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামীর ব্যাপক উত্থান ঘটে। তার প্রমাণ মেলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে দলটির প্রার্থীরা ৬৮টি আসনে জয় পায়। এসব নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যের মধ্যে রয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রয়াত আমির মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর ছেলে ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন। তিনি পাবনা-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।
এ ছাড়া পিরোজপুর-১ (পিরোজপুর সদর, ইন্দুরকানী ও নাজিরপুর) আসন থেকে সাবেক নায়েবে আমির ও সাবেক সংসদ সদস্য মাওলানা দেলওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছোট ছেলে মাসুদ সাঈদী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।
ঢাকা-১৪ আসন থেকে জামায়াতের সাবেক কেন্দ্রীয় নির্বাহী সদস্য মীর কাসেম আলীর ছেলে ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেম আরমানও সংসদে জায়গা করে নিয়েছেন।
বিজ্ঞাপন
তবে এবারের নির্বাচনে ফাঁসি কার্যকর হওয়া মুহাম্মদ কামারুজ্জামান ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের কোনো সন্তান সরাসরি নির্বাচনে অংশ নেননি। যদিও উচ্চকক্ষে আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের ছেলে আলী আহসান মাবরুরকে ঘিরে আলোচনা রয়েছে। অন্যদিকে সংরক্ষিত নারী আসনে কাদের মোল্লার মেয়ে আমাতুল্লাহ শারমীনের নাম শোনা যাচ্ছে।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে সংরক্ষিত ৫০টি নারী আসনের মধ্যে মোট প্রাপ্ত আসনের অনুপাতে জামায়াতে ইসলামী ১১টি আসন পাবে। এসব আসনে কারা সংসদে যাবেন-তা নিয়ে দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনা চলছে।
আরও পড়ুন: অবশেষে শপথ নিলেন জামায়াতের এমপিরা
সরাসরি ক্ষমতার রাজনীতিতে অংশগ্রহণ না থাকলেও সাংগঠনিকভাবে আব্দুল কাদের মোল্লার পরিবারের সদস্যদের দলের জন্য কিছু দায়িত্ব পালনের নজির রয়েছে। তার মেয়ে আমাতুল্লাহ শারমীন বর্তমানে জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ বিভাগের সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। একই সঙ্গে তিনি মেডিকেল থানার কর্মপরিষদ সদস্য। জামায়াতে ইসলামী ও মহিলা বিভাগের রাজনীতিতে তিনি একটি পরিচিত নাম। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে তিনি সম্মুখসারির আন্দোলনকারী ছিলেন। ৫ আগস্টের পরও টকশোসহ রাজপথের বিভিন্ন আন্দোলনে তাকে সক্রিয় থাকতে দেখা যায়।
জামায়াতের তৃণমূলের একটি অংশ মনে করছে, কাদের মোল্লা কেবল একজন নেতার উত্তরসূরি নন বরং ‘জুডিশিয়াল কিলিং’ এর শিকার একটি পরিবারের প্রতিনিধি হিসেবেও তার পরিবারের কাউকে সংসদে দেখা উচিত।
তাদের মতে, হাসিনার আমল থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত আব্দুল কাদের মোল্লার পরিবারকে রাজনীতির মূল মঞ্চে খুব একটা দেখা যায়নি। পরিবারটি যেন ধীরে ধীরে আড়ালে চলে যাচ্ছে। সংসদে তার পরিবার থেকে কেউ এলে কাদের মোল্লা সবার মাঝে বেঁচে থাকবেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জামায়াতের মহানগরী পর্যায়ের একজন শীর্ষ পর্যায়ের নেতা ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘আমাদের নেতৃবৃন্দের মধ্যে আব্দুল কাদের মোল্লাকে প্রথম টার্গেট করে ফ্যাসিস্ট সরকার। কারণ কাদের মোল্লা ছিলেন একজন বুদ্ধিজীবী। দলের জন্য তার ত্যাগ-কোরবানি, অবদান অনস্বীকার্য। যদিও আমাদের সংগঠনে পরিবারতন্ত্রের জায়গা নেই। তারপরেও কেন সেই ত্যাগী পরিবারটি আলোচনার বাইরে তা বুঝতেছি না। আমরা যেসব নেতৃবৃন্দকে হারিয়েছি তাদের পরিবারকে সম্মানের জায়গায় রাখতে দেখতে চাই।’
একনজরে কাদের মোল্লা
ফরিদপুর জেলার সদরপুর উপজেলার আমিরাবাদ গ্রামের মরহুম সানাউল্লা মোল্লার ছেলে আব্দুল কাদের মোল্লা ১৯৪৮ সালের ২ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেন।
১৯৬১ সালে আমিরাবাদ ফজলুল হক ইনস্টিটিউশনে অষ্টম শ্রেণির ছাত্র থাকাকালে ছাত্র ইউনিয়নে যোগ দেন। ১৯৬৬ সালে ফরিদপুরের সরকারি রাজেন্দ্র কলেজে বিএসসি প্রথমবর্ষে পড়ার সময় ছাত্র ইউনিয়ন ছেড়ে ইসলামী ছাত্রসংঘে যোগ দেন। এরপর ১৯৬৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যা বিভাগে মাস্টার্সে ভর্তি হন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন।
স্বাধীনতার পর শেখ মুজিবের শাসনকালেই তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অবস্থিত উদয়ন হাইস্কুলে শিক্ষকতা করেন। এরপর ১৯৭৪ সালে সরকারি প্রতিষ্ঠান ইসলামিক ফাউন্ডেশনে চাকরি নেন।
১৯৮০ সালে বাংলাদেশে নিযুক্ত সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূত ফুয়াদ আবদুল হামিদ আল খতিবের ব্যক্তিগত উদ্যোগে ও আর্থিক সহায়তায় দেশে মুসলমান ছেলেমেয়েদের আন্তর্জাতিক মানের একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল প্রতিষ্ঠার জন্য তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে গুলশান ১ নম্বর মার্কেটের দক্ষিণ পাশে ‘মানারাত ইন্টারন্যাশনাল স্কুল’ নামে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন।
১৯৮০ সালে দৈনিক সংগ্রামের নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে যোগদান করেন কাদের মোল্লা। তিনি ঢাকা মহানগর জামায়াতের কর্মপরিষদের সদস্য এবং পরবর্তীতে সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল পদে দায়িত্ব পালন করেন। পরে জামায়াতের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হন।
১৯৮৬ ও ১৯৯৬ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফরিদপুর-৪ (সদরপুর-চরভদ্রাসন) আসনে জামায়াতে ইসলামী থেকে নির্বাচন করেন।
১৯৬৪ সালে আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে আন্দোলনে অংশগ্রহণ এবং বামপন্থীদের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগে তিনি গ্রেফতার হয়েছিলেন। ১৯৮৫ সালের ২২ এপ্রিল স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখায় ঢাকার জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়।
১৯৯৬ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে আওয়ামী লীগ নেতা তোফায়েল আহমদের সঙ্গে একই দিনে গ্রেফতার হন।
২০০৭ সালের ১৭ ডিসেম্বর কাদের মোল্লাসহ কয়েকজন জামায়াত নেতার বিরুদ্ধে কেরানীগঞ্জ থানায় একটি মামলা হয়। ২০০৮ সালে তার বিরুদ্ধে পল্লবী থানায় আরো একটি মামলা হয়।
২০১০ সালের ১৩ জুলাই কাদের মোল্লাকে পল্লবী থানা এলাকায় মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত গণহত্যার মামলায় গ্রেফতার করা হয়।
মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার বিচার করতে ২০১২ সালের ২২ মার্চ আওয়ামী লীগ সরকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ গঠন করে। ২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কাদের মোল্লাকে মানবতাবিরোধী ও যুদ্ধাপরাধের দায়ে ছয়টি অভিযোগের মধ্যে পাঁচটিতে দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়।
ফাঁসির রায় না দেওয়ায় সেদিনই শাহবাগে অবস্থান নেয় বাম-আওয়ামী লীগের একটি অংশ। আন্দোলনের প্রেক্ষিতে রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ রেখে ১৭ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালস (সংশোধন) বিল, ২০১৩ জাতীয় সংসদে পাস হয়। পরবর্তীতে ২০১৩ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সর্বোচ্চ আদালত যাবজ্জীবন করাদণ্ডের পরিবর্তে আব্দুল কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেয়।
২০১৩ সালের ১২ ডিসেম্বর রাত ১০টা ১ মিনিটে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে এই জামায়াত নেতার ফাঁসি কার্যকর হয়। এটিই ছিল শেখ হাসিনা সরকারের আমলে কোনো জামায়াত নেতার প্রথম ফাঁসি। এরপর দলটির কয়েকজনের ফাঁসি কার্যকর করে তৎকালীন সরকার।
টিএই/এমআর

