বাংলাদেশের সমকালীন রাজনীতিতে নরম ভাষা, স্থির কণ্ঠস্বর ও আপসহীন অবস্থানের জন্য পরিচিত এক অনন্য নাম মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে আন্দোলন-সংগ্রাম, সংসদীয় রাজনীতি, কারাবরণ এবং দলীয় পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন বিরোধী রাজনীতির অন্যতম মুখপাত্র হিসেবে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়ে মন্ত্রীসভায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে তার রাজনৈতিক জীবনে যুক্ত হয়েছে নতুন অধ্যায়।
শৈশব ও পারিবারিক শেকড়: রাজনৈতিক বীজ রোপণের গল্প
১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি তৎকালীন দিনাজপুর জেলার (বর্তমান ঠাকুরগাঁও) এক সম্ভ্রান্ত ও শিক্ষিত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তার পিতা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন আইনজীবী, সমাজসেবক ও রাজনীতিবিদ। পরিবার থেকেই তিনি শৃঙ্খলা, ন্যায়বোধ ও দেশপ্রেমের শিক্ষা অর্জন করেন। গ্রামীণ পরিবেশে বেড়ে ওঠা ফখরুলের শৈশব ছিল সহজ-সরল, কিন্তু চিন্তা-চেতনায় ছিল গভীরতা।
বিজ্ঞাপন
ছাত্রজীবনেই নেতৃত্বের গুণাবলি প্রকাশ পেতে শুরু করে। উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন ঢাকা কলেজ থেকে এবং পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
ছাত্র রাজনীতি ও গণঅভ্যুত্থান: আন্দোলনের পাঠশালা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে তিনি সক্রিয়ভাবে ছাত্ররাজনীতিতে যুক্ত হন। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের (বর্তমান বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন) সঙ্গে যুক্ত থেকে সংগঠনের এস.এম. হল শাখার সাধারণ সম্পাদক ও পরে বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল সময়ে নেতৃত্বের ভূমিকায় থেকে তিনি রাজনীতির কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে পরিচিত হন। তার বক্তৃতার ভঙ্গি ছিল যুক্তিনির্ভর, সংযত এবং আবেগঘন—যা পরবর্তীতে তার রাজনৈতিক পরিচয়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়।
বিজ্ঞাপন
মুক্তিযুদ্ধের সময়কার ভূমিকা: আদর্শের ভিত
১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি সক্রিয়ভাবে স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নেন এবং সংগঠক ও যোদ্ধা দুই ভূমিকাতেই ভূমিকা রাখেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের প্রশ্ন তার রাজনৈতিক দর্শনের ভিত্তি হয়ে ওঠে এই সময় থেকেই। স্বাধীনতার সংগ্রাম তার জীবনে কেবল একটি অধ্যায় নয়; বরং আদর্শিক ভিত্তি।
শিক্ষকতা থেকে জাতীয় রাজনীতি
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে শিক্ষা ক্যাডারে যোগ দেন এবং ঢাকা কলেজে অর্থনীতির প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে বিভিন্ন সরকারি কলেজে অধ্যাপনা করেন। তিনি পরিদর্শন ও আয়-ব্যয় পরীক্ষণ অধিদপ্তরেও দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৯ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এর শাসনামলে তৎকালীন উপ-প্রধানমন্ত্রী এস. এ. বারীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে তিনি আবার শিক্ষকতায় ফিরে যান এবং ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজে অধ্যাপনা করেন।
সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশ ও পৌর নেতৃত্ব
১৯৮৬ সালে শিক্ষকতা থেকে অব্যাহতি নিয়ে সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। ১৯৮৮ সালে ঠাকুরগাঁও পৌরসভা নির্বাচনে অংশ নিয়ে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনের সময় তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-তে। ১৯৯২ সালে তিনি বিএনপির ঠাকুরগাঁও জেলা শাখার সভাপতি নির্বাচিত হন এবং একইসঙ্গে কৃষকদলের সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
সংসদ নির্বাচন, জয়-পরাজয় ও মন্ত্রীত্ব
১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও জয়লাভ করতে পারেননি। তবে ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একই আসন থেকে বিজয়ী হয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া–র মন্ত্রিসভায় প্রথমে কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এবং পরে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৮ সালে নির্বাচনে পরাজিত হলেও তিনি দলীয় রাজনীতিতে সক্রিয় থাকেন। ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বগুড়া-৬ আসনে নির্বাচিত হলেও শপথ গ্রহণ না করায় আসনটি শূন্য ঘোষণা করা হয়। সাম্প্রতিক ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি বিপুল ২ লাখ ৩৮ হাজার ৮৩৬ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন—যা তার রাজনৈতিক জীবনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
বিএনপির মহাসচিব হিসেবে নেতৃত্ব
২০০৯ সালে বিএনপির পঞ্চম জাতীয় সম্মেলনে তিনি জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব নির্বাচিত হন। ২০১১ সালে তৎকালীন মহাসচিব খন্দকার দেলওয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া তাকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ঘোষণা করেন। ২০১৬ সালের ষষ্ঠ জাতীয় সম্মেলনে তিনি পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব নির্বাচিত হন। দলের কঠিন সময় গ্রেপ্তার, মামলা, আন্দোলন, সাংগঠনিক সংকট সবকিছুর মধ্যেও তিনি সংযত কণ্ঠে দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখার চেষ্টা করেছেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহালসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দাবিতে তিনি একাধিক কর্মসূচির নেতৃত্ব দিয়েছেন।
ব্যক্তিগত জীবন ও পারিবারিক ঐতিহ্য
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি রাহাত আরা বেগমের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের দুই কন্যা রয়েছে। পরিবারেও রয়েছে সমৃদ্ধ রাজনৈতিক ঐতিহ্য। তার চাচা মির্জা গোলাম হাফিজ ছিলেন বিএনপি নেতা, সাবেক মন্ত্রী ও জাতীয় সংসদের স্পিকার।
রাজনৈতিক দর্শন ও ব্যক্তিত্ব
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে অনেকেই “ভদ্র রাজনীতির প্রতীক” বলে উল্লেখ করেন। তার ভাষা আক্রমণাত্মক নয়, কিন্তু অবস্থান দৃঢ়। তিনি সংসদীয় গণতন্ত্র, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের পক্ষে সোচ্চার। বিরোধী রাজনীতির কঠিন বাস্তবতায় থেকেও সহিংসতার বদলে রাজনৈতিক সমাধানের ওপর গুরুত্ব দেওয়াই তার কৌশলগত বৈশিষ্ট্য। ধৈর্য, সহনশীলতা ও সাংগঠনিক দক্ষতা তার রাজনৈতিক জীবনের প্রধান শক্তি।
ঠাকুরগাঁওয়ের মাটি থেকে উঠে আসা এক ছাত্রনেতা থেকে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর–এর জীবন কেবল একজন রাজনীতিকের জীবনী নয়; এটি সংগ্রাম, আদর্শ, ত্যাগ ও নীরব দৃঢ়তার দীর্ঘ পথচলার দলিল। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, ছাত্ররাজনীতির অভিজ্ঞতা, সংসদীয় রাজনীতির সাফল্য-ব্যর্থতা এবং দলীয় সংকটের সময়ে স্থির নেতৃত্ব—সব মিলিয়ে তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ ও আলোচিত অধ্যায় হয়ে আছেন।
ক.ম/

