- মন্ত্রিসভায় অভিজ্ঞ ও নবীনের সমন্বয়
- মন্ত্রিসভার কেন্দ্রে থাকবেন অভিজ্ঞ নীতিনির্ধারকরা
- টেকনোক্র্যাট কোটায় আসবেন ত্যাগী ও মেধাবীরা
- তরুণ ও সাবেক সংসদ সদস্যদের পদচারণা
দীর্ঘ দুই দশকের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরছে বিএনপি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৯৭টি আসনের মধ্যে ২০৯টিতে জয়লাভ করে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে দলটি। এই ভূমিধস বিজয়ের পর এখন সব মহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু- কেমন হতে যাচ্ছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন মন্ত্রিসভা?
বিজ্ঞাপন
দলীয় উচ্চপর্যায়ের সূত্র ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দ্রুত রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে অভিজ্ঞ ও তরুণ মেধাবীদের সমন্বয়ে একটি ‘স্মার্ট মন্ত্রিসভা’ গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারেক রহমান।
৩০০ আসনের মধ্যে ১৫১টি আসনে বিজয়ী হলে গঠন করা যায় সরকার। মোট আসনের ৫০ দশমিক ৩৩ শতাংশ আসনে জয়ী হলে সরকার গঠন করতে পারে একটি দল। সেই হিসাবে ৬৯ দশমিক ৬৬ শতাংশ আসনে বিশাল জয় নিয়ে এবার সরকার গঠনের পথে বিএনপি।
বিজ্ঞাপন
এ ছাড়া প্রার্থীর মৃত্যুতে নির্বাচন স্থগিত থাকা শেরপুর-৩ আসন, এবং আদালতের নির্দেশে ফলাফল স্থগিত থাকা চট্টগ্রাম ২ ও ৪ আসনের ফল এলে বাড়তে পারে বিএনপির সংসদ সদস্য সংখ্যা। এর সঙ্গে রয়েছে তাদের মিত্রদের আরও ৩টি আসন।
সবশেষ ২০০১ সালের নির্বাচনে জয় পেয়ে সরকার গঠন করেছিল বিএনপি। সেই সময় তারা একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও জামায়াতে ইসলামীকে সঙ্গে নিয়ে চারদলীয় জোটের নেতৃত্বে সরকার গঠন করেছিল। ওই নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীক জয় পেয়েছিল ১৯৫টি আসনে। আর এবারের নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী ছিল বিএনপির মূল প্রতিদ্বন্দ্বী। তবে ভোটের মাঠে বিএনপির কাছে বিশাল ব্যবধানে হেরেছে জামায়াত। ঘোষিত ২৯৭টি আসনের মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরা জয় পেয়েছেন ৬৮টি আসনে। তাদের মিত্ররা পেয়েছেন আরও ৯টি আসন।
তবে কত সদস্যের মন্ত্রিসভা হবে তা সুনির্দিষ্ট করে বলা না গেলেও জানা গেছে, প্রশাসনিক গতিশীলতা রক্ষা এবং অপচয় কমানোর লক্ষ্যে বিএনপি এবার একটি সুসংগঠিত ও মাঝারি আকারের মন্ত্রিসভা গঠন করতে পারে। ধারণা করা হচ্ছে, পূর্ণ মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী মিলিয়ে নতুন মন্ত্রিসভার সদস্য সংখ্যা ৩৫ থেকে ৪০ জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে। তবে সবাইকে নিয়ে মন্ত্রিসভা গঠন করতে হলেও এই সংখ্যা বাড়ানোর বিকল্প নেই।
মন্ত্রিসভার কেন্দ্রে অভিজ্ঞ নীতিনির্ধারকরা
নতুন সরকারের মন্ত্রিসভায় দলের নীতিনির্ধারণী ফোরাম স্থায়ী কমিটির প্রবীণ নেতাদের ওপরই বড় দায়িত্ব আসার সম্ভাবনা রয়েছে। এই তালিকায় শীর্ষে রয়েছেন ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আব্দুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, মেজর (অব.) হাফিজউদ্দিন আহমেদ, বেগম সেলিমা রহমান এবং অধ্যাপক এজেডএম জাহিদ হোসেন।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ার আলোচনা থাকলেও তাকে রাষ্ট্রপতি করার গুঞ্জনও আছে। তবে স্থায়ী কমিটির সদস্যদের মধ্যে বয়সের পাশাপাশি শারীরিকভাবে অসুস্থতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ও দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রজ্ঞার কারণে প্রবীণ নেতারাই হবেন সরকারের মূল স্তম্ভ। এর মধ্যে প্রবীণ নেতা নজরুল ইসলাম খান ও বেগম সেলিমা রহমানকে টেকনোক্র্যাট কোটায় গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে দেখা যেতে পারে।
অবশ্য বিএনপির পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত মন্ত্রিসভায় কারা ঠাঁই পাবেন, কাদেরকে বেছে নেয়া হবে সে বিষয়ে সুস্পষ্ট কিছু বলা হয়নি। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, ‘এ জন্য অল্প কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে।’
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য হাফিজ উদ্দিন আহমদ ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘অনেকের নাম নিয়ে লেখালেখি হচ্ছে। কিন্তু সুনির্দিষ্ট করে বলার মতো এখনো কিছু হয়েছে বলে জানা নেই। তবে নিশ্চয়ই ভালো কিছু হবে এই বিশ্বাস রাখতে পারেন।’
এদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের কয়েকজন সদস্যকে মন্ত্রিপরিষদে রাখা নিয়ে বিএনপি ভাবছে বলে আলোচনা আছে।
টেকনোক্র্যাট কোটায় ‘মেধাবী’ মুখ
বিশেষজ্ঞ ও সংসদ সদস্য নন এমন ব্যক্তিদের মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করার বিধান (টেকনোক্র্যাট কোটা) কাজে লাগিয়ে একগুচ্ছ মেধাবী ও দক্ষ নেতাকে প্রশাসনে আনতে চান তারেক রহমান।
আলোচনায় আছেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, যুগ্ম মহাসচিব হাবিব-উন-নবী খান সোহেল, সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, হুমায়ূন কবীর, বিএনপির মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক অধ্যাপক মওদুদ হোসেন আলগীর পাভেল, বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মাহদী আমিন, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক আমিনুল হক এবং উপদেষ্টা ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার।
সূত্র জানায়, এদের মধ্যে কেউ মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত না হলেও তাদের অনেককে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ নীতি-নির্ধারণী পদে নিয়োগ দেওয়া হতে পারে।
তরুণ ও সাবেক সংসদ সদস্যদের পদচারণা
তারেক রহমানের ভিশন বাস্তবায়নে মন্ত্রিসভায় একঝাঁক তরুণ ও অভিজ্ঞ সাবেক সংসদ সদস্যের নাম গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হচ্ছে। তারা হলেন- অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরী, শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, এবিএম আশরাফ উদ্দিন নিজান, ব্যারিস্টার মোহাম্মদ নওশাদ জমির, আমানউল্লাহ আমান, হাবিবুর রশীদ, শেখ রবিউল আলম, আসাদুল হাবিব দুলু, রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, রকিবুল ইসলাম বকুল ও মোহাম্মদ আলী আসগর লবি।
এছাড়াও মন্ত্রিসভায় জায়গা পেতে পারেন নূরুল ইসলাম মনি, এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) আলতাফ হোসেন চৌধুরী, মজিবর রহমান সরওয়ার, এবিএম মোশাররফ হোসেন, জহির উদ্দিন স্বপন, সাবেক চীফ হুইপ জয়নাল আবেদিন ফারুক, আব্দুস সালাম পিন্টু, অ্যাডভোকেট জয়নাল আবেদীন, ব্যারিস্টার কায়সার কামাল, অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান, কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ, শরীফুল আলম, মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল ও আফরোজা খান রিতা।
তালিকায় আরও গুঞ্জন রয়েছে ফজলুল হক মিলন, খায়রুল কবির খোকন, শামা ওবায়েদ, শহীদুল ইসলাম বাবুল, মিয়া নুরুদ্দিন আহমেদ অপু, খন্দকার আব্দুল মোক্তাদির চৌধুরী, আ ন ম এহছানুল হক মিলন, আব্দুল আউয়াল মিন্টু, বরকতউল্লা বুলু, মো. শাজাহান, মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম, ড. রেজা কিবরিয়া, মো. মোশাররফ হোসেন ও সাঈদ আল নোমান-এর নাম নিয়ে।
তবে বিএনপির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে একাধিক সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। এদের মধ্যে স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক এসএম জিলানী, রাজিব আহসান ও যুবদলের সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম নয়ন নির্বাচিত হয়েছেন। নবীন-তারুণ্যনির্ভর মন্ত্রিসভায় এদের কেউ জায়গা পেলেও পেতে পারেন এমন আলোচনাও আছে।
মিত্র দলগুলোর সম্ভাব্য প্রতিনিধিত্ব
দীর্ঘদিনের রাজপথের আন্দোলনে সঙ্গে থাকা মিত্রদেরও যথাযথ মূল্যায়ন করতে চায় বিএনপি। মন্ত্রিসভায় শরিক দলগুলোর নির্বাচিত সংসদ-সদস্যদের মধ্যে আলোচনায় আছেন ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ, জোনায়েদ সাকি, ববি হাজ্জাজ ও নুরুল হক নুর। নির্বাচনে পরাজিত হলেও টেকনোক্র্যাট কোটায় আলোচনায় রয়েছেন মাহমুদুর রহমান মান্না।
বিইউ/ক.ম

