ইরান যুক্তরাষ্ট্রকে কেন্দ্র করে চলমান যুদ্ধের বিস্তৃতি শুধু কয়েকটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। এই যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হলে তার অভিঘাত পড়তে পারে গোটা বিশ্ব অর্থনীতিতে। বিশেষ করে জ্বালানি সরবরাহ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, খাদ্যপণ্যের মূল্য, পরিবহন ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রার বাজার এবং শ্রম অভিবাসনের ওপর এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়ার আশঙ্কা অনেকটা নিশ্চিতভাবেই রয়েছে। বিশেষত বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর এবং প্রবাসী আয়ের ওপর উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভরশীল দেশের জন্য পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হতে পারে।
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের পাশাপাশি ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও জীবনযাত্রার ব্যয়, জ্বালানির মূল্য, আবাসনসংকট ও অর্থনৈতিক অসন্তোষকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভ দেখা যাচ্ছে। ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন, বেলজিয়াম ও পর্তুগালসহ বিভিন্ন দেশে সরকার বিরোধী আন্দোলন ও সামাজিক অস্থিরতার খবর ইতিমধ্যেই প্রকাশিত হয়েছে। তবে এসব আন্দোলনের পেছনে একাধিক অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক কারণ থাকতে পারে। সবকিছুকে শুধু ইরান যুদ্ধের ফল হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। বরং এগুলো বিশ্ব অর্থনীতির বিদ্যমান চাপ ও সামাজিক অসন্তোষের একটি বৃহত্তর চিত্র তুলে ধরে।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে নতুন কূটনৈতিক উদ্যোগে বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক প্রশ্ন হচ্ছে হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ। পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের সংযোগস্থলে অবস্থিত এই প্রণালি আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। বিশ্বের বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এখানে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা তৈরি হলে তার প্রভাব পড়বে জ্বালানি আমদানিকারক দেশগুলোর অর্থনীতিতে।
১ নভেম্বর আলজাজিরা ও রয়টার্সের প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরান ও কাতারের মধ্যস্থতাকারীদের মধ্যে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং যুদ্ধের অবসানের লক্ষ্যে আলোচনা চলমান। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের নির্দিষ্ট শর্তে সম্মত হলে দুই দিনের মধ্যে প্রণালিটি খুলে দেওয়ার একটি পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। তবে এখনো কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা হয়নি।
ইরানের প্রস্তাবের আলোচ্য বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা, ইরানের তেল রফতানির সুযোগ পুনর্বহাল, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি কমানো এবং প্রণালির নৌ চলাচলসংক্রান্ত ব্যবস্থায় ইরান ও ওমানের নির্ধারিত অবস্থানকে সম্মান করা। অর্থাৎ এটি শুধু হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার প্রস্তাব নয়; বরং যুদ্ধ-পরবর্তী আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রশ্নও এর সঙ্গে জড়িত।
প্রশ্ন হচ্ছে, ইরান কেন এত দ্রুত প্রণালি খুলে দেওয়ার প্রস্তাব দিচ্ছে? এর পেছনে কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত—তিন ধরনের হিসাব থাকতে পারে। একদিকে আন্তর্জাতিক চাপ কমানো এবং অর্থনৈতিক অবরোধ থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ তৈরি করা; অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রকে আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের সুযোগ দেওয়া। একই সঙ্গে ইরান আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে প্রমাণ করতে পারবে যে, যুদ্ধ এড়ানোর জন্য তারা সর্বাত্মক কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়েছে।
অন্যদিকে এই প্রস্তাবের মাধ্যমে ইরান তার মিত্র ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের কাছেও একটি বার্তা দিতে পারে—তারা আলোচনার পথ খোলা রেখেছে, কিন্তু তাদের শর্ত উপেক্ষা করে নতুন করে সামরিক হামলা চালানো হলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হবে। এটি একটি সম্ভাব্য ভূরাজনৈতিক ব্যাখ্যা, নিশ্চিত উদ্দেশ্য হিসেবে একে বিবেচনা করা যাবে না।
ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে পরবর্তী পরিস্থিতি
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ১ নভেম্বর ইরানের সঙ্গে আলোচনা ভালোভাবে এগোচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন। তবে তিনি শান্তিচুক্তিতে পৌঁছাতে তাড়াহুড়ো করছেন না। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনাও পুরোপুরি নাকচ করা হয়নি। ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, সেটি এখন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, নির্বাচন শেষ হলেই যুদ্ধ শুরু হবে—এমন কোনো নিশ্চিত তথ্য নেই। তবে নির্বাচনের পর সামরিক সংঘাত পুনরায় শুরু হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগও নেই।
যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর ক্রিস মার্ফির সাম্প্রতিক বক্তব্য পরিস্থিতির উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। ২৯ অক্টোবর তিনি জানান, এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে প্রশাসনের কাছ থেকে যুদ্ধের পরবর্তী পর্যায়ের পরিকল্পনা সম্পর্কে তাঁকে ব্রিফ করা হয়েছে। পরিকল্পনাটিকে তিনি 'Their plan is insane' বলে অভিহিত করেন। তাঁর আশঙ্কা, নতুন করে সামরিক অভিযান শুরু হলে তা যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করতে পারে এবং ভয়াবহ সংঘাতের বিস্তার ঘটাতে পারে। বিশেষ করে বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলার সম্ভাবনা নিয়েও তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
এ বক্তব্যকে গুরুত্ব দেওয়ার কারণ হচ্ছে, এটি কেবল কোনো রাজনৈতিক বিশ্লেষকের অনুমান নয়; বরং মার্কিন প্রশাসনের পরিকল্পনা সম্পর্কে ব্রিফিং পাওয়া একজন সিনেটরের প্রকাশ্য উদ্বেগ। যদিও তিনি গোপন নথির বিস্তারিত প্রকাশ করেননি, তাঁর বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, নতুন করে সামরিক অভিযান শুরু হলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশিত ফলাফল নাও আসতে পারে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন করে সরাসরি সংঘাত শুরু হলে তার প্রভাব শুধু এই দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ইরানের পাল্টা হামলার লক্ষ্যবস্তু হতে পারে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনা ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত ও বাহরাইনসহ উপসাগরীয় দেশগুলো এমনকি জর্ডানও তখন নিরাপত্তাঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
বিশেষ করে তেল ও গ্যাসক্ষেত্র, শোধনাগার, বন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সমুদ্রবন্দর এবং পানি বিশুদ্ধকরণ ও লবণমুক্তকরণ স্থাপনা আক্রান্ত হলে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। উপসাগরীয় দেশগুলোর অনেক অঞ্চলেই সুপেয় পানির জন্য সমুদ্রের পানি লবণমুক্ত করার প্রযুক্তির ওপর ব্যাপক নির্ভরতা রয়েছে। ফলে এসব স্থাপনার ক্ষতি শুধু অর্থনৈতিক বিপর্যয় নয়, মানবিক সংকটও তৈরি করতে পারে।
তবে এ কথা নিশ্চিত করে বলার সুযোগ নেই যে, এসব দেশের সরকারগুলোর পতন হয়ে যাবে কিংবা সব তেল-গ্যাস ও পানি অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে যাবে।
আরও পড়ুন
মধ্যপ্রাচ্যের সংকট: সামরিক শক্তি নয়, কূটনীতিই সমাধানের পথ
যুদ্ধ, সংকট ও অনিশ্চয়তার বিশ্বে নাগরিকের স্বস্তি কোথায়?
তবে এগুলো সম্ভাব্য সংঘাতের উচ্চমাত্রার ঝুঁকিতে রয়েছে এ কথা বলা যেতেই পারে।বাস্তবতা হচ্ছে, যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হবে, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, বিনিয়োগ, জ্বালানি সরবরাহ ও বেসামরিক মানুষের জীবন তত বেশি ঝুঁকিপূর্ণ ও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য পরিস্থিতি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক।
মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক শুধু কূটনৈতিক বা বাণিজ্যিক নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে লাখ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, ওমান ও বাহরাইন বাংলাদেশের শ্রমবাজারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে উপসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্ব বোঝার জন্য কয়েকটি পরিসংখ্যানই যথেষ্ট। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের ২০২৬ সালের মার্চে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের মোট বিদেশগামী কর্মীর প্রায় ৮১ শতাংশ উপসাগরীয় দেশগুলোতে কর্মরত ছিলেন। একই বছরে বাংলাদেশের মোট রেমিট্যান্সের প্রায় ৪৬ শতাংশ এসেছে এই অঞ্চল থেকে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রকাশিত বার্ষিক উপাত্তেও সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, কুয়েত ও কাতার থেকে উল্লেখযোগ্য রেমিট্যান্স আসার তথ্য রয়েছে। এই পাঁচটি দেশ থেকেই সম্মিলিতভাবে প্রায় ১৫.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এসেছে। অতএব, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হলে বাংলাদেশের অবস্থা কী হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়।
প্রথমত, উপসাগরীয় দেশগুলোতে শিল্প, নির্মাণ, পরিবহন, ব্যবসা ও সেবা খাত ক্ষতিগ্রস্ত হলে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থান সংকুচিত হতে পারে। অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যেতে পারে, নতুন শ্রমিক নিয়োগ বন্ধ হতে পারে এবং বিদ্যমান কর্মীদের চাকরি হারানোর আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, যুদ্ধের কারণে ব্যাংকিং, পরিবহন ও আন্তর্জাতিক অর্থ স্থানান্তর ব্যবস্থা বিঘ্নিত হলে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যেতে পারে। এর ফলে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য এবং বিনিময় হারের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।
তৃতীয়ত, পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে বিপুলসংখ্যক প্রবাসী কর্মীকে দেশে ফিরে আসতে হতে পারে। তখন তাদের কর্মসংস্থান, আবাসন, চিকিৎসা ও সামাজিক নিরাপত্তার দায়িত্ব এসে পড়বে বাংলাদেশের ওপর।
এমনিতেই দেশে বেকারত্ব, কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা, মূল্যস্ফীতি এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে যে চাপ রয়েছে, তার সঙ্গে যদি বিপুলসংখ্যক প্রবাসী কর্মী যুক্ত হন, তাহলে পরিস্থিতি কতটা জটিল হতে পারে- তা সহজেই বুঝা যায়।
বিশেষ করে যাঁরা বছরের পর বছর বিদেশে পরিশ্রম করে পরিবারের জন্য অর্থ পাঠিয়েছেন, তাদের অনেকেই দেশে ফিরে এসে নতুন করে কর্মসংস্থান খুঁজতে বাধ্য হবেন। তাদের সঞ্চয়ও যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ফলে শুধু ব্যক্তিগত বা পারিবারিক সংকট নয়, সামগ্রিক অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের বাজারেও আসতে পারে বড় ধাক্কা
বাংলাদেশ জ্বালানি তেল ও এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরশীল। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল ব্যাহত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম আরও বেড়ে যেতে পারে। এর প্রভাব পড়বে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা, পরিবহন, কৃষি উৎপাদন ও পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থায়।
জ্বালানির দাম বাড়লে উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বাড়বে। ফলে খাদ্যপণ্য থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সব পণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা থাকবে। আমদানি ব্যয় বেড়ে গেলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি হবে। একই সঙ্গে রেমিট্যান্স কমে গেলে অর্থনীতির ওপর দ্বিমুখী আঘাত আসবে।
অর্থাৎ বাংলাদেশ একই সময়ে জ্বালানি সংকট, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, কর্মসংস্থান সংকট এবং মূল্যস্ফীতির চাপের মুখোমুখি হতে পারে।
অর্থনৈতিক সংকট যখন দীর্ঘস্থায়ী হয়, তখন তার প্রভাব শুধু মানুষের আয়-ব্যয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। কর্মসংস্থান হারানো, আয় কমে যাওয়া, ঋণের বোঝা বৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার ফলে সামাজিক অসন্তোষ তৈরি হতে পারে।
ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সাম্প্রতিক বিক্ষোভ ও অসন্তোষ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, অর্থনৈতিক চাপ দীর্ঘস্থায়ী হলে উন্নত দেশগুলোতেও অস্থিরতা দেখা দেয়। বাংলাদেশে যদি একই সময়ে বিপুলসংখ্যক প্রবাসী কর্মী দেশে ফিরে আসেন, রেমিট্যান্স কমে যায় এবং জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যায়, তাহলে সামাজিক পরিস্থিতি সামাল দেওয়া বেশ জটিল ও কঠিন হতে পারে।
এখানে আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন। আমাদের সমাজে পোশাকশ্রমিক, নিম্ন আয়ের কর্মজীবী মানুষ, দিনমজুর কিংবা বিদেশফেরত কর্মীদের প্রতি অনেক সময় অবজ্ঞা ও অসহিষ্ণু আচরণ করতে দেখা যায়। অথচ দেশের অর্থনীতি সচল রাখার ক্ষেত্রে তাঁদের প্রত্যেকের অবদান অপরিসীম।
আসন্ন সংকট মোকাবিলায় সামাজিক সংহতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো পেশার মানুষকে ছোট করে দেখা, তাদের ন্যায্য অধিকার উপেক্ষা করা কিংবা দুর্বল অবস্থার সুযোগ নিয়ে শোষণ করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
বাংলাদেশের এখনই প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি
আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। কূটনৈতিক সমঝোতা হলে যুদ্ধের বিস্তার ঠেকানো সম্ভব। আবার সমঝোতা ব্যর্থ হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। তাই সম্ভাব্য সংকটের জন্য আগাম প্রস্তুতি নেওয়াই হবে বিচক্ষণতার পরিচয়। এ ক্ষেত্রে সরকারের কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
আরও পড়ুন
ইসলামী ব্যাংকের বিপর্যয়: দায় কার, আস্থা ফিরবে কীভাবে
আইনশৃঙ্খলা ও জ্বালানি সংকটে ঝুঁকিতে বিনিয়োগ
১. মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারের পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানো।
২. যুদ্ধের কারণে দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হওয়া কর্মীদের জন্য জরুরি পুনর্বাসন, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচি প্রস্তুত রাখা।
৩. জ্বালানি তেল ও এলএনজির বিকল্প উৎস অনুসন্ধান এবং প্রয়োজনীয় কৌশলগত মজুত নিশ্চিত করা।
৪. খাদ্যপণ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে আমদানি ও বাজার ব্যবস্থাপনায় আগাম পরিকল্পনা গ্রহণ করা।
৫. বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংরক্ষণ, অপ্রয়োজনীয় আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং রপ্তানি আয় বাড়ানোর কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া।
৬. নিম্ন আয়ের মানুষ ও কর্মহীন হয়ে পড়া পরিবারগুলোর জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি শক্তিশালী করা।
পাশাপাশি প্রবাসীদেরও ব্যক্তিগত পর্যায়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো, পরিবারের জন্য জরুরি সঞ্চয় রাখা এবং কর্মসংস্থান ও বৈধ কাগজপত্রের বিষয়ে সচেতন থাকা জরুরি।
যুদ্ধের মাধ্যমে এসব সমস্যার সমাধান হওয়ার নজীর নেই বললেই চলে, পারস্পরিক আলাপ আলোচনা ও কূটনৈতিক চ্যানেলে এসব সমস্যার সমাধানের নজির রয়েছে।
বিশ্বের কোনো দেশই দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে প্রকৃত পক্ষে বিজয়ী হতে পারে না। সামরিক শক্তি দিয়ে কোনো দেশকে সাময়িকভাবে দুর্বল করা সম্ভব হলেও যুদ্ধের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও মানবিক মূল্য বহু বছর ধরে বহন করতে হয়। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের মতো জ্বালানি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে তার ক্ষতি শুধু সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর হবে না; গোটা বিশ্বকে এর চড়া মূল্য দিতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্র, ইরান, এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর উচিত সামরিক উত্তেজনা কমিয়ে আলোচনার মাধ্যমে স্থায়ী সমাধানের পথ খোঁজা। হরমুজ প্রণালিতে আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, বেসামরিক অবকাঠামো ও মানুষের জীবন রক্ষা করা এবং আঞ্চলিক দেশগুলোর সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান দেখানো।
আমাদের মনে রাখতে হবে, ভূরাজনীতির ক্ষমতার লড়াইয়ে সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একজন শ্রমিকের চাকরি হারানো, একজন প্রবাসীর দেশে ফিরে আসা কিংবা একটি পরিবারের উপার্জনের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়া—এসব কোনো পরিসংখ্যানের বিষয়মাত্র নয়; এগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানুষের জীবন ও ভবিষ্যৎ।
বাংলাদেশের জন্যও সময়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা যেন কেবল পরিস্থিতির অবনতি হওয়ার পর প্রতিক্রিয়া জানাতে ব্যস্ত না হয়ে আগাম প্রস্তুতি গ্রহণ করি। সরকার, ব্যবসায়ী, শিল্পোদ্যোক্তা, ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ নাগরিক—সবারই দায়িত্ব রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংকটকে দূরের কোনো যুদ্ধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। আজ সেখানে যে আগুন জ্বলছে, তার উত্তাপ বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সমাজেও পৌঁছাতে পারে। তাই শুধু পোশাকশ্রমিক নয়, কোনো পেশার মানুষকেই অবজ্ঞা বা অসম্মান করা উচিত নয়। পারস্পরিক সহমর্মিতা, সামাজিক সংহতি ও অর্থনৈতিক প্রস্তুতিই হতে পারে সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলার অন্যতম শক্তি।
আমরা যেন অন্যের পরিকল্পনার অসহায়ত্বের শিকার না হই; বরং নিজেদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় সময় থাকতেই পরিকল্পনা গ্রহণ করি।
লেখক: ইসলামি ফাইন্যান্স বিশেষজ্ঞ, অর্থনীতিবিদ, সমাজ ও রাষ্ট্রচিন্তক, ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং মানবাধিকারকর্মী




